আজকের ডিজিটাল যুগে আমাদের প্রতিদিনের একটা বড় সময় কাটে কম্পিউটারের স্ক্রিনের সামনে। অফিসের অফিশিয়াল অ্যাসাইনমেন্ট, ফ্রিল্যান্সিং, পড়াশোনা কিংবা কন্টেন্ট রাইটিং। যেকোনো কাজই হোক না কেন দ্রুত এবং নিখুঁতভাবে শেষ করতে পারাটাই আসল দক্ষতা। কিন্তু আপনি কি জানেন মাউস দিয়ে বারবার ক্লিক করে যে কাজটি করতে ৫ সেকেন্ড সময় লাগে।
কিবোর্ডের একটিমাত্র শর্টকাট দিয়ে সেটি ১ সেকেন্ডেই করা সম্ভব? অনেকেই শুধু Ctrl + C (কপি) আর Ctrl + V (পেস্ট) এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকি। কিন্তু এর বাইরেও উইন্ডোজে এমন কিছু চমৎকার এবং জাদুকরী' শর্টকাট রয়েছে যা জানলে আপনার কাজের গতি দ্বিগুণ হয়ে যাবে। উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেমে এমন অসংখ্য শর্টকাট রয়েছে যা ফাইল ম্যানেজমেন্ট, উইন্ডো নিয়ন্ত্রণ, স্ক্রিনশট নেওয়া, মাল্টিটাস্কিং এবং বিভিন্ন সেটিংস দ্রুত অ্যাক্সেস করতে সাহায্য করে।
এসব শর্টকাট শুধু সময়ই বাঁচায় না বরং আপনার কাজের গতি ও উৎপাদনশীলতাও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করে। আজকের লেখায় আমরা উইন্ডোজের ১০টি সবচেয়ে দরকারি ও জনপ্রিয় কিবোর্ড শর্টকাট সম্পর্কে জানব। যা আপনাকে আপনার কর্মক্ষেত্রে একজন 'প্রো-ইউজার' বা মাস্টার বানিয়ে তুলবে।
উইন্ডোজ ক্লিপবোর্ড হিস্ট্রি (Win + V)
আমরা সাধারণত কোনো লেখা বা ছবি কপি করলে সেটি কেবল একবারই পেস্ট করতে পারি। নতুন কিছু কপি করলেই আগেরটা হারিয়ে যায়। কিন্তু আপনি যদি আগের কপি করা ৫-১০টি আইটেম একসাথে জমা রাখতে চান এবং যখন খুশি তখন পেস্ট করতে চান, তবে এই শর্টকাটটি আপনার জন্য লাইফসেভার।
- কীভাবে কাজ করে: কিবোর্ডের Windows Key + V একসাথে চাপুন। প্রথমবার এটি ব্যবহার করলে একটি ছোট পপ-আপ আসবে এবং 'Turn On' করতে বলবে।
- কেন ব্যবহার করবেন: এটি চালু করার পর আপনি সারাদিনে যা যা কপি (টেক্সট, লিংক, ইমেজ) করবেন, সবকিছুর একটা তালিকা এখানে জমা থাকবে। মাউস স্ক্রল করে যেকোনো পুরোনো কপিকৃত অংশ মুহূর্তে পেস্ট করে দিতে পারবেন।
কম্পিউটার বা স্ক্রিন লক করা (Win + L)
অফিসে বা কাজের মাঝে হুট করে সিট থেকে ওঠার প্রয়োজন হতেই পারে। আপনার ব্যক্তিগত ডেটা বা কাজের সুরক্ষার জন্য কম্পিউটার লক করে যাওয়া উচিত।
- কীভাবে কাজ করে: সিট থেকে ওঠার ঠিক আগ মুহূর্তে Windows Key + L চাপুন।
- কেন ব্যবহার করবেন: মাউস দিয়ে স্টার্ট মেনুতে গিয়ে লক করার চেয়ে এটি অনেক দ্রুত। মাত্র এক মিলিসেকেন্ডে আপনার পিসি লক স্ক্রিনে চলে যাবে।
অ্যাডভান্সড স্ক্রিনশট টুল (Win + Shift + S)
পুরো স্ক্রিনের ছবি তোলার জন্য আমরা অনেকেই 'Print Screen' বা 'Snipping Tool' ব্যবহার করি। কিন্তু নির্দিষ্ট কোনো অংশের নিখুঁত স্ক্রিনশট নেওয়ার সবচেয়ে দ্রুততম উপায় হলো এটি।
- কীভাবে কাজ করে: Windows Key + Shift + S একসাথে চাপলে স্ক্রিনটি কিছুটা আবছা হয়ে যাবে এবং ওপরে একটি ছোট মেনু আসবে।
- কেন ব্যবহার করবেন: মাউস ড্র্যাগ করে আপনি স্ক্রিনের যেকোনো নির্দিষ্ট অংশ (চারকোনা, ফ্রি-ফর্ম বা ফুল স্ক্রিন) সিলেক্ট করে স্ক্রিনশট নিতে পারবেন। এটি সরাসরি ক্লিপবোর্ডে সেভ হয়ে যায়, ফলে আপনি সরাসরি Ctrl + V চেপে যেকোনো চ্যাটে বা ডকুমেন্টে পেস্ট করতে পারবেন।
সব উইন্ডো নিমেষেই মিনিমাইজ করা (Win + D)
হুট করে স্ক্রিনে অনেকগুলো উইন্ডো বা ট্যাব খুলে গেছে এবং আপনি দ্রুত আপনার ডেস্কটপে ফিরতে চান? একটি একটি করে মিনিমাইজ করা অত্যন্ত বিরক্তিকর।
- কীভাবে কাজ করে: কিবোর্ডের Windows Key + D চাপুন।
- কেন ব্যবহার করবেন: এক সেকেন্ডের মধ্যে আপনার স্ক্রিনের সব রানিং অ্যাপ বা ফোল্ডার মিনিমাইজ হয়ে যাবে এবং পরিষ্কার ডেস্কটপ স্ক্রিন সামনে আসবে। আবার একই শর্টকাট চাপলে আগের উইন্ডোগুলো যেমন ছিল তেমন ফিরে আসবে।
ফাইল এক্সপ্লোরার ওপেন করা (Win + E)
কম্পিউটারে কাজ করার সময় 'This PC' বা ফাইল এক্সপ্লোরারে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে বারবার। মাউস দিয়ে মাই কম্পিউটারে ডাবল ক্লিক করার দিন শেষ।
- কীভাবে কাজ করে: সরাসরি Windows Key + E প্রেস করুন।
- কেন ব্যবহার করবেন: আপনি যে অ্যাপেই কাজ করে থাকুন না কেন, ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে সরাসরি ফাইল ম্যানেজার বা এক্সপ্লোরার উইন্ডো ওপেন হয়ে যাবে।
ইমোজি এবং স্পেশাল ক্যারেক্টার প্যানেল (Win + . অথবা Win + ;)
কন্টেন্ট রাইটিং, ব্লগিং বা সোশ্যাল মিডিয়ায় চ্যাটিং করার সময় ইমোজি বা বিশেষ কিছু চিহ্ন (যেমন: ডিগ্রি, অ্যারো, কারেন্সি সাইন) ব্যবহার করার প্রয়োজন হয়। অনেকেই গুগল থেকে এগুলো কপি করে আনেন, যার কোনো প্রয়োজনই নেই।
- কীভাবে কাজ করে: যেকোনো লেখার জায়গায় কার্সার রেখে Windows Key + . (ডট) অথবা Windows Key + ; (সেমিকোলন) চাপুন।
- কেন ব্যবহার করবেন: স্ক্রিনে একটি সুন্দর ইমোজি এবং সিম্বল প্যানেল খুলে যাবে। এখান থেকে আপনি হাজারো ইমোজি, গিফ (GIF) এবং গণিত বা ভাষার বিভিন্ন স্পেশাল ক্যারেক্টার এক ক্লিকেই লেখায় যুক্ত করতে পারবেন।
ভুল করে কেটে ফেলা ব্রাউজার ট্যাব ফিরিয়ে আনা (Ctrl + Shift + T)
ইন্টারনেটে ব্রাউজ করার সময় বা গুরুত্বপূর্ণ কোনো আর্টিকেল পড়ার সময় ভুলবশত দরকারী ট্যাবটি কেটে যাওয়া খুব সাধারণ একটি ঘটনা। হিস্ট্রি ঘেঁটে সেটা বের করা বেশ সময়সাপেক্ষ।
- কীভাবে কাজ করে: ক্রোম, এজ বা যেকোনো ব্রাউজারে থাকা অবস্থায় Ctrl + Shift + T চাপুন।
- কেন ব্যবহার করবেন: এই জাদুকরী শর্টকাটটি আপনার সদ্য বন্ধ হয়ে যাওয়া ট্যাবটিকে ঠিক আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনবে। পরপর কয়েকবার চাপলে ক্রমান্বয়ে বন্ধ হওয়া আগের ট্যাবগুলোও ফিরে আসবে।
যেকোনো উইন্ডো স্ক্রিনের একপাশে স্ন্যাপ করা (Win + Left / Right Arrow)
একই সাথে স্ক্রিনে দুটি উইন্ডো রেখে কাজ করার প্রয়োজন অনেকেরই হয়। যেমন একপাশে ইউটিউব ভিডিও বা পিডিএফ দেখে অন্য পাশে মাইক্রোসফট ওয়ার্ডে টাইপ করা।
- কীভাবে কাজ করে: বর্তমান উইন্ডোটি ওপেন রেখে Windows Key + Left Arrow (বাম তীর) অথবা Right Arrow (ডান তীর) চাপুন।
- কেন ব্যবহার করবেন: উইন্ডোটি নিখুঁতভাবে স্ক্রিনের ঠিক অর্ধেক জায়গা জুড়ে সেট হয়ে যাবে এবং বাকি অর্ধেকের জন্য অন্য অ্যাপ সিলেক্ট করার অপশন দেবে। মাউস দিয়ে টেনে উইন্ডো ছোট-বড় করার ঝামেলা একদম দূর হবে।
উইন্ডোজ সেটিংস ওপেন করা (Win + I)
কম্পিউটারের ডিসপ্লে, সাউন্ড, আপডেট বা যেকোনো সেটিংস পরিবর্তন করার জন্য স্টার্ট মেনু থেকে সেটিংসে যাওয়া বেশ ঘোরানো পথ।
- কীভাবে কাজ করে: সরাসরি Windows Key + I চাপুন।
- কেন ব্যবহার করবেন: উইন্ডোজের মেইন সেটিংস প্যানেলটি সাথে সাথে ওপেন হয়ে যাবে।
অ্যাডভান্সড বা সিক্রেট স্টার্ট মেনু (Win + X)
ডিস্ক ম্যানেজমেন্ট, ডিভাইস ম্যানেজার, পাওয়ার অপশন বা টার্মিনালের মতো অ্যাডভান্সড সিস্টেম টুলসগুলো খুঁজে পেতে সাধারণ ব্যবহারকারীদের বেশ বেগ পেতে হয়।
- কীভাবে কাজ করে: কিবোর্ডের Windows Key + X একসাথে চাপুন।
- কেন ব্যবহার করবেন: স্টার্ট আইকনের ওপরে একটি পাওয়ারফুল টেক্সট মেনু খুলে যাবে, যেখান থেকে উইন্ডোজের সব গুরুত্বপূর্ণ এডমিনিস্ট্রেটিভ টুল এক জায়গাতেই পেয়ে যাবেন।
শেষ কথা
কিবোর্ড শর্টকাট ব্যবহারের অভ্যাস কিন্তু এক দিনে তৈরি হয় না। প্রথম প্রথম হয়তো আপনার অবচেতন মনে মাউসের দিকেই হাত চলে যাবে। তবে টেকনিক হলো আজই যেকোনো ২টি শর্টকাট (যেমন: Win + V এবং Win + Shift + S) বেছে নিন।
এবং সারা দিন শুধু সেগুলোই ব্যবহার করার চেষ্টা করুন। একবার এই ১০টি শর্টকাট আপনার হাতের মুঠোয় চলে আসলে কম্পিউটার ব্যবহারের অভিজ্ঞতা বদলে যাবে পুরোপুরি! আপনার কাজের গতি বাড়বে, বাঁচবে মূল্যবান সময়।
