বাংলা গানের ইতিহাসে কিছু গান আছে যেগুলো হয়ে ওঠে সময়ের স্মৃতি অনুভবের আশ্রয়। আশির দশকের এমনই কালজয়ী কয়েকটি গান তোরে পুতুলের মতো করে সাজিয়ে বা এই মুখরিত জীবনের চলার বাঁকে। আজও কিন্তু গান গুলোর জনপ্রিয়তা সমান। মনে হয় আরো বেড়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে শ্রোতাদের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে। এ দুটি কালজয়ী গানের গীতিকার/গীতিকবির নাম আবদুল্লাহ আল মামুন। কবিতা দিয়ে যাঁর শুরু করে ছিলেন লেখালেখি। হাতে গোনা কয়েকটি গান তার প্রকাশিত হয়েছিল। গান ও কবিতার এই যাত্রা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। পেশাগত জীবনের টানে ভর্তি হয়েছিলেন চট্টগ্রাম ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে। প্রকৌশল শিক্ষা শিক্ষকতা এবং পরবর্তীতে উচ্চশিক্ষা ও জীবিকার প্রয়োজনে অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমান তিনি। ব্যস্ত প্রবাসজীবনে গান লেখা থেমে গেলেও সংগীতের সঙ্গে তাঁর আত্মিক সম্পর্ক কখনো ছিন্ন হয়নি। আজকে থাকছে কালজয়ী এই গীতিকারের লেখা পাঁচটি গানের কথা বা লিরিক্স।
কবিতা থেকে গান: তোরে পুতুলের মতো করে সাজিয়ে সৃষ্টির গল্প
আবদুল্লাহ আল মামুনের সংগীতযাত্রার শুরু কবিতায়। ১৯৭৭ সালে কলেজে এইচএসসির দ্বিতীয় বর্ষে পড়ার সময় এক তরুণীর প্রতি মুগ্ধতা থেকেই জন্ম নেয় একটি কবিতা। ১৩ ফেব্রুয়ারি লেখা সেই কবিতার প্রথম দুটি লাইন তোরে পুতুলের মতো করে সাজিয়ে আমি হৃদয়ের শো কেসে রাখব। নকীব খানের পরামর্শে সামান্য শব্দ বদলে কবিতাটি রূপ নেয় গানে শো কেসে হয়ে যায় কোঠরে। গানটির সুর মিউজিক করেন নকীব খান নিজেই। অনেকের মধ্যেই একটি প্রচলিত ভুল ধারণা রয়েছে কুমার বিশ্বজিৎ সোলস ব্যান্ডের সদস্য ছিলেন। বাস্তবতা কিন্তু ভিন্ন। যতটুকু জানি কুমার বিশ্বজিৎ কখনোই সোলসের স্থায়ী বা আনুষ্ঠানিক সদস্য ছিলেন না। শুরুতে তিনি যুক্ত ছিলেন ফিলিংস ব্যান্ডের সঙ্গে। এরপর তিনি পুরোটা সময়ই নিয়ে নিজের সলো ক্যারিয়ার গড়ে তুলেছেন। সোলসের সঙ্গে তাঁর নাম জড়িয়ে যাওয়ার পেছনে একটি বিশেষ ঘটনা রয়েছে। বন্ধুত্বের খাতিরে সোলস ব্যান্ডের অ্যালবাম প্রকাশের আগেই তাদের একটি গান টেলিভিশনে গেয়ে ফেলেন। সেই গানটি ছিল তোরে পুতুলের মতো করে সাজিয়ে’। টিভিতে প্রচারের পরপরই গানটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায় এবং কুমার বিশ্বজিতের কণ্ঠেই শ্রোতাদের মনে গেঁথে যায়। পরবর্তীতে গানটি সোলসের অ্যালবামে অন্তর্ভুক্ত হলেও শ্রোতাদের কাছে এটি কুমার বিশ্বজিতের গান হিসেবেই পরিচিত হয়ে ওঠে। বাকিটা ইতিহাস।
মুখরিত জীবনের চলার বাঁকে: সাগরপাড়ের শৈশব ও প্রকৌশলী গীতিকার
প্রথম সাফল্যের পর মামুনের ভেতরের সৃষ্টিশীলতা আরও নানা রূপে প্রকাশ পায়। সাগরপাড়ে বেড়ে ওঠা শৈশবের স্মৃতি তাঁকে টানে নতুন গানের দিকে। ১৯৭৭ সালের ২৪ আগস্ট লেখা মুখরিত জীবনের চলার বাঁকে। নকীব খানের সুরে ও সোলসের তপন চৌধুরী ও নকীব খানের যৌথ কণ্ঠে বাংলা গানের ভাণ্ডারে যুক্ত হয় আরেকটি কালজয়ী গান। একইভাবে নকীব খানের কণ্ঠে ছোট্ট বেলার সাথী গানটিও শ্রোতামহলে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। তবে গান ও কবিতার এই যাত্রা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। পেশাগত জীবনের টানে মামুন ভর্তি হন তৎকালীন চট্টগ্রাম ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে। প্রকৌশল শিক্ষা, শিক্ষকতা এবং পরবর্তীতে উচ্চশিক্ষা ও জীবিকার প্রয়োজনে অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমান তিনি। ব্যস্ত প্রবাসজীবনে গান লেখা থেমে গেলেও সংগীতের সঙ্গে তাঁর আত্মিক সম্পর্ক কখনো ছিন্ন হয়নি। তাঁর লেখা গানগুলোই যেন বাংলাদেশের সংগীতজগতের সঙ্গে অদৃশ্য এক সেতুবন্ধন হয়ে রইল।
গীতিকবি আবদুল্লাহ আল মামুনের লেখা পাঁচটি শ্রেষ্ঠ গান
🟨0️⃣1️⃣ তোরে পুতুলের মতো করে সাজিয়ে
ব্যান্ড: সোলস, অ্যালবাম: সুপার সোলস (১৯৮২), কণ্ঠ: নকিব খান।
🟨0️⃣2️⃣ মুখরিত জীবনে চলার বাঁকে
ব্যান্ড: সোলস, অ্যালবাম: সুপার সোলস (১৯৯২), কণ্ঠ: তপন চৌধুরী ও নকিব খান।
🟨0️⃣3️⃣ ভুলে গেছ তুমি
ব্যান্ড: সোলস, অ্যালবাম: সুপার সোলস (১৯৮২), কণ্ঠ: তপন চৌধুরী।
🟨0️⃣4️⃣ ছোট্ট বেলার সাথি
ব্যান্ড: রেনেসাঁ, অ্যালবাম: রেনেঁসা (১৯৮৮), কণ্ঠ: নকিব খান।
🟨0️⃣5️⃣ আমার যা কিছু আছে
ব্যান্ড: রেনেসাঁ, অ্যালবাম: তৃতীয় বিশ্ব (১৯৯৩) , কণ্ঠ: নকিব খান।
তোরে পুতুলের মতো করে সাজিয়ে
কথা: আবদুল্লাহ আল মামুন
ব্যান্ড: সোলস,
অ্যালবাম: সুপার সোলস (১৯৮২),
কণ্ঠ: নকিব খান
তোরে পুতুলের মত করে সাজিয়ে
হৃদয়ের কোঠরে রাখব
আর হৃদয়ের চোখ মেলে তাঁকিয়ে
সারাটি জীবন ভরে দেখব
আমি নেই নেই নেইরে
যেন তোরেই মাঝে হারিয়ে গেছি।
তোর রিণিঝিণি কাঁকণের ছন্দ
র্নিঘুম স্বপ্নে বাজেরে
তোর নন্দিত বাধনের জাগেরে
দুচোখরে জানালায় লাগেরে
তোরে রংধনুর সাত রঙে রাঙিয়ে
ফুলদানি ভরিয়ে রাখব
আর কপালেতে নীল টিপ পরিয়ে
প্রেমেরই আল্পনা আঁকব।
তোর ভাবনার করিডোরে সারা দিন
হেঁটে হেঁটে যেন আমি মরেছি
আর স্বপ্নেতে জেগে জেগে পাহারায়
অধরেতে ঠাঁই করে নিয়েছি
তোরে বুকেরই কারাগারে চিরদিন
বন্দী করেই আমি রাখব
আর শূন্য জীবনে আমারি
অনিমেষে জড়িয়ে রাখব।।
মুখরিত জীবনের চলার বাঁকে
কথা: আবদুল্লাহ আল মামুন
ব্যান্ড: সোলস,
অ্যালবাম: সুপার সোলস (১৯৮২),
কণ্ঠ: নকিব খান/তপন চৌধুরী
এই মুখরিত জীবনের চলার বাঁকে
অজানা হাজার কত কাজের ভিড়ে
ছোট্টবেলার শত রঙ করা মুখ
সুর তোলে আজও এই মনকে ঘিরে।
ঝিনুক শামুকে ভরা বালুচরে
ঢেউয়ের সাথে নেচেছি
রঙ্গিন স্বপ্নে গাঁথা স্মৃতির মালা
সৈকতে ফেলে এসেছি
ওরে ছুটে যাই চল সেই সাগর তীরে
ওরে খুঁজে নেই চল ফেলে আসা মুক্ত হীরে।
রাত্রিতে জোছনায় দাওয়ায় বসে
মজার গল্প কত শুনেছি
ডুলো ডুলো আঁখিতে আবির মেখে
স্বপ্নের জাল বুনেছি
ওরে সেইতো ভালো চোখ দুটো বুঝেছিলে
ওরে সেইতো ভালো সবকিছু ভুলেছিলে।।
ভুলে গেছ তুমি
কথা: আবদুল্লাহ আল মামুন
ব্যান্ড: সোলস,
অ্যালবাম: সুপার সোলস (১৯৮২),
কণ্ঠ: তপন চৌধুরী
ভুলে গেছো তুমি ফিরে তো আসবে না
মন বলে তবুও দেখা হবে দুজনার।
.
আশা ছিল তুমি মোরে ভালবাসবে
কখনো ভাবিনি এত দূরে দূরে সরে থাকবে
ভুলে গেছো তুমি ফিরে তো আসবে না
মন বলে তবুও দেখা হবে দুজনার।
কাছে এসে শুধু ছলনা ওগো পেয়েছি
নিরাশার মাঝে তবু তুমি আছো ওগো আমারই
ভুলে গেছো তুমি ফিরে তো আসবে না
মন বলে তবুও দেখা হবে দুজনার।
ছোট্ট বেলার সাখি
কথা: আবদুল্লাহ আল মামুন
ব্যান্ড: রেনেসাঁ
অ্যালবাম: রেনেসাঁ (১৯৮৮)
কণ্ঠ: নকীব খান
ওরে ছোট্ট বেলার সাথী
কোথায় গেলি চলে আয়
ফিরে যাই ছোট্ট বেলার
চলে আয় ফিরে যাই
ঐ ধান সিঁড়ি নদী তীরে।
ভোর হলে শেফালিরা
বুনো শাঁখে ছেয়ে রয়
চালতার বনে বনে
কেটে গেছে দিনোময়
বৈচির ছেঁড়া মালা
সেই কথা আজও কয় ক্ষণে ক্ষণে।
ধূসর রোদ্দুরে পাঠশালা ছেড়েছি
বটশাখে দোলা চেপে
কত ছবি একেঁছি
হৃদয়ের ক্যানভাসে
সেই ছবি গেঁথে রয় অনুরাগে।
আমার যা কিছু আছে
কথা: আবদুল্লাহ আল মামুন
ব্যান্ড: রেনেসাঁ
অ্যালবাম: তৃতীয় বিশ্ব (১৯৯৩)
কণ্ঠ: নকীব খান
আমার যা কিছু আছে
সবটুকু বাধা সে তো
সুরের বীণায়
ভুল করে যদি আমি
এই গান গেঁয়ে যাই
যত পারো অপবাদ তুমি
দিও আমায়।
আমার কন্ঠ যেন মিছে বালুচর
অন্তুরে বাঝে শুধু কান্নারই ঝড়
তবুও সাজানো বাগানে হতে
একটি সুরের কুসুম
তোমাদের দেবো উপহার।
এতটুকু ঠাঁই চেয়ে সবার মাঝে শুধু
রিক্ত হলাম আমি নিজের কাছে যেন
তবুও কিছুটা সময় দিও তোমরা আমায়
গানখানি শুনিযে যাবার।।
সংগীতের বাইরেও আবদুল্লাহ আল মামুন এক বহুমাত্রিক মানুষ। সফল প্রকৌশলী হিসেবে ২০১৩ সালে যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত মিলেনিয়াম ম্যাগাজিনের চোখে সেরা অনাবাসী বাংলাদেশিদের একজন হিসেবে নির্বাচিত হন তিনি। পাশাপাশি সিডনিরবাংলা কমিউনিটি রেডিওর পথিকৃৎ দক্ষ রেডিও সাংবাদিক ও উপস্থাপক হিসেবেও তাঁর অবদান স্মরণীয়। সব মিলিয়ে আবদুল্লাহ আল মামুনের জীবন একের ভেতরে অনেক কবি, গীতিকার, প্রকৌশলী, রেডিও ব্যক্তিত্ব এবং এখন কণ্ঠশিল্পী। ২০১৬ সালে প্রকাশিত হয় তার কবি গীতিকার থেকে সঙ্গীত শিল্পী প্রকাশের প্রথম অ্যালবাম তোমার জন্য।
