বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলো শুধু জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রই নয়। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও চেতনারও প্রাণকেন্দ্র। স্বাধীনতার সংগ্রামে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, গবেষক ও সংস্কৃতিকর্মীদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই ইতিহাসকে আজও দৃশ্যমান করে রেখেছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে স্থাপিত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ভাস্কর্যসমূহ। এসব ভাস্কর্য একদিকে যেমন শিল্পিত নান্দনিকতার উদাহরণ। ঠিক অন্যদিকে তেমনি তুলে ধরে ১৯৭১-এর বীরত্ব ত্যাগ ও সংগ্রামের সত্য কাহিনি। প্রতিটি ভাস্কর্য যেন পাঠ্যবইয়ের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা এক জীবন্ত দলিল। যার মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান, শহীদদের স্মৃতি আর স্বাধীনতার স্বপ্ন নতুন করে উজ্জীবিত হয় প্রতিদিন। বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ভাস্কর্যগুলো শুধু অতীত স্মরণ করায় না সাথে আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে জাগ্রত থাকার অনুপ্রেরণাও জোগায়।
বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে স্থাপিত মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্যগুলো একেকটি ইতিহাস সমৃদ্ধ প্রতীক। এগুলো শুধু শিল্পকর্ম নয় মুক্তিযুদ্ধের নানা অধ্যায়কে দৃশ্যমান করে তোলার এক অনন্য মাধ্যম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের প্রায় সব উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই রয়েছে এমন ভাস্কর্য যা যুগে যুগে সংগ্রামী মানুষের আবেগ, ত্যাগ ও প্রতিরোধকে ধারণ করে দাঁড়িয়ে আছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাস্কর্যগুলোর একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য রয়েছে প্রতিটি শিল্পকর্মের নিজস্ব গল্প ও বার্তা রয়েছে। কোথাও প্রতীকী ভঙ্গিতে তুলে ধরা হয়েছে স্বাধীনতার সংগ্রামী চেতনা। কোথাও শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মৃতির অমরত্ব আবার কোথাও নারী মুক্তিযোদ্ধাদের ভূমিকার প্রতি শ্রদ্ধা। অনেক ভাস্কর্যই নির্মিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধকালীন ঘটনার প্রত্যক্ষ অনুপ্রেরণায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশকে শুধু সৌন্দর্যমণ্ডিতই করে না সাথে শিক্ষার্থীদের ইতিহাসভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি বিকাশে ভূমিকা রাখে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ভাস্কর্যগুলো ইতিহাসের পাঠকে আরও জীবন্ত করে তোলে এবং ক্যাম্পাসজুড়ে স্বাধীনতার চেতনা ছড়িয়ে দেয়। আজকে পর্বে থাকছে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর ক্যাম্পাসের থাকা মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্যের পরিচিতি।
অপরাজেয় বাংলা
- অবস্থান: কলা ভবন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
- ভাস্কর: সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ
- বৈশিষ্ট্য: এটি বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং জনপ্রিয় ভাস্কর্য। এতে তিনজন মানুষের অবয়ব দেখা যায়: মাঝখানে একজন সুঠামদেহী কৃষক মুক্তিযোদ্ধা, যার হাতে থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল। ডানে একজন ছাত্রী, যার হাতে ফার্স্ট এইড বক্স (সেবা ও মমতার প্রতীক)। বামে একজন ছাত্র মুক্তিযোদ্ধা, যার হাতে রাইফেল।
- তাৎপর্য: এই ভাস্কর্যটি সমাজের সকল স্তরের মানুষের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের চিত্র তুলে ধরে। এটি ১৯৭৩ সালে শুরু হয়ে ১৯৭৯ সালে বিজয় দিবসে উদ্বোধন করা হয়।
স্বাধীনতা সংগ্রাম
- অবস্থান: সলিমুল্লাহ হল, জগন্নাথ হল ও ফুলার রোডের দ্বীপ সংলগ্ন এলাকা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
- ভাস্কর: শামীম শিকদার
- বৈশিষ্ট্য: এটি বাংলাদেশের বৃহত্তম ভাস্কর্য গুচ্ছ। প্রধান ভাস্কর্যটির উচ্চতা প্রায় ৭০ ফুট এবং পরিধি প্রায় ৪০ ফুট। মূল ভাস্কর্যের চারপাশে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন মনীষী, বীর ও বিপ্লবীদের ছোট ছোট অসংখ্য প্রতিকৃতি রয়েছে।
- তাৎপর্য: ৫২-এর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত দীর্ঘ লড়াইয়ের ইতিহাস এবং পৃথিবীর মুক্তিকামী মানুষের সংগ্রামকে এখানে এক সুতোয় গাঁথা হয়েছে। ১৯৯৯ সালে এটি উদ্বোধন করা হয়।
স্বোপার্জিত স্বাধীনতা
- অবস্থান: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (টিএসসি), ঢাকা
- ভাস্কর: শামীম শিকদার
- বৈশিষ্ট্য: এটি টিএসসির সড়ক দ্বীপে অবস্থিত। ভাস্কর্যটিতে একাত্তরের সেই ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে—যেখানে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং তাদের দোসরদের দ্বারা বাঙালিদের ওপর চালানো নির্যাতনের কিছু দৃশ্য রয়েছে। একই সাথে এতে কৃষাণ-কৃষাণীদের সাহসী অবয়বও দেখা যায়।
- তাৎপর্য: পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে নিজ অর্জনে স্বাধীনতা লাভের যে ত্যাগ, সেই স্মৃতিকে অম্লান করে রাখাই এই ভাস্কর্যের মূল উদ্দেশ্য। এটি রাজু ভাস্কর্যের ঠিক বিপরীত দিকে অবস্থিত।
- অবস্থান: সিনেট ভবনের দক্ষিণ পাশে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
- ভাস্কর: নিতুন কুণ্ডু
- বৈশিষ্ট্য: এটি বাংলাদেশের অন্যতম বৃহত্তম এবং নান্দনিক ভাস্কর্য। একটি আয়তাকার বেদির ওপর দুজন বীর মুক্তিযোদ্ধার অবয়ব ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। একজনের হাতে রাইফেল এবং অন্যজন রাইফেলের কুন্দা ধরে জয়োল্লাসে মত্ত। পেছনে ৩৬ ফুট উচ্চতার একটি দেয়াল রয়েছে যাতে বৃত্তাকার শূন্যতা সূর্যের প্রতীক হিসেবে কাজ করে। সাল: ১৯৯১।
- তাৎপর্য: কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের 'সাবাস বাংলাদেশ, এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়' কবিতার পঙক্তি থেকে এর নামকরণ। এটি উত্তরবঙ্গের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার এক অনন্য স্মারক।
বিদ্যার্ঘ
- অবস্থান: শহীদ হবিবুর রহমান হল প্রাঙ্গণ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
- ভাস্কর: শাওন সগীর সাগর
- বৈশিষ্ট্য: এটি মূলত শহীদ হবিবুর রহমানের স্মৃতি স্মরণে নির্মিত একটি স্মৃতিস্তম্ভ। এতে একটি কলম এবং তার সাথে জ্ঞান অন্বেষণের প্রতীকি স্থাপত্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।সাল: ২০১১।
- তাৎপর্য: শহীদ হবিবুর রহমান ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের শিক্ষক, যাকে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনী হত্যা করেছিল। তাঁর মেধা এবং আত্মত্যাগের সম্মানার্থেই এই 'বিদ্যার্ঘ' (বিদ্যার অর্ঘ্য বা উপহার) উৎসর্গ করা হয়েছে।
স্ফুলিঙ্গ
- অবস্থান: শহীদ শামসুজ্জোহা হল প্রাঙ্গণ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
- ভাস্কর: কনক কুমার পাঠক
- বৈশিষ্ট্য: এটি একটি আধুনিক ঘরানার ভাস্কর্য। এতে আগুনের লেলিহান শিখা বা স্ফুলিঙ্গের একটি বিমূর্ত রূপ তুলে ধরা হয়েছে।সাল: ২০১২।
- তাৎপর্য: ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের মহানায়ক শহীদ ড. শামসুজ্জোহার স্মৃতিকে চিরজাগরূক রাখতে এটি নির্মিত। ড. জোহার সেই ঐতিহাসিক আত্মত্যাগ তৎকালীন ছাত্র আন্দোলনের মধ্যে যে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে দিয়েছিল, এই ভাস্কর্যটি সেই দ্রোহ ও অনুপ্রেরণারই প্রতীক।
জয় বাংলা
- অবস্থান: শহীদ মিনার ও বুদ্ধিজীবী চত্বরের মধ্যবর্তী এলাকা, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
- ভাস্কর: সৈয়দ মোহাম্মদ সোহরাব জাহান
- বৈশিষ্ট্য: এটি চবি ক্যাম্পাসের অন্যতম আধুনিক ও শৈল্পিক ভাস্কর্য। এতে দুজন নারী ও একজন পুরুষ মুক্তিযোদ্ধাসহ মোট তিনজনের অবয়ব ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এর বিশেষ দিক হলো, নারী মুক্তিযোদ্ধাদের সক্রিয় অংশগ্রহণের বিষয়টি এখানে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখানো হয়েছে।
- তাৎপর্য: ২০১৮ সালে এটি উদ্বোধন করা হয়। এটি এমনভাবে নির্মিত যে এর উপর সূর্যের আলো পড়লে এক অনন্য দৃশ্যের সৃষ্টি হয়। মুক্তিযুদ্ধের সর্বজনীনতা এবং সমতা প্রকাশের ক্ষেত্রে এই ভাস্কর্যটি একটি মাইলফলক।
স্বাধীনতা স্মারক ভাস্কর্য
- অবস্থান: কলা ও মানববিদ্যা অনুষদ প্রাঙ্গণ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
- ভাস্কর: শিল্পী মুর্তজা বশির
- বৈশিষ্ট্য: এটি একটি বিশালাকৃতির ম্যুরালধর্মী ভাস্কর্য। এতে বাঙালির জাতীয় জীবনের বিভিন্ন সংগ্রাম, বিশেষ করে ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে রেখাচিত্র ও শৈল্পিক কারুকাজের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে।
- তাৎপর্য: শিল্পী মুর্তজা বশিরের নকশা ও দিকনির্দেশনায় এটি নির্মিত হয়। এটি মূলত বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রেক্ষাপট ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের ইতিহাসকে শৈল্পিক রূপ দেওয়ার একটি অনন্য প্রয়াস। এটি ক্যাম্পাসের অন্যতম প্রধান সাংস্কৃতিক আকর্ষণ।
স্মরণ স্মৃতিস্তম্ভ
- অবস্থান: বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রবেশদ্বার (জিরো পয়েন্ট), চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
- ভাস্কর: সৈয়দ সাইফুল কবীর
- বৈশিষ্ট্য: এটি একটি স্থাপত্যশৈলীনির্ভর স্মৃতিস্তম্ভ। এর গঠনটি অত্যন্ত জ্যামিতিক এবং ঊর্ধ্বমুখী, যা সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা জোগায়। এতে মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের নাম এবং বীরত্বের কথা স্মরণ করা হয়েছে।
- তাৎপর্য: ২০০৯ সালে এটি নির্মিত হয়। এটি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করতেই সবার নজর কাড়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারী যারা মুক্তিযুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের অম্লান স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই এই 'স্মরণ' নির্মিত হয়েছে।
সংশপ্তক
- অবস্থান: কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
- ভাস্কর: হামিদুজ্জামান খান
- বৈশিষ্ট্য: এটি ব্রোঞ্জ নির্মিত একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ভাস্কর্য। এতে একজন মুক্তিযোদ্ধার অবয়ব ফুটিয়ে তোলা হয়েছে যার একটি হাত ও একটি পা নেই, কিন্তু তিনি রাইফেল হাতে যুদ্ধের জন্য অবিচল। ১৫ ফুট উচ্চতার এই ভাস্কর্যটি একটি লাল সিরামিক ইটের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
- তাৎপর্য: 'সংশপ্তক' মানে সেই বীর যোদ্ধা, যিনি পরাজয় নিশ্চিত জেনেও শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত মরণপণ লড়াই চালিয়ে যান। ১৯৯০ সালে নির্মিত এই ভাস্কর্যটি একাত্তরের হার না মানা বীরত্বের স্মারক।
অদম্য বাংলা
- অবস্থান: খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় (খুবি) ক্যাম্পাস, খুলনা।
- ভাস্কর: গোপাল চন্দ্র পাল
- বৈশিষ্ট্য: এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশপথের পাশেই অবস্থিত। ভাস্কর্যটিতে চারজন মুক্তিযোদ্ধার অবয়ব রয়েছে, যারা রাইফেল এবং বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত পতাকা নিয়ে দৃপ্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছেন। এর নিচের বেদিতে পোড়ামাটির টেরাকোটার কাজ রয়েছে যা বাংলাদেশের ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়কে নির্দেশ করে।
- তাৎপর্য: ২০১২ সালে এটি উদ্বোধন করা হয়। এটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও অদম্য দেশপ্রেম জাগিয়ে তোলার অন্যতম প্রধান উৎস।
দুর্বার বাংলা
- অবস্থান: খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট) ক্যাম্পাস, খুলনা।
- ভাস্কর: গোপাল চন্দ্র পাল
- বৈশিষ্ট্য: এটি কুয়েট ক্যাম্পাসের ছাত্র হলের পাশে একটি দৃষ্টিনন্দন জায়গায় অবস্থিত। ভাস্কর্যটিতে তিনজন মুক্তিযোদ্ধার তেজোদীপ্ত অবয়ব চিত্রিত করা হয়েছে যারা হাতে অস্ত্র নিয়ে রণক্লান্তহীন ভঙ্গিতে বিজয়ের দিকে ধাবিত হচ্ছেন। এর উচ্চতা এবং বলিষ্ঠ স্থাপত্যশৈলী মানুষের নজর কাড়ে।
- তাৎপর্য: ২০১৩ সালে এটি উদ্বোধন করা হয়। প্রকৌশল শিক্ষার প্রাঙ্গণে এটি কেবল একটি শিল্পকর্ম নয়, বরং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সাথে দেশপ্রেমের যে অবিচ্ছেদ্য বন্ধন থাকা উচিত, এটি তারই প্রতীক।
বিজয় ৭১
- অবস্থান: শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন পাঠাগারের সামনে, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি), ময়মনসিংহ।
- ভাস্কর: শ্যামল চৌধুরী
- বৈশিষ্ট্য: এটি বাকৃবির অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। ভাস্কর্যটিতে একজন কৃষক, একজন ছাত্র এবং একজন নারী মুক্তিযোদ্ধার অবয়ব ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। পুরুষ যোদ্ধাদের হাতে রাইফেল এবং নারী মুক্তিযোদ্ধার হাতে ফার্স্ট এইড বক্স ও পতাকা রয়েছে, যা মুক্তিযুদ্ধে সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণের প্রতীক।
- তাৎপর্য: ২০০০ সালে নির্মিত এই ভাস্কর্যটি একাত্তরের সম্মিলিত বিজয়কে ধারণ করে। এর পাদদেশে সুন্দর ফোয়ারা এবং বসার জায়গা থাকায় এটি ক্যাম্পাসের একটি জনপ্রিয় মিলনমেলা।
বিমূর্ত মুক্তিযুদ্ধ
- অবস্থান: বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, ময়মনসিংহ।
- ভাস্কর: শ্যামল চৌধুরী
- বৈশিষ্ট্য: এটি আধুনিক বিমূর্ত ধারার একটি ভাস্কর্য। প্রথাগত মানুষের অবয়বের পরিবর্তে এখানে জ্যামিতিক এবং শৈল্পিক কাঠামোর মাধ্যমে যুদ্ধের ভয়াবহতা, ত্যাগের তীব্রতা এবং স্বাধীনতার আনন্দকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
- তাৎপর্য: ২০১৭ সালে এটি উদ্বোধন করা হয়। শিল্পী শ্যামল চৌধুরী এখানে প্রথাগত রূপের বাইরে গিয়ে চিন্তার খোরাক জোগানোর মতো একটি আধুনিক স্থাপত্যশৈলী ব্যবহার করেছেন, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের নান্দনিক পরিবেশকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
চেতনা ৭১
- অবস্থান: প্রশাসনিক ভবনের সামনে, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবিপ্রবি), সিলেট।
- ভাস্কর: মোবারক হোসেন নৃপাল
- বৈশিষ্ট্য: এটি সিলেটের প্রথম এবং শাবিপ্রবির প্রধান ভাস্কর্য। এতে একজন ছাত্র ও একজন ছাত্রী মুক্তিযোদ্ধার প্রতিচ্ছবি রয়েছে। ছাত্রের হাতে বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত পতাকা এবং ছাত্রীর হাতে সংবিধানের প্রতীক। তাদের দৃষ্টি ও ভঙ্গিতে আগামীর বাংলাদেশের জন্য এক দৃঢ় সংকল্পের ছাপ স্পষ্ট।
- তাৎপর্য: ২০১১ সালে নির্মিত এই ভাস্কর্যটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের আন্দোলনের ফসল। এটি কেবল একটি স্মারক নয়, বরং শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তবুদ্ধি ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার আলোকবর্তিকা।
প্রত্যায় ৭১
- অবস্থান: মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (মাভাবিপ্রবি), টাঙ্গাইল।
- ভাস্কর: মৃণাল হক
- বৈশিষ্ট্য: ভাস্কর্যটিতে একদল মুক্তিযোদ্ধার দৃঢ় ও প্রত্যয়ী অবয়ব ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। তাদের হাতে অস্ত্র এবং ভঙ্গিতে জয়ের সুনিশ্চিত বিশ্বাস প্রতিফলিত হয়েছে। ভাস্কর মৃণাল হকের চিরাচরিত শৈলী অনুযায়ী এতে মানুষের শরীরী ভাষায় বীরত্ব ও সাহসিকতা প্রাধান্য পেয়েছে।
- তাৎপর্য: ২০১২ সালে নির্মিত এই ভাস্কর্যটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে দেশপ্রেম ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য এক বিশেষ স্মারক। এটি ক্যাম্পাসের প্রবেশপথের কাছাকাছি অবস্থিত হওয়ায় আগত সবার দৃষ্টি কাড়ে।
জয় বাংলা
- অবস্থান: নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (নোবিপ্রবি), নোয়াখালী।
- ভাস্কর: দুলাল চন্দ্র গাইন
- বৈশিষ্ট্য: এটি নোবিপ্রবি ক্যাম্পাসের অন্যতম প্রধান স্থাপনা। ভাস্কর্যটিতে তিনজন মুক্তিযোদ্ধার প্রতিচ্ছবি রয়েছে, যারা রাইফেল এবং জাতীয় পতাকা নিয়ে বিজয়ের উল্লাসে মত্ত। এর স্থাপত্যশৈলী অত্যন্ত আধুনিক এবং এটি একটি সুউচ্চ বেদির ওপর স্থাপিত।
- তাৎপর্য: ২০১৩ সালে এটি উদ্বোধন করা হয়। 'জয় বাংলা' স্লোগানটি যেমন বাঙালির মুক্তির মূলমন্ত্র ছিল, এই ভাস্কর্যটিও ঠিক তেমনি নোয়াখালী অঞ্চলের তরুণদের কাছে মুক্তিযুদ্ধের অবিনাশী চেতনার প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
মুক্তবাংলা
- অবস্থান: ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি), কুষ্টিয়া।
- ভাস্কর: রশিদ আহমেদ
- বৈশিষ্ট্য: এটি দেশের অন্যতম নান্দনিক এবং ব্যতিক্রমী ভাস্কর্য। এতে সাতটি খিলান বা তোরণ রয়েছে, যা মূলত বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের সাতটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়কে (যেমন: ৫২, ৫৪, ৫৮, ৬৬, ৬৯, ৭০ ও ৭১) নির্দেশ করে। এর ওপরের অংশে একটি বৃত্তাকার কাঠামো আছে যা উদীয়মান সূর্যের প্রতীক।
- তাৎপর্য: ১৯৯৬ সালে নির্মিত এই ভাস্কর্যটি কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের একটি মাইলফলক। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তবুদ্ধি চর্চা এবং স্বাধীনতার আদর্শকে সমুন্নত রাখতেই এই 'মুক্তবাংলা'র সৃষ্টি।
বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে স্থাপিত মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্যগুলো শুধু তিচিহ্ন নয়এগুলো আমাদের পরিচয় চেতনা ও গৌরবের ধারক। এসব শিল্পকর্ম ইতিহাসকে দৃশ্যমান করে নতুন প্রজন্মকে স্বাধীনতার মূল্য ও ত্যাগের কথা মনে করিয়ে দেয় প্রতিনিয়ত। ভাস্কর্যগুলো সংরক্ষণ ও পরিচর্যা করা মানে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সত্য ও মর্যাদা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পৌঁছে দেওয়া। অন্য কোন পর্বে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রতিষ্ঠিত মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য এর স্থান ও পরিচয় তুলে ধরা হবে।
