মঙ্গল গ্রহে কখনো প্রাণের অস্তিত্ব ছিল কি না এটি জ্যোতির্বিজ্ঞানের অন্যতম বড় ও পুরনো প্রশ্ন। আজকের মঙ্গলকে দেখলে প্রাণের জন্য একেবারেই অনুপযোগী মনে হয়। পাতলা বায়ুমণ্ডল, তীব্র ঠান্ডা, তরল পানির অনুপস্থিতি এবং ক্ষতিকর মহাজাগতিক বিকিরণ। কিন্তু কোটি কোটি বছর আগে গ্রহটি কি সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল? ইতালির জাতীয় জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞান প্রতিষ্ঠান (INAF) আয়োজিত কসপার (COSPAR) সম্মেলনে সাম্প্রতিক এক গবেষণা আলোচনায় উঠে এসেছে যে উত্তরটি হয়তো আমাদের ধারণার চেয়ে কাছাকাছি। মিশনের সঙ্গে যুক্ত গবেষক তেরেজা ফরনারো জানিয়েছেন নাসার Perseverance rover এমন কিছু খনিজ ও জটিল জৈব উপাদান খুঁজে পেয়েছে, যেগুলো পৃথিবীতে সাধারণত অণুজীবের কার্যকলাপের ফলে তৈরি হয়। তবে এখনো এটি জীবনের নিশ্চিত প্রমাণ নয়, বরং একটি সম্ভাব্য জৈব-চিহ্ন (biosignature) যার প্রকৃত উৎস জানতে আরও বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
মঙ্গল কি একসময় পৃথিবীর মতো ছিল?
আজকের মঙ্গল শুষ্ক ও ঠান্ডা হলেও এর পৃষ্ঠে প্রাচীন নদীখাত, হ্রদের অববাহিকা এবং পানি প্রবাহের চিহ্ন স্পষ্ট। Perseverance যে Jezero Crater-এ কাজ করছে, সেখানেও একসময় পানি প্রবাহিত হতো বলে বিজ্ঞানীদের ধারণা। পৃথিবীতে যেখানেই পানি, রাসায়নিক শক্তির উৎস আর উপযুক্ত পরিবেশ একসঙ্গে মেলে, সেখানেই অণুজীবের অস্তিত্ব দেখা যায়। তাই মঙ্গলের অতীতেও দীর্ঘ সময় তরল পানি ও প্রয়োজনীয় রাসায়নিক উপাদান থেকে থাকলে, অন্তত অণুজীবের বসবাসযোগ্য পরিবেশ তৈরি হয়ে থাকার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। Perseverance-এর মূল লক্ষ্যই এমন প্রাচীন পরিবেশের সন্ধান করা।
Cheyava Falls” পাথরের রহস্য
২০২৪ সালের জুলাইয়ে Perseverance একটি অস্বাভাবিক পাথর খুঁজে পায়, যার নাম দেওয়া হয় “Cheyava Falls”। পাথরটিতে ছোট ছোট দাগ দেখা যায়, যেগুলো দেখতে অনেকটা চিতাবাঘের গায়ের দাগের মতো তাই এদের বলা হচ্ছে “leopard spots”। রোভারের PIXL ও SHERLOC যন্ত্র পাথরটি বিশ্লেষণ করে তাতে দুটি উল্লেখযোগ্য খনিজের উপস্থিতি শনাক্ত করে vivianite ও greigite। পৃথিবীতে vivianite সাধারণত জলাভূমি ও জৈব পদার্থের ক্ষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত পরিবেশে পাওয়া যায়, আর কিছু অণুজীব greigite তৈরির সঙ্গে যুক্ত রাসায়নিক প্রক্রিয়া ঘটাতে পারে। এই খনিজগুলো এমন এক রাসায়নিক বিন্যাসে পাওয়া গেছে, যা মাইক্রোবিয়াল শক্তি-উৎপাদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
Sapphire Canyon” নমুনা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
Cheyava Falls পাথর থেকে সংগ্রহ করা নমুনার নাম দেওয়া হয়েছে “Sapphire Canyon”। ২০২৫ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় নাসা জানায়, দীর্ঘ এক বছরের বিশ্লেষণের পরও এই নমুনাটিকে মঙ্গলে প্রাচীন অণুজীবের কর্মকাণ্ডের সম্ভাব্য চিহ্ন বহনকারী সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রার্থী হিসেবে দেখা হচ্ছে। এখানেই আসে গুরুত্বপূর্ণ শব্দটি potential biosignature, অর্থাৎ সম্ভাব্য জৈব-চিহ্ন। এর মানে এই নয় যে বিজ্ঞানীরা মঙ্গলে প্রাণ খুঁজে পেয়েছেন, বরং নমুনায় এমন কিছু বৈশিষ্ট্য পাওয়া গেছে যার একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হতে পারে জীবনের উপস্থিতি। একই বৈশিষ্ট্য জীব ছাড়াও তৈরি হতে পারে কি না, তা এখনও পরীক্ষা করে দেখা প্রয়োজন। সংক্ষেপে: সম্ভাব্য জীবনের চিহ্ন পাওয়া যাওয়া আর মঙ্গলে জীবন নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হওয়া এই দুটো এক বিষয় নয়।
প্রাণ থেকে থাকলে অণুজীবই থাকত
মঙ্গলে প্রাণ থাকলেও তা পৃথিবীর মতো জটিল কোনো প্রাণী হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। বিজ্ঞানীদের ধারণা, তা হয়তো ছিল অতি ক্ষুদ্র অণুজীব, যারা হয়তো মাটির গভীরে বসবাস করত। কারণ মঙ্গলের পৃষ্ঠ দীর্ঘদিন ধরে সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি ও মহাজাগতিক বিকিরণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কিন্তু ভূগর্ভে তুলনামূলক সুরক্ষিত পরিবেশ থাকতে পারে। পৃথিবীতেও এমন অণুজীব আছে যারা সূর্যালোক ছাড়াই কেবল পাথর ও রাসায়নিক বিক্রিয়া থেকে শক্তি সংগ্রহ করে বাঁচে।
তাহলে কি Perseverance প্রাণ খুঁজে পেয়েছে?
সংক্ষিপ্ত উত্তর: না, এখনো নয়। রোভারের যন্ত্র দিয়ে বিশ্লেষণ আর পৃথিবীর উন্নত গবেষণাগারে একই নমুনা পরীক্ষা করা এক বিষয় নয়। নমুনা পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা গেলে বিজ্ঞানীরা রাসায়নিক গঠন, খনিজ, জৈব অণু ও আইসোটোপিক বৈশিষ্ট্য আরও নিখুঁতভাবে পরীক্ষা করতে পারবেন, যা বুঝতে সাহায্য করবে এই বৈশিষ্ট্যগুলো প্রাণের কারণে তৈরি নাকি নিছক অজৈব ভূ-রাসায়নিক প্রক্রিয়ার ফল। Perseverance ইতিমধ্যে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নমুনা সংরক্ষণ করছে ভবিষ্যতে পৃথিবীতে ফেরত আনার জন্য, যদিও Mars Sample Return কর্মসূচির সময়সূচি নিয়ে পরিবর্তন ও অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
মাটির আরও গভীরে যাবে Rosalind Franklin
ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার (ESA) ExoMars Rosalind Franklin রোভার এই রহস্য সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ২০২৮ সালে উৎক্ষেপণ ও ২০৩০ সালে মঙ্গলে অবতরণের পরিকল্পনা রয়েছে। এই রোভারের বিশেষত্ব হলো এর ড্রিল, যা মাটির প্রায় ২ মিটার গভীর পর্যন্ত নমুনা সংগ্রহ করতে সক্ষম এখনকার রোভারগুলোর তুলনায় অনেক বেশি গভীরে। যেহেতু ভূগর্ভের পরিবেশ পৃষ্ঠের তুলনায় বিকিরণ থেকে অনেক বেশি সুরক্ষিত, তাই সেখানে সংরক্ষিত জৈব অণু বা সম্ভাব্য biosignature খুঁজে পাওয়ার সুযোগ বেশি বলে মনে করা হচ্ছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত
জীবন কি কেবল পৃথিবীতেই জন্মেছিল? যদি ভবিষ্যৎ গবেষণায় প্রমাণিত হয় যে মঙ্গলে কখনো অণুজীব ছিল, তাহলে তা হবে মানবজাতির ইতিহাসে এক যুগান্তকারী আবিষ্কার পৃথিবীর বাইরে জীবনের প্রথম শক্তিশালী প্রমাণ। আর যদি শেষমেশ দেখা যায় এসব বৈশিষ্ট্য পুরোপুরি অজৈব প্রক্রিয়ায় তৈরি, তবুও আবিষ্কারটি কম গুরুত্বপূর্ণ হবে না কারণ তখন বোঝা যাবে, জীবনের মতো দেখতে রাসায়নিক চিহ্ন প্রকৃতিতেও সৃষ্টি হতে পারে, যা অন্য গ্রহে জীবন খোঁজার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেবে।
চূড়ান্ত উত্তর কী?
আজকের বৈজ্ঞানিক প্রমাণ বলছে মঙ্গলে একসময় প্রাণের উপযোগী পরিবেশ ছিল, এর পক্ষে যথেষ্ট শক্তিশালী প্রমাণ আছে। কিন্তু সেখানে সত্যিই প্রাণ ছিল কি না, তা এখনো নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়নি। Cheyava Falls ও Sapphire Canyon নমুনা এই উত্তরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্রগুলোর একটি, তবে আপাতত এগুলোকে সম্ভাব্য biosignature হিসেবেই দেখা হচ্ছে। প্রশ্নটি তাই আর কেবল মঙ্গলে কি জীবন ছিল নয় বরং মঙ্গলের কোন পাথর শেষ পর্যন্ত পৃথিবীর বাইরে জীবনের প্রথম নিশ্চিত প্রমাণ হয়ে উঠবে?
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
প্রশ্ন ১: “Cheyava Falls” পাথরটি কী এবং এটি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
উত্তর: এটি Jezero Crater-এ পাওয়া একটি পাথর, যাতে "leopard spots" নামে পরিচিত অদ্ভুত দাগ এবং vivianite, greigite-এর মতো খনিজ পাওয়া গেছে, যেগুলো অণুজীবের কার্যকলাপের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে।
প্রশ্ন ২: “Sapphire Canyon” নমুনা কী?
উত্তর: এটি Cheyava Falls পাথর থেকে Perseverance রোভারের সংগ্রহ করা নমুনা, যাকে মঙ্গলে প্রাচীন প্রাণের সম্ভাব্য চিহ্ন বহনকারী সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
প্রশ্ন ৩: “potential biosignature” মানে কি প্রাণ পাওয়া গেছে?
উত্তর: না। এর অর্থ, নমুনায় এমন বৈশিষ্ট্য পাওয়া গেছে যার একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা জীবন হতে পারে, তবে অজৈব প্রক্রিয়াতেও একই বৈশিষ্ট্য তৈরি হওয়া সম্ভব কি না, তা এখনও যাচাই করা বাকি।
প্রশ্ন ৪: Rosalind Franklin রোভার কবে মঙ্গলে পৌঁছাবে এবং এর বিশেষত্ব কী?
উত্তর: ২০২৮ সালে উৎক্ষেপণ ও ২০৩০ সালে অবতরণের পরিকল্পনা রয়েছে। এর প্রধান বিশেষত্ব হলো মাটির প্রায় ২ মিটার গভীরে ড্রিল করে নমুনা সংগ্রহের ক্ষমতা।
প্রশ্ন ৫: মঙ্গল থেকে নমুনা পৃথিবীতে আনা কেন জরুরি?
উত্তর: কারণ রোভারের যন্ত্রপাতির চেয়ে পৃথিবীর গবেষণাগারের যন্ত্র অনেক বেশি নিখুঁত বিশ্লেষণ করতে পারে, যা প্রাণের চিহ্ন আর অজৈব প্রক্রিয়ার মধ্যে পার্থক্য নিশ্চিত করতে সাহায্য করবে।
আরও পড়ুন:
- প্রাচীন বিশ্বের সপ্তাশ্চর্য: হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস
- স্টোনহেঞ্জের ৫ হাজার বছরের রহস্য: উত্তর
- পৃথিবীতে ভিনগ্রহীর প্রাচীন চিহ্ন ও অন্যান্য রহস্য
- স্টিফেন হকিংয়ের ভবিষ্যদ্বাণী: সত্যি হওয়ার পথে?
- ইউনিয়ন জ্যাক পতাকা: ইতিহাস, নকশা
- যুক্তরাজ্য, গ্রেট ব্রিটেন ও ইংল্যান্ডের পার্থক্য কী?
- বাংলাদেশের ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য: ইতিহাস

