যত দিন বাংলাদেশ থাকবে তত দিনই উচ্চারিত হবে নাম শেখ মুজিবুর রহমান। এই মহান মানুষটা আছে আমাদের সম্মান শ্রদ্ধার সবোর্চ্চ স্থানে। সব ছবি ভাস্কর্য ভেঙ্গে গুড়িয়ে দেওয়া যাবে মনের গভীরের স্থান থেকে মুছে ফেলা যাবে না। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম তাঁর অবদান স্মরন করবে যতদিন বাংলাদেশ থাকবে। বাঙালি, বাংলাদেশ আর বঙ্গবন্ধু এই তিনটি শব্দ মূলত একই সূত্রে গাঁথা। ইতিহাসের বরপুত্র শেখ মুজিবুর রহমান কেবল একটি নাম নন তিনি একটি মানচিত্র একটি পতাকা এবং কোটি কোটি মানুষের মুক্তির অবিনাশী এক প্রেরণা। মহাকালের আবর্তে অনেক নেতার জন্ম হয়, কিন্তু বাঙালির হৃদয়ে শাশ্বত আসন গেঁড়ে নিয়েছেন একমাত্র তিনিই। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের সেই কালরাত আমাদের কাছ থেকে জাতির পিতাকে কেড়ে নিলেও তাঁর আদর্শ আর কীর্তিকে মুছে দিতে পারেনি। ঘাতকের বুলেট তাঁর শরীর বিদ্ধ করলেও বাঙালির হৃদয়ে তাঁর স্থান আজ হিমালয়সম অটল। কবিদের কবিতায়, লেখকের কলমে আর সাধারণ মানুষের ভালোবাসায় তিনি আজও জীবন্ত। অন্নদাশঙ্কর রায়ের অমর পঙক্তি থেকে নির্মলেন্দু গুণের হাহাকার সবখানেই ধ্বনিত হয় তাঁর নাম। আজকের এই শোকাবহ দিনে, কালজয়ী কিছু কবিতা ও স্মৃতির পটে পরম শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি ইতিহাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে।
কবি অন্নদাশঙ্কর রায় রচিত " জয় মুজিবুর রহমান " কবিতার সেই বিখ্যাত চরণ
কবি সিকান্দার আবু জাফর বঙ্গবন্ধুর মুক্তি ও স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের সংবাদে রচনা করেন “ফিরে আসছে শেখ মুজিব.....
“যতদিন রবে পদ্মা মেঘনা
গৌরি যমুনা বহমান
ততদিন রবে কীর্তি তোমার
শেখ মুজিবুর রহমান "
কবি নির্মলেন্দু গুণের সেই কবিতাটা--“ আগস্ট শোকের মাস, কাঁদো” - কাঁদো বাঙালি কাঁদো..
এসেছে কান্নার দিন, কাঁদো বাঙালি, কাঁদো।
জানি, দীর্ঘদিন কান্নার অধিকারহীন ছিলে তুমি,
হে ভাগ্যহত বাংলার মানুষ, আমি জানি,
একুশ বছর তুমি কাঁদতে পারোনি। আজ কাঁদো।
আজ প্রাণ ভরে কাঁদো, এসেছে কান্নার দিন,
দীর্ঘ দুই-দশকের জমানো শোকের ঋণ
আজ শোধ করো অনন্ত ক্রন্দনে।
.
তোমার বক্ষমুক্ত ক্রন্দনের আবেগী উচ্ছ্বাসে
আজ ভেসে যাক, ডুবে যাক এই বঙ্গীয় বদ্বীপ।
মানুষের ত্রকত্রিত কান্না কতো সুন্দর হতে পারে,
মানুষ জানে না। এবার জানাও। সবাই জানুক।
মাটি থেকে উঠে আসা ঝিঁঝির কান্নার মতো
তোমাদের কল্লোলিত ক্রন্দনের ধ্বনি শুনুক পৃথিবী।
কাঁদো, তুমি পৃথিবী কাঁপিয়ে কাঁদো আজ।
.
কান্নার আনন্দবঞ্চিত, হে দুর্ভাগা দেশের মানুষ,
তুমি দুধ না-পাওয়া ক্ষুধার্ত শিশুর মতো কাঁদো,
তুমি ভাই-হারানো নিঃসঙ্গ বোনের মতো কাঁদো,
তুমি পিতা-হারানো আদুরে কন্যার মতো কাঁদো,
তুমি জলোচ্ছ্বাসে নিঃস্ব মানুষের মতো কাঁদো,
তুমি সদ্যপ্রসূত মৃত-সন্তানের জননীর মতো কাঁদো,
যুবক পুত্রকে কবরে শুইয়ে দিয়ে ঘরে ফিরে আসা
বৃদ্ধ পিতার মতো তুমি উঠানে লুটিয়ে পড়ে কাঁদো।
যখন কাঁদতে চেয়েছিলে তখন কাঁদতে না-পারার
অসহায় ক্ষোভে, বেদনায় তুমি অক্ষমক্রোধে কাঁদো।
.
একুশ বছর পরে আজ মেঘ ফুঁড়ে উঠেছে মুজিবসূর্য
বাংলার আকাশে; উল্লাসে নয়, কান্নার মঙ্গলধ্বনিতে
আজ আবাহন করো তারে। কাঁদো, বাঙালি, কাঁদো।
এসেছে কান্নার দিন মুজিববিহীন এই স্বাধীন বাংলায়।
.
আজ উৎপাটিত বটপত্রের শুভ্র-কষের মতো
চোখ বেয়ে ঝরুক তোমার অশ্র“বিন্দুরাশি।
আজ কাটা-খেজুর গাছের উষ্ণ রসের মতো
বুকের জমানো কান্না ঝরুক মাঠির কলসে।
একুশ বছর পর, আজ এসেছে আগস্ট।
কবি সিকান্দার আবু জাফর বঙ্গবন্ধুর মুক্তি ও স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের সংবাদে রচনা করেন “ফিরে আসছে শেখ মুজিব.....
মুক্তিকামী মানুষের শুভেচ্ছার পথে
বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জনক
শেখ মুজিবুর রহমান
ফিরে আসছেন বাংলাদেশে।
ফিরে আসবেন জানা ছিল,
জানা ছিল ব্যর্থ হতে পারে না কখনো
সাড়ে সাত কোটি বাঙালির কণ্ঠে
সমস্বর বিশ্বের জাগ্রত গণদাবি ছিল।
মানুষে অমানুষ সংঘর্ষের প্রস্তরফলক পেরিয়ে
ফিরে আসছেন তিনি ইতিহাসে অসনাক্ত পথে।
পেরিয়ে আসছেন সশস্ত্রের-ঝরা
নিরস্ত্র রক্তের নদী,
কোটি কোটি দীর্ঘশ্বাসের ঝড়-সওয়ার
তিনি আসছেন বঙ্গবন্ধু বিজয়ী মুজিব,
পায়ে পায়ে বেজে উঠছে ইতস্তত করোটি কঙ্কালের
প্রতিজ্ঞার জয়ধ্বনি
ফিরে আসছেন বধূ-ভগ্নী-জননীর
লুণ্ঠিত নারীত্বের আর্তনাদ পেরিয়ে
অগ্নিদগ্ধ গ্রাম কুঠিরের অগণিত
সংসার-ভস্মের অভ্যর্থনা ছুঁয়ে
বাঙালির শতচূর্ণ স্নেহপ্রীতি মমতা প্রেমের
সমাধি সঙ্কুল রাজপথে।
মানবিক চেতনার শ্মশান শৃগাল
সাড়ে সাত কোটি বাঙালির কান্নায় পাথরে গড়া
সুমসৃণ পথে ফিরে আসছেন তিনি।
ফিরে আসছেন বঙ্গ ভারতের
সম্মিলিত রক্তস্নাত মহাপুণ্য পথে
বাংলাদেশের মরণ বিজয়ী মুক্তি সেনানী।
ছাত্র জনতার
করতালি মুখরিত পথে
ফিরে আসছেন তিনি জাতির জনক
সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশে
নির্ভর ভবিষ্যতের স্বপ্নদীপ্ত
নিরঙ্কুশ প্রত্যাশার পথে।......
বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যত কবিতা রচিত হয়েছে অপর কাউকে নিয়ে তত কবিতা রচিত হয়নি। একজন মানুষ জীবদ্দশায় বা পৃথিবী থেকে বিদায় নেবার পর তখনই কবিতার বিষয় হয়ে ওঠেন যখন তিনি একটি প্রতীক, রূপক, কিংবদন্তি, পুরাণ বা প্রকৃতির অংশ হয়ে পড়েন। কিউবার বিপ্লবী নেতা ফিদেল কাস্ত্রোর সেই বিখ্যাত উক্তি- “আমি হিমালয় দেখিনি। তবে শেখ মুজিবকে দেখেছি। ব্যক্তিত্ব ও সাহসে এই মানুষটি হিমালয়ের সমান। এভাবে আমি হিমালয় দেখার অভিজ্ঞতাই লাভ করলাম”।
বঙ্গবন্ধু মানেই বাংলাদেশ, আর বাংলাদেশ মানেই বঙ্গবন্ধু। ঘাতকের দল ভেবেছিল ১৫ আগস্টের সেই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে তারা একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটাবে, কিন্তু তারা জানত না মৃত্যু একজনকে নশ্বর দেহ থেকে মুক্তি দিলেও তাঁকে করে তোলে অবিনাশী। আজ বঙ্গবন্ধু কোনো নির্দিষ্ট দলের নন, তিনি দল-মতের ঊর্ধ্বে সমগ্র বাঙালির চেতনার আলোকবর্তিকা। যতদিন এই বাংলায় পদ্মা-মেঘনা-যমুনা বয়ে চলবে, যতদিন কবিতার ছন্দে দ্রোহ আর ভালোবাসা থাকবে, ততদিন বঙ্গবন্ধু আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন প্রতিটি ধূলিকণায়, প্রতিটি মানুষের নিঃশ্বাসে। শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে তাঁর আজন্ম লালিত স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তোলাই হোক আজকের দিনে আমাদের প্রকৃত অঙ্গীকার। জাতির পিতার প্রতি রইলো বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।
----- বাউল পানকৌড়ি


