লালচে লালচে লঙ্কা খেলেগালটি যাবে পুড়ে।লাল টুকটুক ডালিম খেও,দুলবে মিষ্টি সুরে।
বাংলা কবিতার জগতে কিংবদন্তি শামসুর রহমান মূলত আধুনিক কবি হিসেবে পরিচিত হলেও শিশু-কিশোর সাহিত্যে তাঁর অবদানও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। তাঁর ছড়াগুলোতে যেমন আছে শৈশবের নির্মল আনন্দ, তেমনি আছে স্বপ্ন, কল্পনা, প্রকৃতি, পরিবার, সমাজ ও সময়ের নানা অনুষঙ্গ।
সহজ-সরল শব্দচয়ন, সুরেলা ছন্দ এবং শিশুমনের গভীরে পৌঁছে যাওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা তাঁর ছড়াগুলোকে করে তুলেছে অনন্য। কবি শামসুর রহমান-এর নির্বাচিত ১৫টি ছড়া’ সংকলনটি মূলত কবির সেই চিরসবুজ ও মায়াবী শিশুতোষ সৃষ্টির একটি চমৎকার কোলাজ। প্রতিটি ছড়া যেন একেকটি স্মৃতির জানালা সোনালী অতীতে।
আজকের যান্ত্রিক যুগে যখন শিশুদের শৈশব ক্রমশ চার দেয়ালের মাঝে বন্দী হয়ে পড়ছে, তখন কবি শামসুর রহমানের এই নির্বাচিত ১৫টি ছড়া তাদের কল্পনার জগৎকে আরও রঙিন ও প্রসারিত করবে। নতুন প্রজন্মের পাঠকদের বাংলা ভাষা, ছন্দ এবং শিকড়ের সাথে এক গভীর মেলবন্ধন তৈরি করতে সাহায্য করবে।
জল-টুপটুপ-কবি শামসুর রহমান
জল-টুপটুপ দিঘির পাড়ে ডালিম গাছের ডাল,
ডালিম গাছে জল ঢেলেছে খুকুমণি কাল।
তোতাপাখি লেজ নাচাল, ডালিম গাছে মৌ,
হঠাৎ দেখি ডুব দিয়েছে লাল শালুকের বৌ।
লাল শালুকের বৌ-এর মাথায় মুক্তো জমে ঐ,
মুক্তো নিল হাওয়ার রাজা, আমরা চেয়ে রই।
আঁটুল বাঁটুল ছড়া-কবি শামসুর রহমান
আঁটুল বাঁটুল শামলা সাঁটুল, শামলা গেছে হাটে।
কুঁচবরন কন্যা যিনি, তিনি ঘুমান খাটে।
খাট নিয়েছে বোয়াল মাছে, কন্যে বে কাঁদে,
ঘটি বাটি সব নিয়েছে, কিসে তবে রাঁধে?
আর কেঁদো না, আর কেঁদো না, ছোলা ভাজা খেয়ো,
মাটির ওপর মাদুর পেতে ঘুমের বাড়ি যেয়ো।
লম্বা গলা--কবি শামসুর রহমান
সিরাপ খেয়ে জিরাফ পেল
গলা ইয়া লম্বা।
লম্বা গলায় কী এসে যায়,
কার চেয়ে সে কম বা?
জেনে রাখো লাভ আছে ঢের
গলা হলে লম্বা।
মই লাগে না পাতা খেতে,
খেতে পাকা রম্ভা।
বক মামা--কবি শামসুর রহমান
বক মামা, বক মামা
মাছ এনে দাও।
তার বদলে একটি কানা-
কড়ি নিয়ে যাও।
কড়ি দিয়ে তেলে ভাজা
চরে ব’সে খাও।
ঘরে এলে তোমায় আমি
খেতে দেবো কী?
খেতে দেবো চালের কাঁকর,
দেবো ভেজাল ঘি।
ট্রেন –-কবি শামসুর রহমান
ঝক ঝক ঝক ট্রেন চলেছে
রাত দুপুরে অই।
ট্রেন চলেছে, ট্রেন চলেছে
ট্রেনের বাড়ি কই?
একটু জিরোয়, ফের ছুটে যায়
মাঠ পেরুলেই বন।
পুলের ওপর বাজনা বাজে
ঝন ঝনাঝন ঝন।
দেশ-বিদেশে বেড়ায় ঘুরে
নেইকো ঘোরার শেষ।
ইচ্ছে হলেই বাজায় বাঁশি,
দিন কেটে যায় বেশ।
থামবে হঠাৎ মজার গাড়ি
একটু কেশে খক।
আমায় নিয়ে ছুটবে আবার
ঝক ঝকাঝক ঝক।.
একটি পাখি -কবি শামসুর রহমান
বহু দূরের পথ পেরিয়ে, বন পেরিয়ে
এই শহরে আসবে উড়ে
একটি পাখি ভাল।
তার দু চোখে মায়াপুরীর ছায়া আছে,
দূর পাতালের স্বপ্ন আছে.
আছে তারার আলো।
সেই পাখিটা এই শহরে আসবে বলে
পথে ধারে ভিড় জমেছে,
সবাই তাকায় দূরে।
চোখগুলো সব আকাশ পারে বেড়ায় সেই-
মস্ত রঙিন পাখা নেড়ে
আসবে পাখি উড়ে।
রাঙা ঠোঁটের সেই পাখিটা ঝড়ে-কাঁপা
আকাশ ছেড়ে নামবে পথে,
সবাই নেবে পিছু।
সেই পাখিটা স্বর্গপথের নানান গানে
শহরটাকে করবে মধুর,
বলবে খবর কিছু।
কিন্তু কোথায় সেই পাখিটা? এই শহরে
বাজল না তার পাখা দুটি।
আকাশ করে ধু-ধু।
শহরবাসী ক্লান্ত হয়ে ফিরল ঘরে,
সবাই ঘুমে সেই পাখিটার
স্বপ্ন দেখে শুধু।
আয়না--কবি শামসুর রহমান
সুমির মুখে বায়না শুধু বায়না,
মেলা থেকে আনতে হবে আয়না।
আয়না ছাড়া আর কিছু সে চায় না।
হঠাৎ সেদিন পাঁচ বছরের কন্যা
দোরের গোড়ায় দেখতে পেল বন্যা।
শুকনো মাটি কোথাও খুঁজে পায় না-
এক নিমেষে দেশটা হলো আয়না।
আতা গাছে, ডালিম গাছে-কবি শামসুর রহমান
আতা গাছে চারটি পাখি,
ডালিম গাছে তিন-
সাতটি পাখি মনের সুখে নাচে তা’ধিন ধিন।
সাতটি পাখি সাতটি সুরে গান গেয়ে যায় রোজ,
আতা গাছে, ডালিম গাছে সুরের সে কি ভোজ।
হুকুম এলো একই সুরে গাইতে হবে গান,
নইলে জেনো সাতটি পাখির যাবে যে গর্দান।
শুনলো সবাই গাছতলাতে বাপরে সে কী হাঁক,
পড়লো ঢাকা সাতটি পাখির মিষ্টি সুরের ডাক।
কৈ পালালো গানের পাখি শূন্য ক’রে শাখ?
আতা গাছে, ডালিম গাছে বসছে শুধু কাক!
সাইক্লোন–কবি শামসুর রাহমান
চাল উড়ছে, ডাল উড়ছে
উড়ছে গরু, উড়ছে মোষ।
খই উড়ছে, বই উড়ছে
উড়ছে পাঁজি, বিশ্বকোষ।
ময়লা চাদর, ফরসা জামা,
উড়ছে খেতের শর্ষে, যব।
লক্ষ্মীপ্যাঁচা, পক্ষীছানা
ঘুরছে, যেন চরকি সব।
মাছ উড়ছে, গাছ উড়ছে
ঘুর্ণি হাওয়া ঘুরছে জোর।
খাল ফুলছে, পাল ছিঁড়ছে
রুখবে কারা পানির তোড়?
হারান মাঝি, পরান শেখ
বাতাস ফুঁড়ে দিচ্ছে ডাক।
আকাশ ভেঙে কাঁচের গুঁড়ো
উঠল আজান, বাজল শাখ।
চম্পাবতীর কেশ ভাসছে
ভাসছে স্রোতে খড়ের ঘর।
শেয়াল কুকুর কুঁকড়ো শালিক
ডুবল সবই, ডুবলো চর।
জুতো-কবি শামসুর রাহমান
একটা লোকের উঠোন জোড়া
জুতোর বহর মস্ত।
জুতোর ভেতর লোকটা জানি
উঠতো এবং বসতো।
ঘরহারা কেউ ঝড়ের পরে
ধরলে ঘরের বায়না,
লোকটা তখন বলতো ডেকে,
জুতোর ভেতর আয়না।
বর্গি-তাড়ানো গান--কবি শামসুর রহমান
ছেলে ঘুমায় না, পাড়া জুড়ায় না,
বর্গিরা এল দেশে।
বর্গি তাড়াবে তাই তো খোকন
সাজল বীরের বেশে।
সূর্যের মুখে দেয় যারা কালি,
আগুন ছড়ায় হাটে-মাঠে খালি,
কেরে নেয় কচি-কাঁচাদের হাসি,
মেঘ থেকে বোমা ছোড়ে রাশি রাশি,
তাদের রুখতে খোকন দাঁড়ায়
কামানের কাঁধ ঘেঁষে।
দত্যি-দানব আসুক না হয়,
রাক্ষস দেখে পায় না সে ভয়।
দেবে না ভাঙতে ঘর-বাড়ি, পুল,
ভায়ের লাটাই, বোনের পুতুল,
মায়ের হাতের চুড়ি সুন্দর-
দেবে না ভাঙতে এই খেলাঘর,
তাই তো খোকন কামান-গোলায়
বুক পেতে দেয় হেসে।
দ্যাখো, দ্যাখো চেয়ে বর্গি পালায়,
খোকনের ওই গোলার জ্বালায়।
প্রাণ নিয়ে দেয় চম্পট ওরা,
কেউ প’ড়ে মরে, কেউ হয় খোঁড়া।
আজকে খোকন তাড়ায় বর্গি
মেঘ হতে মেঘে ভেসে!
ঢ্যাম কুড়কুড়-কবি শামসুর রহমান
ঢ্যাম কুড়কুড় বাদ্যি বাজে
বাজে হরেক যন্ত্র।
ঢোলের তালে বদ্যি পড়ে
সাপ-তাড়ানো মন্ত্র।
মন্ত্র শুনে উঠছে কেঁপে
চিতাবাঘের অন্ত্র।
নেকড়ে মশাই খেপে বলেন-
‘মস্ত ষড়যন্ত্র,
পক্ষিরাজের পিঠে চড়ে
আসবে গণতন্ত্র’।
তেপান্তরে-কবি শামসুর রহমান
পক্ষীরাজের সফেদ ডানা আধখানা,
হীরামনের হীরের টুকরো সাত ছানা
কয়েক আনায় কিনতে পারো তোমরা,
কিনতে পারো পাতালপুরী ভোমরা।
কঙ্কাবতীর চোখের আলো সাচ্চা,
কিনতে পারো ওহে দু-তিন কাচ্চা।
তেপান্তরে মাঠের ধুধু নিশ্বাস
কিনতে পারো-করো আমায় বিশ্বাস।
ফুটবল-কবি শামসুর রহমান
চামড়া দিয়ে তৈরি জিনিশ
ফুটবলটা গোলই বটে।
ছোট্র জিনিশ, সুনাম তার
দুনিয়া জুড়ে রটে।
দুনিয়া নিজে বলের মতো
দেখতে গোলাকার।
চাঁদের রংটি শাদা, মুখটি
বলের মতোই তার।
এক বল নিয়ে দুটি দলের
বাইশ জনার খেলা।
সবাই জানে খেলার মাঠে
হাজার লোকের মেলা।
জালের ভেতর বল ঢুকলেই
সবাই চ্যাঁচায় ‘গোল’।
সমর্থকের খুশির চোটে
বাজতে থাকে ঢোল।
এই জগতের অনেক কিছুই
এক ধরনের খেলা।
বেঁচে থাকার লড়াই, মরা,
ছড়া লেখাও খেলা।
ফুটবলে ভাই ছড়ার মতো
মজার ছন্দ আছে।
বলটা দেখি পায়ে-পায়ে
এবং মাথায় নাচে।
শহর শহর ঢাকা শহর-কবি শামসুর রাহমান
শহর শহর, ঢাকা শহর
আজব শহর ঢাকা।
সব শহরই নয়কো ঢাকা,
একটি শহর ঢাকা।
এই শহরে আছে অনেক
গলি আঁকাবাঁকা।
এই শহরের কারখানাতে
ঘোরে কলের চাকা,
এই শহরে শাঁখারিরা
বানায় কত শাঁখা।
এই শহরে ভারি মজা
ইটের ঘরে থাকা,
ইচ্ছে হলে যায় তো দূরের
আকাশটাকে ঢাকা।
দিন দুপুরে ভিড়ের পথে
যায় না তো পা রাখা,
এই শহরে মুটে চলে
মাথায় নিয়ে ঝাঁকা,
রাত দুপুরে রাস্তাগুলো
খুব হয়ে যায় ফাঁকা।
এই শহরে দালান কোঠা
রৌদ্র ছায়া মাখা,
শহর শহর, ঢাকা শহর
স্মৃতি দিয়ে আঁকা।
শামসুর রহমানের ছড়াগুলো বাংলা শিশু সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ। সহজ ভাষা, প্রাণবন্ত ছন্দ এবং কল্পনার রঙে রাঙানো এসব রচনা শিশুদের আনন্দ দেওয়ার পাশাপাশি তাদের ভাবনা ও অনুভূতির জগতকে সমৃদ্ধ করে।
‘শৈশবের আলোছায়া: কবি শামসুর রহমান-এর নির্বাচিত ছড়া’ সংকলনের মাধ্যমে পাঠক তাঁর সৃষ্ট শৈশবের সেই মুগ্ধকর জগতে প্রবেশের সুযোগ পাবেন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই ছড়াগুলো শিশু-কিশোরদের মনে আনন্দ, কৌতূহল ও সৌন্দর্যবোধ জাগিয়ে তুলবে এটাই তাদের চিরন্তন আবেদন।

