ফুটবল বিশ্বকাপ দেখা এবং বুঝা বলা যায় ১৯৯৮ থেকে। সেবার ব্রাজিল রানার্স আপ হয়েছিল। তার আগে ১৯৯৪ চ্যাম্পিয়ন। বিশ্বকাপের মজার সময়টা ২০০২ -এ চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। সেই ধারাবাহিকতায় ব্রাজিলের সমর্থক হয়ে আছি। ফুটবল বিশ্বে ব্রাজিল মানেই এক আবেগ এক অবিরাম সৌন্দর্যের মহাকাব্য। হলুদ জার্সির প্রতিটি যুগে সব মহাতারকার আগমন ঘটেছে।
আমি বা আমারও পেয়েছি দেখেছি সাপোর্ট করেছি।। আমার ছোট ফুটবল জ্ঞান এবং মাঠের নান্দনিকতার মেলবন্ধনে তৈরি করেছি স্বপ্নের ব্রাজিল একাদশ। আমার এই একাদশের মূল বৈশিষ্ট্য হলো ব্রাজিলের সোনালী অতীত এবং আধুনিক ফুটবলের গতিশীলতার এক অনন্য ফিউশন। এখানে যেমন আছে ১৯৯৪ থেকে ২০০২ বিশ্বজয়ী ডিফেন্স ও মিডফিল্ডের ইস্পাত-কঠিন দেয়াল।
ঠিক তেমনি আক্রমণভাগে আছে আধুনিক ফুটবলের সৃজনশীলতা ও শৈল্পিক ড্রিবলিংয়ের এক জাদুকরী সমন্বয়।আমার একাদশের সাথে আপনার স্বপ্নে একাদশের মিল হতেও পারে না হতে পারে। তবে কিছুটা হলেও কাছাকাছি থাকবে।
চূড়ান্ত একাদশ একনজরে (ফরমেশন: ৪-২-৩-১)
- গোলরক্ষক : ক্লাউডিও তাফ্যারেল
- রাইট-ব্যাক : কাফু
- সেন্টার-ব্যাক : লুসিও
- সেন্টার-ব্যাক : থিয়াগো সিলভা
- লেফট-ব্যাক : রবার্তো কার্লোস
- ডিফেন্সিভ মিডফিল্ড : ডুঙ্গা (অধিনায়ক)
- ডিফেন্সিভ মিডফিল্ড : গিলবার্তো সিলভা
- সেন্ট্রাল প্লেমেকার : কাকা
- রাইট উইঙ্গার/ফ্রি রোল : রোনালদিনহো
- লেফট উইঙ্গার : নেইমার
- স্ট্রাইকার : রোনাল্ডো নাজারিও (দ্য ফেনোমেনন)
গোলপোস্টের নিচে এক বিশ্বস্ত প্রাচীর: ক্লাউডিও তাফ্যারেল
ব্রাজিল ফুটবল সবসময়ই তাদের আক্রমণভাগের জন্য বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত। কিন্তু রক্ষণভাগ বা গোলপোস্টের নিচে শান্ত মাথার ত্রাতা ছাড়া বড় টুর্নামেন্ট জেতা অসম্ভব। আমার দলের গোলরক্ষক ১৯৯৪ বিশ্বকাপ জয়ের নায়ক ক্লাউডিও তাফ্যারেল। সেলেসাওদের ইতিহাসে পেনাল্টি শুট-আউটে তাঁর চেয়ে ঠাণ্ডা মাথার এবং নির্ভরযোগ্য গোলকিপার আর আসেনি।
১৯৯৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে ইতালির বিরুদ্ধে বা ১৯৯৮ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে তাঁর বীরত্বগাথা আজীবন ফুটবলের ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবে। বক্সে তাঁর উপস্থিতি পুরো ডিফেন্স লাইনকে এক অন্যরকম মানসিক শক্তি জোগাবে।
রক্ষণভাগের অপরাজেয় চতুর্ভুজ (The Back Four)
আমার দলের রক্ষণভাগ সাজানো হয়েছে ফুটবল ইতিহাসের দুই সেরা ফুলব্যাক এবং দুই ভিন্ন প্রজন্মের সেরা সেন্টার-ব্যাক জুটিকে নিয়ে।
- ডান প্রান্তে কাফু এবং বাম প্রান্তে রবার্তো কার্লোস: উইং-ব্যাকের সংজ্ঞা বদলে দেওয়া এই জুটি আমার একাদশের অন্যতম প্রধান শক্তি। কাফু যেমন ডান প্রান্ত দিয়ে ক্লান্তিহীনভাবে রক্ষণ ও আক্রমণ দুটোই সামলাতে ওস্তাদ ছিল। ঠিক তেমনি বাম প্রান্তে রবার্তো কার্লোস তাঁর বুলেটের মতো গতি আর ফ্রি-কিকের সাহায্যে প্রতিপক্ষের ডিফেন্স ভেঙে দিতে সক্ষম ছিল। এদুজন কিংবদন্তি শুধু ডিফেন্ডার নন আক্রমণে উইঙ্গারদের মূল সহায়তাকারীও ছিল।
- লুসিও এবং থিয়াগো সিলভার সেন্ট্রাল ডিফেন্স: এই দুই ডিফেন্ডারের জুটিকে আমি বলি 'আগ্রাসন ও মস্তিস্কের মেলবন্ধন'। ২০০২ বিশ্বকাপজয়ী লুসিও ছিলেন শারীরিক ফুটবল এবং আক্রমণাত্মক ট্যাকলিংয়ের প্রতীক। প্রয়োজনে বল কেড়ে নিয়ে মাঠের মাঝখান দিয়ে ওপরে উঠে যাওয়ার এক অসাধারণ ক্ষমতা ছিল তাঁর। আর তাঁর এই আগ্রাসনকে মাঠে ভারসাম্য দেবে আধুনিক ফুটবলের অন্যতম সেরা ডিফেন্ডার থিয়াগো সিলভার ঠাণ্ডা মাথার গেম রিডিং এবং নিখুঁত পজিশনিং। সিলভার নিখুঁত ইন্টারসেপশন এবং লুসিওর ইস্পাত-কঠিন ট্যাকেলিং মিলে এই ডিফেন্সকে করে তুলবে দুর্ভেদ্য।
মধ্যমাঠের ডাবল পিলারের নিরাপত্তা: ডুঙ্গা ও গিলবার্তো সিলভা
অ্যাটাকিং মিডফিল্ডে যখন তিনজন অতি-আক্রমণাত্মক জাদুকর থাকবে তখন ডিফেন্সের ঠিক সামনে এক নিরেট নিরাপত্তা বলয় প্রয়োজন। এই কাজের জন্য আমার মাঝমাঠের দুই পিলারের প্রথম জন হলেন ১৯৯৪ এর বিশ্বজয়ী অধিনায়ক ডুঙ্গা।
ডুঙ্গা কেবল একজন খেলোয়াড় নন তিনি field-এর ভেতরের প্রকৃত সেনাপতি। তাঁর লিডারশিপ, ট্যাকটিক্যাল ফাউল করার দক্ষতা এবং প্রতিপক্ষের আক্রমণ শুরুতেই নস্যাৎ করে দেওয়ার ক্ষমতা অতুলনীয়।
তাঁর যোগ্য সঙ্গী হিসেবে আমি রেখেছি ২০০২ বিশ্বকাপের অদৃশ্য প্রাচীর গিলবার্তো সিলভাকে। আর্সেনালের বিখ্যাত ইনভিন্সিবল স্কোয়াডের এই সদস্য মাঠে নীরবে নিজের কাজ করে যেতেন। ডুঙ্গা যখন মাঠে আগ্রাসী ভূমিকা নেবেন সিলভা তখন নিখুঁত পাসের মাধ্যমে খেলা নিয়ন্ত্রণ করবেন এবং বলের দখল ধরে রাখবেন।
এই দুই ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারের উপস্থিতির কারণে প্রতিপক্ষ কাউন্টার-অ্যাটারে যাওয়ার কোনো সুযোগই পাবে না। আর এই নিরেট দেয়ালই সামনের চার আক্রমণভাগের তারকাকে কোনো পিছুটান ছাড়া খেলার পূর্ণ স্বাধীনতা দেবে।
মধ্যমাঠের তিন জাদুকর: কাকা, রোনালদিনহো এবং নেইমার
আমার এই একাদশের সবচেয়ে আকর্ষণীয় এবং রোমাঞ্চকর অংশ হলো এই আক্রমণাত্মক মিডফিল্ড ত্রয়ী। ফুটবলীয় ব্যাকরণ অনুযায়ী এরা তিনজনই মাঠের বাম দিক বা মাঝখানে খেলতে ভালোবাসেন। তবে আধুনিক 'ফ্লুইড' ফুটবল কৌশলে এদের পজিশন হবে সম্পূর্ণ স্বাধীন, যা প্রতিপক্ষের ডিফেন্সের জন্য এক গোলকধাঁধা তৈরি করবে।
- কাকা (সেন্ট্রাল প্লেমেকার): মাঠের মাঝখান থেকে এসি মিলানের সেই চিরচেনা গতিতে বল ড্রিবল করে সরাসরি প্রতিপক্ষের সেন্ট্রাল ডিফেন্সে ফাটল ধরানোই হবে কাকার কাজ। তাঁর ভিশন এবং নিখুঁত থ্রু-পাসগুলো স্ট্রাইকারের জন্য হবে একেকটি উপহার।
- রোনালদিনহো (রাইট/ফ্রি রোল): ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বিনোদনদায়ী খেলোয়াড় রোনালদিনহোকে আমি রাখছি রাইট উইং বা রাইট ফ্ল্যাঙ্কে। তবে তিনি প্রথাগত উইঙ্গারের মতো শুধু সাইডলাইন ঘেঁষে ক্রস করার দায়িত্বে থাকবেন না। তিনি ডান দিক থেকে বল নিয়ে ভেতরে কাট-ইন করবেন, তাঁর সেই বিখ্যাত 'নো-লুক পাস' বা 'ইলাস্টিকো' দিয়ে প্রতিপক্ষকে বোকা বানাবেন এবং কাকা ও নেইমারের সাথে পাসের ওয়ান-টু খেলে আক্রমণকে আরও গতিশীল করবেন।
- নেইমার (লেফট উইঙ্গার): আধুনিক যুগে ব্রাজিলের একক কাণ্ডারি নেইমার খেলবেন তাঁর প্রিয় লেফট উইং পজিশনে। বাম দিক থেকে গতি ও ড্রিবলিংয়ের নিখুঁত প্রদর্শনী দেখিয়ে বক্সে ঢুকে পড়া এবং ফাউল আদায় করায় তিনি ওস্তাদ। এই তিনজনের মাঠের পজিশন কিন্তু ফিক্সড থাকবে না; তারা অনবরত নিজেদের মধ্যে জায়গা অদলবদল করবেন, যা প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের মার্কারদের সম্পূর্ণ বিভ্রান্ত করে দেবে।
আক্রমণের শেষ কথা: 'দ্য ফেনোমেনন' রোনাল্ডো
এই দলের প্রধান স্ট্রাইকার বা ৯ নম্বর জার্সিধারী হলেন ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার রোনাল্ডো নাজারিও। যখন পেছনে কাকা, রোনালদিনহো এবং নেইমারের মতো তিনজন বিশ্বমানের ক্রিয়েটর থাকবে তখন রোনাল্ডোর কাজ হবে শুধু বল জালে জড়ানো।
প্রাইম বা সুস্থ রোনাল্ডোকে আটকানোর কোনো ফর্মুলা আজ পর্যন্ত কোনো ডিফেন্ডার আবিষ্কার করতে পারেনি। তাঁর অতিপ্রাকৃতিক গতি, স্টেপ-ওভার ড্রিবলিং এবং নিখুঁত ফিনিশিংয়ের কল্যাণে এই একাদশ প্রতি ম্যাচে গোলের বন্যা বইয়ে দিতে বাধ্য। আর বর্তমান তারকা ভিনিসিয়াস জুনিয়র থাকবেন বেঞ্চে এক বিধ্বংসী সুপার-সাব হিসেবে।
কেন এই একাদশ অপরাজেয়?
কৌশলগতভাবে বিচার করলে এই দলটিকে হারানো প্রায় অসম্ভব। তাফ্যারেলের বিশ্বস্ত গ্লাভস। কাফু-কার্লোসের চিরসবুজ উইং-ব্যাক আক্রমণ। লুসিও-সিলভার দুর্ভেদ্য ডিফেন্স, ডুঙ্গা-গিলবার্তোর ইস্পাত-কঠিন মাঝমাঠ এবং কাকা-রোনালদিনহো-নেইমার-রোনাল্ডোর মহাজাগতিক আক্রমণ ভাগ।
সব মিলিয়ে এই দল ফুটবল ইতিহাসের যেকোনো 'গ্রেটেস্ট অফ অল টাইম' টিমকে অনায়াসে পরাস্ত করার ক্ষমতা রাখে। এই দল কেবল ট্রফি জিতবে না, তারা মাঠের প্রতি মিনিটে দর্শকদের উপহার দেবে খাঁটি ব্রাজিলিয়ান 'জোগো বনিতো' বা সুন্দর ফুটবল।
