সাইক্লপস, সাইরেন, সার্সি, ক্যালিপসো নামগুলো শুনলেই মনে হয় নিখাদ কল্পনা। কিন্তু হোমারের "ওডিসি" মহাকাব্যের পেছনে লুকিয়ে আছে ভূমধ্যসাগরের এমন কিছু জায়গা। যেগুলো আজও চোখের সামনে গিয়ে দেখা সম্ভব। ক্রিস্টোফার নোলানের বহু-প্রতীক্ষিত সিনেমা "The Odyssey" মুক্তির সময়, ম্যাট ড্যামন অভিনীত ওডিসিয়াসের সেই দীর্ঘ যাত্রার গল্প আবার আলোচনায় ফিরে এসেছে। ট্রয় যুদ্ধের পর ইথাকার রাজা ওডিসিয়াস কীভাবে সাইক্লপস পলিফেমাসের মুখোমুখি হন, সাইরেনদের গান প্রতিহত করেন, জাদুকরী সার্সি ও অপ্সরা ক্যালিপসোর সংস্পর্শে আসেন। আর শেষে স্ত্রী পেনেলোপি ও পুত্র টেলেমেকাসের কাছে ফিরে যান। এই পুরো যাত্রার পেছনে আসলে গ্রিস থেকে সিসিলি পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা সত্যিকারের পাহাড়, দ্বীপ আর গুহা। সিনেমার শুটিং লোকেশন নয়, বরং সেই কিংবদন্তিগুলোর মূল উৎস বলে মনে করা জায়গাগুলোর দিকেই এই পোস্টে চোখ রাখা যাক।
ইথাকা: ওডিসিয়াসের রাজ্য
ওডিসিয়াসের নাম শুনলেই যে দ্বীপটার কথা মনে আসে, সেটা হোমারের কল্পনা নয়। আয়োনিয়ান দ্বীপপুঞ্জের একেবারে হৃৎপিণ্ডে, কেফালোনিয়া থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে, ইথাকা আজও বাস্তবেই আছে। কিংবদন্তি বলে, ট্রয়ের যুদ্ধে যাওয়ার আগে ওডিসিয়াস এখানেই রাজত্ব করতেন। আর দশ বছর ভূমধ্যসাগর জুড়ে ঘুরে বেড়ানোর পর এখানেই স্ত্রী পেনেলোপির সঙ্গে তার পুনর্মিলন ঘটে। দ্বীপের বিভিন্ন জায়গা আজও এই গল্পকে জিইয়ে রেখেছে আরেথুসা ফাউন্টেন, যেখানে ওডিসিয়াসের রাখাল ইউমেয়াস তার পশুদের পানি খাওয়াতেন; নিম্ফদের গুহা। যেখানে ফিয়াশিয়ানদের দেওয়া উপহার ওডিসিয়াস লুকিয়ে রেখেছিলেন বলে কথিত। আর লোইজোস গুহা, যেখানে খননকাজে অ্যাথেনা, আর্তেমিস আর হেরার উদ্দেশে উৎসর্গীকৃত প্রত্নবস্তু পাওয়া গেছে। পুরাণের বাইরেও ইথাকা আজ পরিচিত তার শান্ত পরিবেশ, জলপাই গাছে ছাওয়া রুক্ষ ভূমি আর ছবির মতো ছোট ছোট বন্দরের জন্য।
চিরচেও ন্যাশনাল পার্ক: জাদুকরী সার্সির পায়ের ছাপ
রোম থেকে মাত্র দেড় ঘণ্টার দূরত্বে ইতালির উপকূলের সবচেয়ে সুন্দর প্রাকৃতিক এলাকাগুলোর একটি চিরচেও ন্যাশনাল পার্ক। বিশাল মন্টে চিরচেও পাহাড়ে ঘেরা এই পাথুরে ভূখণ্ড টাইরেনিয়ান সাগরে এমনভাবে নেমে গেছে যে দূর থেকে নাবিকদের কাছে একে দ্বীপের মতো মনে হতো। এই কারণেই অনেক ইতিহাসবিদ একে সার্সির কিংবদন্তি দ্বীপ "এয়িয়া"-র সঙ্গে মিলিয়ে দেখেন। ওডিসিতে সার্সি তার জাদুকরী পানীয় দিয়ে ওডিসিয়াসের সঙ্গীদের শূকরে পরিণত করেন। হারমিসের দেওয়া এক জাদুকরী গাছের গুণে একা ওডিসিয়াসই সেই মায়া থেকে বেঁচে যান আর সার্সিকে বাধ্য করেন তার নাবিকদের মানুষে ফিরিয়ে দিতে। ওডিসিয়াসের সাহসে মুগ্ধ হয়ে সার্সি তাকে পুরো এক বছর নিজের কাছে রাখেন। তারপর পাতালপুরীর পথ দেখিয়ে দেন। আজও চিরচেও-র বন, খাড়া পাহাড় আর সমুদ্রতট সেই রহস্যময় আবহ ধরে রেখেছে।
লি গালি: সাইরেনদের দ্বীপপুঞ্জ
আমালফি উপকূলের পজিতানোর কাছে ভেসে থাকা তিনটি ছোট পাথুরে দ্বীপ লি গালি বা লে সাইরেনুসে। প্রাচীনকাল থেকেই ওডিসির সবচেয়ে জনপ্রিয় অধ্যায় সাইরেনদের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। হোমারের বর্ণনায় এই কিংবদন্তি সত্তারা অর্ধেক নারী, অর্ধেক মাছ (কোনো কোনো বিবরণে অর্ধেক পাখি) এবং তাদের গানের মায়ায় নাবিকদের জাহাজ পাথরে ধ্বংস করে দিতেন। সার্সির সতর্কবার্তা পেয়ে ওডিসিয়াস এক অসাধারণ পরিকল্পনা করেন। সঙ্গীদের কানে মোম লাগিয়ে দেন আর নিজেকে জাহাজের মাস্তুলে বেঁধে রাখেন। যাতে সাইরেনদের গান শুনেও তার প্রভাবে বশ না হন। বর্তমানে ব্যক্তিগত মালিকানায় থাকা এই দ্বীপপুঞ্জ জনসাধারণের জন্য বন্ধ, তবে সমুদ্র থেকে স্পষ্ট দেখা যায়।
মেসিনা প্রণালী: সাইলা ও কারিবডিসের আস্তানা
সিসিলি আর কালাব্রিয়ার মাঝে মেসিনা প্রণালী ভূমধ্যসাগরের সবচেয়ে বিপজ্জনক জলপথগুলোর একটি। প্রবল স্রোত, অনিশ্চিত ঘূর্ণি আর ধারালো প্রাচীরের কারণে প্রাচীনকালেই এখানে দুই ভয়ংকর সত্তার কল্পনা করা হয়েছিল সাইলা আর কারিবডিস। ওডিসিতে সার্সি ওডিসিয়াসকে সতর্ক করেন যে তাকে দুটি খারাপের মধ্যে কম খারাপটা বেছে নিতে হবে। এক দিকে কারিবডিস, যে বিশাল সামুদ্রিক দানব ঘূর্ণির মধ্যে জাহাজ টেনে নেয়; আর অন্য দিকে সাইলা, ছয়-মাথার দানব, যে পাহাড়ের গুহায় ঘাপটি মেরে থেকে জাহাজের পাশ দিয়ে যাওয়া নাবিকদের ছোঁ মেরে তুলে নেয়। ওডিসিয়াস কারিবডিসকে এড়াতে পারলেও সাইলার হাতে তার ছয় সঙ্গীকে হারাতে হয়।
আচি ত্রেজ্জা: সাইক্লপস পলিফেমাসের গুহা
সিসিলির কাতানিয়া থেকে প্রায় দশ কিলোমিটার দূরে আচি ত্রেজ্জা গ্রামের সামনে সমুদ্র থেকে উঠে আসা কিছু বিশাল আগ্নেয় পাথরস্তম্ভ দেখা যায়। "সাইক্লপস রক্স" নামে পরিচিত এই বেসাল্ট পাথরগুলো নিয়ে কিংবদন্তি বলে দানব পলিফেমাস এগুলোই ছুঁড়ে মেরেছিলেন ওডিসিয়াসের জাহাজের দিকে। ওডিসিতে ওডিসিয়াস আর তার সঙ্গীরা পসেইডনের পুত্র পলিফেমাসের গুহায় আশ্রয় নেন। দানবের আস্তানায় বন্দি হয়ে ওডিসিয়াস এক বিখ্যাত কৌশল নেন। পলিফেমাসকে মদ খাইয়ে বেহুঁশ করে আগুনে গরম করা একটা লাঠি দিয়ে তার একমাত্র চোখ অন্ধ করে দেন। তারপর সাইক্লপসের ভেড়াগুলোর পেটের নিচে লুকিয়ে গ্রিকরা পালিয়ে যায়। রাগে পলিফেমাস বিশাল পাথরের চাঁই তুলে সমুদ্রে ছুঁড়ে মারেন জাহাজ ডোবানোর চেষ্টায়।
গোজো: ক্যালিপসোর দ্বীপ
মাল্টার তুলনায় কম পরিচিত হলেও গোজো দ্বীপকে অনেকে চিহ্নিত করেন ওগিজিয়া হিসেবে। যে দ্বীপে ক্যালিপসো সাত বছর ওডিসিয়াসকে ধরে রেখেছিলেন। হোমারের বর্ণনায়, জাহাজডুবি থেকে বাঁচিয়ে এই দেবী ওডিসিয়াসের প্রেমে পড়েন, এমনকি তাকে অমরত্বের প্রতিশ্রুতিও দেন যদি সে চিরকাল তার কাছে থেকে যায়। কিন্তু ওডিসিয়াসের একমাত্র চাওয়া ছিল ইথাকায়, স্ত্রী পেনেলোপি আর পুত্র টেলেমেকাসের কাছে ফিরে যাওয়া। শেষে দেবতারা ক্যালিপসোকে তাকে মুক্তি দিতে বাধ্য করেন। আজ রামলা বে-র উপরে একটা প্রাকৃতিক গুহাকে "ক্যালিপসোর গুহা" বলা হয়, যেখান থেকে দেখা দৃশ্য হোমারের প্রায় তিন হাজার বছর আগের বর্ণনার সঙ্গে বিস্মিত করার মতো মিলে যায়। এর চেয়েও বিস্ময়কর, প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে হারিয়ে যাওয়া এক সভ্যতার তৈরি ইগান্তিজার মেগালিথিক মন্দিরচত্বর যা উর্বরতার সঙ্গে জড়িত বলে মনে করা হয়।
উপসংহার
হোমারের ওডিসি শুধু কল্পনার গল্প নয়, বরং ভূমধ্যসাগরের বাস্তব ভূগোলের সঙ্গে মিশে থাকা এক আশ্চর্য মহাকাব্য। গ্রিসের ইথাকা থেকে সিসিলির আচি ত্রেজ্জা, ইতালির চিরচেও থেকে মাল্টার গোজো প্রতিটা জায়গাই আজও সেই তিন হাজার বছর আগের রহস্য আর সৌন্দর্যকে ধরে রেখেছে। ক্রিস্টোফার নোলানের সিনেমা যেসব দর্শককে নতুন করে ওডিসিয়াসের গল্পের সঙ্গে পরিচিত করাবে, তাদের জন্য এই ছয়টি জায়গা হতে পারে বাস্তব জগতে সেই মহাকাব্যকে ছুঁয়ে দেখার এক দুর্দান্ত অভিযান।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
প্রশ্ন: ওডিসিয়াসের ইথাকা কি বাস্তব দ্বীপ?
উত্তর: হ্যাঁ, ইথাকা গ্রিসের আয়োনিয়ান দ্বীপপুঞ্জের একটি বাস্তব দ্বীপ।
প্রশ্ন: সাইরেনদের দ্বীপ হিসেবে কোন স্থানকে মনে করা হয়?
উত্তর: ইতালির আমালফি উপকূলের কাছে লি গালি দ্বীপপুঞ্জকে সাইরেনদের কিংবদন্তির সঙ্গে যুক্ত করা হয়।
প্রশ্ন: সাইলা ও কারিবডিসের স্থান কোথায়?
উত্তর: সিসিলি ও কালাব্রিয়ার মাঝের মেসিনা প্রণালীকে তাদের কিংবদন্তির সম্ভাব্য উৎস মনে করা হয়।
প্রশ্ন: পলিফেমাসের সঙ্গে কোন স্থানটি যুক্ত?
উত্তর: সিসিলির আচি ত্রেজ্জার বিশাল আগ্নেয় পাথরগুলোকে সাইক্লপস পলিফেমাসের কিংবদন্তির সঙ্গে যুক্ত করা হয়।
প্রশ্ন: ক্যালিপসোর দ্বীপ হিসেবে গোজোকে কেন মনে করা হয়?
উত্তর: মাল্টার গোজো দ্বীপকে হোমারের ওগিজিয়া দ্বীপের সম্ভাব্য অবস্থান হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে চিহ্নিত করা হয়।
প্রশ্ন: ওডিসির সব স্থান কি সত্যিই প্রমাণিত?
উত্তর: না। এসব স্থানের অনেকগুলোই কিংবদন্তি বা সম্ভাব্য ঐতিহাসিক-ভৌগোলিক পরিচয়ের ওপর ভিত্তি করে চিহ্নিত করা হয়েছে।

