ব্যান্ড ‘অর্থহীন’-এর জন্ম ও সাফল্যের নেপথ্যে
বাংলা ব্যান্ড সংগীতের ইতিহাসে যে কটি দল তাদের নিজস্ব ঘরানা এবং অদম্য প্রাণশক্তি দিয়ে ভক্তদের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে, অর্থহীন তাদের মধ্যে অন্যতম। ১৯৯৯ সালে যাত্রা শুরু করা এই ব্যান্ডটি গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আজও দেশি রকের ঝাণ্ডা ধরে রেখেছে। দলনেতা বেজবাবা সুমনের হাত ধরে শুরু হওয়া এই ব্যান্ডের গান মানেই তারুণ্যের উন্মাদনা, দুর্দান্ত বেজ লাইন আর জীবনমুখী কথা। আটটি সফল অ্যালবাম উপহার দেওয়া এই ব্যান্ডটি মেলোডিয়াস রক থেকে শুরু করে হেভি মেটালের মঞ্চেও সমানভাবে জনপ্রিয়।
অর্থহীন ব্যান্ডের জন্মকথা: যেভাবে শুরু হলো পথচলা
অর্থহীন ব্যান্ডের শুরুটা হয়েছিল অনেকটা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে। এর পেছনে প্রধান কারিগর ছিলেন সুমন (বেজবাবা সুমন)। ১৯৯৩ সালে জনপ্রিয় ব্যান্ড ফিলিংস ত্যাগ করার পর সুমন একক ক্যারিয়ারে মনোযোগ দেন। তার পরিকল্পনা ছিল এমন কিছু করার যেখানে একক গানেও ব্যান্ডের আমেজ ফুটে উঠবে।
- প্রাথমিক প্রস্তুতি (১৯৯৪-১৯৯৭): ১৯৯৪ সালে বিভিন্ন ব্যান্ডের আটজন শিল্পীকে নিয়ে তিনি তার একক অ্যালবাম সুমন ও অর্থহীন-এর কাজ শুরু করেন। দীর্ঘ তিন বছর পর ১৯৯৭ সালে অ্যালবামটি প্রকাশিত হলে তা দারুণ প্রশংসা কুড়ায়। এই অ্যালবামের অন্যতম আকর্ষণ ছিল অর্থহীন নামক গানটি যেখানে বাংলাদেশের সেরা আটজন গিটারবাদক একসাথে আটাশটি একক বাজিয়েছিলেন।
- ব্যান্ড হিসেবে আত্মপ্রকাশ (১৯৯৮): একক অ্যালবামের সাফল্যের পর সুমন একটি স্থায়ী দল গঠনের কথা ভাবেন। ১৯৯৮ সালে ফেইথ ব্যান্ডের টিটি ও সেন্টুর সহায়তায় সুমন ও অর্থহীন নামে ব্যান্ডের কার্যক্রম শুরু হয়। শুরুতে সদস্য হিসেবে ছিলেন রুমি (ড্রামস), তন্ময় (গিটার), পনির (গিটার) এবং সুমন নিজে (বেজ ও ভোকাল)।
- চূড়ান্ত নামকরণ (১৯৯৯): ১৯৯৯ সালের অক্টোবরে টিটি ও সেন্টু তাদের মূল ব্যান্ড ‘ফেইথ’-এ সময় দিতে গিয়ে দলটি ত্যাগ করেন। এরপর রুমি তার আগের ব্যান্ড ছেড়ে স্থায়ীভাবে সুমনের সাথে যোগ দেন। সেই বছরই সুমনের নাম থেকে সুমন ও অংশটি বাদ দিয়ে ব্যান্ডের নাম চূড়ান্ত করা হয় অর্থহীন। এরপর থেকে শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়।
পরবর্তীতে ২০০০ সালে প্রকাশিত হয় তাদের প্রথম অ্যালবাম ত্রিমাত্রিক। যা প্রকাশের পরপরই আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা পায় এবং ব্যান্ড সংগীতের জগতে অর্থহীন নামটিকে একটি শক্তিশালী ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। আজ থাকছে ব্যান্ড অর্থহীনের প্রথম চারটি স্টুডিও অ্যালবামের ডিস্কোগ্রাফি।
অ্যালবাম প্রোফাইল: ত্রিমাত্রিক (২০০০)
ব্যান্ড: অর্থহীন | প্রযোজনা: জি-সিরিজ
🎸 লাইন-আপ
মিনহাজ আহমেদ পিকলু (প্রয়াত): গিটার
রুমি রহমান (প্রয়াত): ড্রামস
লতিফুর রহমান রাসেল: ভোকাল/গিটার
🎵 ০১. অদ্ভুত সেই ছেলেটি — (কথা: সজীব/সুমন / কণ্ঠ: সুমন/শোভন)
🎵 ০২. গুটি — (কথা: সুমন / কণ্ঠ: সুমন)
🎵 ০৩. তেপান্তরের মাঠ — (কথা: সুমন / কণ্ঠ: সুমন)
🎵 ০৪. চলে গেলে — (কথা: শোভন / কণ্ঠ: শোভন)
🎵 ০৫. মেঘের গান — (কথা: সুমন / কণ্ঠ: সুমন)
🎵 ০৬. বেদনার চোরাবালি — (কথা: বাপ্পী খান / কণ্ঠ: সুমন/রাসেল)
🎵 ০৭. সস্তা স্বপ্ন — (কথা: সুমন / কণ্ঠ: সুমন)
🎵 ০৮. সময় — (কথা: রাসেল / কণ্ঠ: রাসেল)
🎵 ০৯. ভাবছে সে — (কথা: সুমন / কণ্ঠ: সুমন)
🎵 ১০. দূর থেকে — (কথা: শোভন / কণ্ঠ: শোভন)
🎵 ১১. আমার না বলা কথা — (কথা: বাপ্পী খান / কণ্ঠ: সুমন)
অ্যালবাম প্রোফাইল: বিবর্তন (২০০১)
ব্যান্ড: অর্থহীন | প্রযোজনা: জি-সিরিজ
🎸 লাইন-আপ
আবু শামস মিনহাজ আহমেদ পিকলু (প্রয়াত): গিটার
মুনতাসির মামুন শুভ: ড্রামস
লতিফুর রহমান রাসেল: ভোকাল/গিটার
💿 ট্র্যাক লিস্ট: বিবর্তন (২০০১)মুনতাসির মামুন শুভ: ড্রামস
লতিফুর রহমান রাসেল: ভোকাল/গিটার
🎵 ০১. কল্পনা — (কথা: অনিক/ কণ্ঠ: সুমন)
🎵 ০২. আমার প্রতিচ্ছবি — (কথা: সুমন / কণ্ঠ: সুমন)
🎵 ০৩. আমার ক্লান্তি — (কথা: লুনা রুশদী / কণ্ঠ: সুমন)
🎵 ০৪. প্রবাস থেকে — (কথা: সুমন / কণ্ঠ: সুমন)
🎵 ০৫. নির্বোধ — (কথা: সুমন / কণ্ঠ: সুমন/শোভন)
🎵 ০৬. গুটি-২ — (কথা: সুমন / কণ্ঠ: সুমন)
🎵 ০৭. মৃত্যুর শহর — (কথা: রঞ্জন / কণ্ঠ: সুমন)
🎵 ০৮. রাতের ট্রেন — (কথা: জুয়েল মোর্শেদ / কণ্ঠ: রাসেল)
🎵 ০৯. প্রেমের গান — (কথা: ফয়সাল/সুমন / কণ্ঠ: সুমন)
🎵 ১০. ঘুম — (কথা: রাসেল / কণ্ঠ: রাসেল)
🎵 ১১. অদ্ভুত সেই ছেলেটি-২ — (কথা: সুমন / কণ্ঠ: সুমন/রাসেল)
🎵 ১২. তুমি — (কথা: সুমন / কণ্ঠ: সুমন)
অ্যালবাম প্রোফাইল: নতুন দিনের মিছিলে (২০০২)
ব্যান্ড: অর্থহীন | প্রযোজনা: জি-সিরিজ
🎸 লাইন-আপ
আবু শামস মিনহাজ আহমেদ পিকলু (প্রয়াত): গিটার
মুনতাসির মামুন শুভ: ড্রামস
💿 ট্র্যাক লিস্ট: নতুন দিনের মিছিলে (২০০২)মুনতাসির মামুন শুভ: ড্রামস
🎵 ০১. নতুন দিনে মিছিলে — (কথা: রুম্মান আহমেদ / কণ্ঠ: সুমন)
🎵 ০২. হয়তোবা — (কথা: সুমন / কণ্ঠ: সুমন)
🎵 ০৩. কৃষ্ণচূড়া — (কথা: সজীব / কণ্ঠ: সুমন)
🎵 ০৪. জানতে ইচ্ছে করে — (কথা: সুমন / কণ্ঠ: সুমন)
🎵 ০৫. তিন দেয়াল — (কথা: রুম্মান আহমেদ / কণ্ঠ: সুমন)
🎵 ০৬. তোমাদের গান — (কথা: সুমন / কণ্ঠ: সুমন)
🎵 ০৭. ভ্রান্ত আমি — (কথা: আপু / কণ্ঠ: সুমন)
🎵 ০৮. সাত দিন —
- Day 1: পটভূমি — (Instrumental)
- Day 2: সন্তান — (কথা: সুমন / কণ্ঠ: সুমন)
- Day 3: ফ্লাশব্যাক — (কথা: রুম্মান আহমেদ / কণ্ঠ: সুমন)
- Day 4: যাচ্ছি আমি হারিয়ে — (কথা: সুমন / কণ্ঠ: সুমন)
- Day 5: আর একটি রাত — (কথা: সুমন / কণ্ঠ: সুমন)
- Day 6: বিদায়ের গান — (কথা: সুমন / কণ্ঠ: সুমন)
- Day 7: আমি কোথায়? — (কথা: সুমন / কণ্ঠ: সুমন)
অ্যালবাম প্রোফাইল: ধ্রুবক (২০০৩)
ব্যান্ড: অর্থহীন | প্রযোজনা: জি-সিরিজ
🎸 লাইন-আপ
সাইদুস সালেহীন খালেদ সুমন: ভোকাল/ বেসআবু শামস মিনহাজ আহমেদ পিকলু (প্রয়াত): গিটার
মুনতাসির মামুন শুভ: ড্রামস
শিশির আহমেদ: গিটার/কি-বোর্ড
রায়েফ আল হাসান রাফা: ভোকাল
🎵 ০১. চাইতে পারো — (কথা: অনিক/ কণ্ঠ: সুমন/রাফা)
🎵 ০২. যদি — (কথা: সুমন / কণ্ঠ: সুমন)
🎵 ০৩. রংধনু — (কথা: সজীব / কণ্ঠ: সুমন)
🎵 ০৪. একটা গান দাও — (কথা: সজীব / কণ্ঠ: সুমন)
🎵 ০৫. বিজয়ের গান — (কথা: অনীক / কণ্ঠ: সুমন)
🎵 ০৬. গল্প শেষে — (কথা: রুম্মন আহমেদ / কণ্ঠ: সুমন)
🎵 ০৭. মরীচিকা — (কথা: সুমন / কণ্ঠ: সুমন)
🎵 ০৮. ভাবছি বসে — (কথা: সুমন / কণ্ঠ: সুমন)
🎵 ০৯.গুটি (from hell) — (কথা: সুমন / কণ্ঠ: সুমন)
🎵 ১০. আঁশটে সত্য — (কথা: রঞ্জন / কণ্ঠ: রাসেল)
🎵 ১১. নীল পাহাড় — (কথা: সুমন / কণ্ঠ: সুমন)
🎵 ১২. সমাধি শহর — (কথা: রুম্মান আহমেদ / কণ্ঠ: সুমন)
🎵 ১৩. এ গান আমার — (কথা: সজীব / কণ্ঠ: সুমন)
🎵 ১৪. সাগর ও একটি ছেলে— (কথা: সুমন / কণ্ঠ: সুমন)
সময়ের সাথে অর্থহীনের বিবর্তন
ত্রিমাত্রিক থেকে শুরু করে ‘নতুন দিনের মিছিলে’ কিংবা ধ্রুবক প্রতিটি অ্যালবামেই অর্থহীন নিজেকে ভেঙেছে এবং নতুন করে গড়েছে। এই প্রথম চারটি অ্যালবামের হাত ধরেই মূলত বাংলা ব্যান্ড সংগীতে বেজ গিটারের প্রাধান্য এবং প্রগ্রেসিভ রকের এক নতুন ধারা তৈরি হয়েছিল। সুমনের অসুস্থতা আর ব্যান্ডের অভ্যন্তরীণ নানা পরিবর্তনের মাঝেও এই অ্যালবামগুলো আজও ভক্তদের কাছে সমান জনপ্রিয়। অর্থহীনের বিবর্তনের এই গল্প এখানেই শেষ নয়। ২০০৫ সালের পর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত তাদের বাকি অ্যালবামগুলোর পূর্ণাঙ্গ ডিস্কোগ্রাফি নিয়ে আসছি পরবর্তী পর্বে।
