পিয়ারু সরদার ১৯৫২ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে নির্মিত প্রথম শহীদ মিনারের নকশাকার ও রূপকার হিসেবে ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছেন
বাঙালির ইতিহাসে ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি কেবল একটি তারিখ নয় জাতির জেগে ওঠার মাহেন্দ্রক্ষণ। রফিক, সালাম, বরকত, জব্বারের রক্তে ভেজা রাজপথ যখন শোষণের বিরুদ্ধে স্লোগানে উত্তাল। ঠিক সেই মুহূর্তে শোককে শক্তিতে রূপ দিতে গড়ে উঠেছিল ইতিহাসের প্রথম শহীদ মিনার।
কিন্তু ইতিহাসের এই বিশাল কর্মযজ্ঞের নেপথ্যে এমন একজন মানুষ ছিলেন। যাঁর সাহস আর ত্যাগ না থাকলে হয়তো ২৩শে ফেব্রুয়ারির সেই স্মৃতিস্তম্ভটি কোনোদিন আলোর মুখ দেখত না। এই যাত্রায় ইতিহাসের পাতায় এক অপ্রকাশিত নায়কের নাম উঠে আসে পুরান ঢাকার প্রভাবশালী ব্যক্তি পিয়ারু সরদার।
তিনি ছিলেন ২২টি পঞ্চায়েতের একজন প্রধান, দানশীল ও শিক্ষানুরাগী। ভাষা আন্দোলনের সময় তার মহল্লা ছাত্রদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করত। পুলিশি তাড়া ও কারফিউর মধ্যেও তিনি সরাসরি সহযোগিতা করেছিলেন গুদামঘরে রাখা সিমেন্টের চাবি দেন, ইট, বালু ও পানি সরবরাহে সহায়তা করেন। আজকে লেখা থাকছে সেই ইতিহাসের কথা।
এক নজরে পিয়ারু সরদার (১৮৯৩–১৯৬১)
- পুরো নাম: পিয়ারু সরদার।
- জীবনকাল: ১৮৯৩ থেকে ১৯৬১ সাল।
- মূল পরিচয়: পুরান ঢাকার অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ও ২২ পঞ্চায়েতের প্রধান সরদার। পেশায় তিনি ছিলেন একজন বিশিষ্ট ঠিকাদার।
- ভাষা আন্দোলনে ভূমিকা: ১৯৫২ সালে সান্ধ্য আইন ও সরকারি কড়াকড়ির মধ্যে প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণের জন্য নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রয়োজনীয় নির্মাণসামগ্রী ও দক্ষ কারিগর সরবরাহ করেন।
- সেই ঐতিহাসিক উক্তি: ছাত্রদের প্রতি তাঁর বিখ্যাত উক্তি ছিল- "লিয়া যাও চাবি, যেমনে যা লাগে যা মুঞ্চায় মাল ছামান নিয়া কামে নাইমমা পড়।"
- প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণ: ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ তারিখে রাতভর পরিশ্রমের মাধ্যমে তাঁরই দেওয়া মালামাল দিয়ে ১১ ফুট উচ্চতার ইতিহাসের প্রথম শহীদ মিনারটি তৈরি করা হয়।
- নিরাপত্তা ও আশ্রয়: ভাষা আন্দোলনের সময় পুলিশি গ্রেপ্তার এড়াতে ছাত্রদের নিজের মহল্লায় নিরাপদ আশ্রয় এবং সুরক্ষা প্রদান করেন।
- উল্লেখযোগ্য নির্মাণকাজ: ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউশন, রমনা পার্ক, ঢাকা মেডিকেল কলেজের নার্সিং হোস্টেল এবং ভিক্টোরিয়া পার্ক মঞ্চের মতো স্থাপনা নির্মাণে তাঁর অবদান রয়েছে।
- সামাজিক অবদান: তিনি ছিলেন একজন দানশীল ও শিক্ষানুরাগী মানুষ; ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় অফিস নির্মাণেও তিনি বিশেষ সহায়তা করেন।
- রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি: ভাষা আন্দোলনে অনন্য অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ২০১৫ সালে মরণোত্তর 'একুশে পদক' প্রদান করে।
শোকের রাতে সাহসের মশাল: প্রথম শহীদ মিনারের প্রেক্ষাপট
২১শে ফেব্রুয়ারি ছাত্র হত্যার পর সারা ঢাকা তখন যেন এক আগ্নেয়গিরি। কারফিউ, চারদিকে পাকিস্তানি সেনাদের টহল আর শোকাতুর মানুষের দীর্ঘশ্বাস। ২৩শে ফেব্রুয়ারি বিকেলে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্ররা সিদ্ধান্ত নিলেন—যেখানে সহযোদ্ধাদের রক্ত ঝরেছে, সেখানেই গড়ে তুলবেন একটি স্মৃতিস্তম্ভ।
কিন্তু সমস্যা ছিল পাহাড়সম। একদিকে সান্ধ্য আইন (কারফিউ), অন্যদিকে নির্মাণসামগ্রীর তীব্র অভাব। তৎকালীন সময়ে ইট, বালু আর সিমেন্ট জোগাড় করা ছিল প্রায় অসম্ভব। ঠিক সেই সংকটময় মুহূর্তে ছাত্ররা দ্বারস্থ হন তৎকালীন প্রভাবশালী ঠিকাদার ও ২২টি পঞ্চায়েতের প্রধান পিয়ারু সরদারের কাছে।
"লিয়া যাও চাবি": পিয়ারু সরদারের সেই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত
পিয়ারু সরদার তখন ঢাকা মেডিকেল কলেজ সম্প্রসারণের সরকারি ঠিকাদার ছিলেন। ছাত্ররা যখন তাঁর কাছে সাহায্যের আবেদন নিয়ে পৌঁছালেন। তিনি জানতেন এর পরিণাম কী হতে পারে। সরকারি মালসামান আন্দোলনকারীদের হাতে তুলে দেওয়ার অর্থ ছিল লাইসেন্স বাতিল হওয়া এমনকি কারাবরণ। কিন্তু ভাষার টানে এবং ছাত্রদের প্রতি মমতায় তিনি বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেননি।
রাজকীয় মেজাজে তিনি বলেছিলেন:-"লিয়া যাও চাবি, যেমনে যা লাগে যা মুঞ্চায় মাল ছামান নিয়া কামে নাইমমা পড়।" তিনি কেবল গুদামের চাবিই দেননি, বরং গভীর রাতে নিজের বিশ্বস্ত দুজন রাজমিস্ত্রিকেও পাঠিয়েছিলেন ছাত্রদের সাহায্য করতে। পিয়ারু সরদারের এই একটি সিদ্ধান্তই ২৩শে ফেব্রুয়ারির রাতটিকে ইতিহাসে অমর করে দেয়।
এক রাতের মহাকাব্য: ১১ ফুটের সেই অমর সৃষ্টি
২৩শে ফেব্রুয়ারি রাতভর চলল এক অভূতপূর্ব কর্মযজ্ঞ। একদিকে মেডিকেল কলেজের ছাত্ররা, অন্যদিকে পিয়ারু সরদারের কর্মীরা। কনকনে শীত আর গ্রেপ্তার হওয়ার ভয়কে তুচ্ছ করে রাতারাতি দাঁড়িয়ে গেল ১১ ফুট উচ্চতার প্রথম শহীদ মিনার। প্রথম শহীদ মিনারের সংক্ষিপ্ত রূপরেখা:
- নির্মাণ কাল ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ (সারারাত)
- উচ্চতা প্রায় ১১ ফুট
- নকশাকার বদরুল আলম ও সাঈদ হায়দার
- মূল স্লোগান "রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই" ও "শহীদ স্মৃতি অমর হোক"
- প্রথম উদ্বোধন ২৪ ফেব্রুয়ারি (শহীদ শফিউরের বাবা মৌলভী মাহবুবুর রহমান)
- আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ২৬ ফেব্রুয়ারি (আবুল কালাম শামসুদ্দীন)
যদিও ২৬শে ফেব্রুয়ারি বিকেলেই পাকিস্তানি সেনাবাহিনী মিনারটি গুঁড়িয়ে দিয়েছিল, কিন্তু পিয়ারু সরদারের জোগানো সিমেন্ট আর ইটের গাঁথুনি বাঙালির হৃদয়ে যে মিনার গেঁথে দিয়েছিল, তা ভাঙার সাধ্য কারোর ছিল না।
পিয়ারু সরদার: কেবল একজন ঠিকাদার নন, একজন অভিভাবক
পিয়ারু সরদার (১৮৯৩–১৯৬১) ছিলেন পুরান ঢাকার হোসনি দালান, বকশিবাজার ও নাজিমউদ্দিন রোড এলাকার এক প্রবাদপ্রতিম নেতা। তাঁর আভিজাত্য কেবল ধন-সম্পদে নয়, ছিল তাঁর বিশাল হৃদয়ে।
- ছাত্রদের ঢাল: ভাষা আন্দোলনের সময় যখনই পুলিশ ছাত্রদের তাড়া করত, তারা পিয়ারু সরদারের মহল্লায় আশ্রয় নিত। তিনি বুক দিয়ে আগলে রাখতেন সেই তরুণ বিপ্লবীদের।
- শিক্ষানুরাগী ও দাতা: ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় অফিস নির্মাণ থেকে শুরু করে অসহায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার খরচ সবখানেই ছিল তাঁর উদার হাত।
- স্থাপত্যে অবদান: ঢাকার ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউশন, রমনা পার্ক, ভিক্টোরিয়া পার্ক মঞ্চ নির্মাণের পেছনেও ছিল তাঁর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ছোঁয়া।
পিয়ারু সরদারের স্বীকৃতি ও উত্তরকাল
দীর্ঘকাল ইতিহাসের পাতায় অবহেলিত থাকলেও সত্যকে চাপা দিয়ে রাখা যায় না। পিয়ারু সরদারের সেই অসামান্য সাহসিকতার স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার ২০১৫ সালে তাঁকে মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত করে। কবি সৈয়দ শামসুল হকের ভাষায়:
"অশ্রুমেশা আমাদের সেই প্রথম শহিদ মিনার
যদিও আজ দাঁড়িয়ে নেই আর,
বর্তমানের মিনারেই তো রয়েছে স্মৃতি তার
আর স্মৃতিতে আজও আছেন পিয়ারু সরদার!"
আজকের আধুনিক শহীদ মিনারের গাম্ভীর্য আর নান্দনিকতার মূলে রয়েছে ৫২-র সেই রাতের ১১ ফুটের একটি সাধারণ মিনার। আর সেই সাধারণ মিনারের পেছনে ছিল পিয়ারু সরদারের মতো এক অসাধারণ দেশপ্রেমিকের সাহস।
পিয়ারু সরদার আমাদের শিখিয়েছেন, জাতির প্রয়োজনে নিজের পেশা, সম্পদ এমনকি জীবন বাজি রাখাটাই হচ্ছে শ্রেষ্ঠ বীরত্ব। আমাদের বর্তমান প্রজন্মের উচিত ভাষা আন্দোলনের এই 'নেপথ্য কারিগর'কে যথাযথ সম্মানের সাথে স্মরণ রাখা।
কারণ পিয়ারু সরদার কেবল একজন সরদার ছিলেন না, তিনি ছিলেন আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার আন্দোলনের এক নীরব পাহারাদার। পিয়ারু সরদারের সাহস, ত্যাগ এবং মানবিকতা আমাদের শেখায় যে দেশের চেতনা, সংস্কৃতি এবং ইতিহাস রক্ষায় প্রতিটি মানুষের অবদান অমূল্য।
১৯৫২ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান সেনাবাহিনী প্রথম শহীদ মিনারটি ধ্বংস করলেও, বাঙালির হৃদয়ে সেই মিনারের ভিত্তি আর কখনো ভাঙা যায়নি। আজকের আধুনিক শহীদ মিনারের প্রতিটি ইটে মিশে আছে পিয়ারু সরদারের মতো দেশপ্রেমিকদের অসামান্য ত্যাগ।
ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে পিয়ারু সরদারের নাম শুধুই ইতিহাস নয় এটি আমাদের অনুপ্রেরণা, সাহস ও মানবিকতার প্রতীক। আমাদের প্রজন্মের উচিত তার এই অমর অবদান স্মরণ করা, যাতে মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসা এবং জাতীয় চেতনার চেতনায় আমরা সকলে সমৃদ্ধ হতে পারি। আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।
FAQ: পিয়ারু সরদার ও প্রথম শহীদ মিনার
প্রশ্ন ১: পিয়ারু সরদার কে ছিলেন এবং ভাষা আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা কী ছিল?
উত্তর: পিয়ারু সরদার (১৮৯৩–১৯৬১) ছিলেন পুরান ঢাকার অত্যন্ত প্রভাবশালী একজন ব্যক্তিত্ব, পেশায় একজন বিশিষ্ট ঠিকাদার এবং ২২টি পঞ্চায়েতের প্রধান। ভাষা আন্দোলনের সময় তিনি প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯৫২ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি যখন ছাত্ররা শহীদ মিনার তৈরির জন্য নির্মাণসামগ্রীর অভাবে পড়ে, তখন তিনি নিজের ঝুঁকি নিয়ে তাঁর গুদামের সিমেন্ট, ইট, বালু সরবরাহ করেন এবং নিজের কর্মীদেরও পাঠান। তাঁর দেওয়া চাবি ও মালামালেই রাতারাতি গড়ে ওঠে বাঙালির প্রথম শহীদ মিনার।
প্রশ্ন ২: "লিয়া যাও চাবি" – কথাটি কেন এত ঐতিহাসিক?
উত্তর: ১৯৫২ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ছাত্ররা যখন পিয়ারু সরদারের কাছে নির্মাণসামগ্রী চাইতে গেলে, তিনি কোনো দ্বিধা না করে বলে উঠেছিলেন— "লিয়া যাও চাবি, যেমনে যা লাগে যা মুঞ্চায় মাল ছামান নিয়া কামে নাইমমা পড়।" কথাটি ঐতিহাসিক, কারণ এটি ছিল সরকারি সম্পদ আন্দোলনকারীদের হাতে তুলে দেওয়া, যা তাঁর ঠিকাদারি লাইসেন্স বাতিল ও কারাদণ্ডের ঝুঁকি তৈরি করেছিল। তবুও তিনি মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসায় সেসব ঝুঁকি উপেক্ষা করেন। তাঁর এই একটি বাক্যই বাঙালির গর্বের শহীদ মিনার নির্মাণের পথ উন্মুক্ত করে দেয়।
প্রশ্ন ৩: প্রথম শহীদ মিনারটি কখন ও কীভাবে নির্মিত হয়েছিল?
উত্তর: ১৯৫২ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি বিকেলে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্ররা সিদ্ধান্ত নেয় যে যেখানে ভাষা আন্দোলনের শহীদরা রক্ত দিয়েছেন, সেখানেই একটি স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করবেন। কিন্তু কারফিউ ও নির্মাণসামগ্রীর অভাবে তারা বিপদে পড়েন। পরে পিয়ারু সরদারের সহায়তায় ইট, বালু, সিমেন্ট ও কারিগর পাওয়া যায়। ২৩ ফেব্রুয়ারি গভীর রাত থেকে ২৪ ফেব্রুয়ারি সকাল পর্যন্ত নিরলস পরিশ্রমের মাধ্যমে প্রায় ১১ ফুট উচ্চতার প্রথম শহীদ মিনারটি নির্মিত হয়। এর নকশা তৈরি করেন বদরুল আলম ও সাঈদ হায়দার।
প্রশ্ন ৪: প্রথম শহীদ মিনারের উদ্বোধন কে করেছিলেন?
উত্তর: প্রথম শহীদ মিনারটি ২৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ সালে শহীদ শফিউরের বাবা মৌলভী মাহবুবুর রহমান উদ্বোধন করেন। পরবর্তীতে ২৬ ফেব্রুয়ারি আবুল কালাম শামসুদ্দীন আনুষ্ঠানিকভাবে এটি উদ্বোধন করেন। তবে মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ২৬ ফেব্রুয়ারি বিকেলে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এই মিনারটি গুঁড়িয়ে দেয়। কিন্তু বাঙালির মনে এটি অমর হয়ে যায়।
প্রশ্ন ৫: পিয়ারু সরদারকে কী স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে?
উত্তর: দীর্ঘদিন ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে পিয়ারু সরদারের অবদান অবহেলিত ছিল। কিন্তু তাঁর সাহসিকতা ও ত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার ২০১৫ সালে তাঁকে মরণোত্তর 'একুশে পদক' প্রদান করে। এটি বাংলাদেশের বেসামরিক নাগরিকদের জন্য সর্বোচ্চ সম্মাননা।
প্রশ্ন ৬: পিয়ারু সরদার শুধু শহীদ মিনারেই সাহায্য করেছিলেন নাকি আন্দোলনের আরও কোনো ভূমিকা ছিল?
উত্তর: পিয়ারু সরদার ছিলেন ভাষা আন্দোলনের সময়কার ছাত্রদের এক অভিভাবক। তিনি কেবল শহীদ মিনারের জন্যই সাহায্য করেননি; বরং পুরো আন্দোলনের সময় পুলিশি তাড়া ও গ্রেপ্তারের ভয়ে ছাত্ররা তাঁর মহল্লায় নিরাপদ আশ্রয় পেতেন। তিনি ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় অফিস নির্মাণসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাজেও অর্থসহায়তা ও কারিগরি সহায়তা দিয়েছেন। এছাড়া ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউশন, রমনা পার্ক, ঢাকা মেডিকেল কলেজের নার্সিং হোস্টেল ও ভিক্টোরিয়া পার্ক মঞ্চের মতো স্থাপনা নির্মাণেও তাঁর অবদান রয়েছে।
প্রশ্ন ৭: প্রথম শহীদ মিনারটি কত ফুট উঁচু ছিল এবং এর নকশা কেমন ছিল?
উত্তর: প্রথম শহীদ মিনারটির উচ্চতা ছিল প্রায় ১১ ফুট। এটি ইট, সিমেন্ট ও বালু দিয়ে নির্মিত হয়েছিল। এতে 'রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই' ও 'শহীদ স্মৃতি অমর হোক' স্লোগান লেখা ছিল। যদিও পরবর্তীতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এটি ধ্বংস করে দেয়, এই মিনারের আদলে আজকের আধুনিক শহীদ মিনার নির্মিত হয়েছে।
প্রশ্ন ৮: পিয়ারু সরদার কীভাবে ১৯৫২ সালের সেই কঠিন সময়ে নির্মাণসামগ্রী জোগাড় করেছিলেন?
উত্তর: পিয়ারু সরদার তখন ঢাকা মেডিকেল কলেজ সম্প্রসারণের সরকারি ঠিকাদার ছিলেন। তাঁর কাছে সরকারি কাজের জন্য প্রচুর সিমেন্ট, ইট ও বালু মজুত ছিল। ছাত্ররা যখন তাঁর কাছে সাহায্য চাইতে আসে, তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে সরকারি মালামাল আন্দোলনকারীদের দেওয়া তাঁর জন্য কারাবরণের কারণ হতে পারে। তবুও তিনি নিজের গুদামের চাবি ছাত্রদের হাতে তুলে দেন এবং রাতভর কাজ করার জন্য নিজের বিশ্বস্ত রাজমিস্ত্রিদেরও পাঠিয়ে দেন।
প্রশ্ন ৯: পিয়ারু সরদারের জীবনকাল ও জন্মস্থান সম্পর্কে জানতে চাই?
উত্তর: পিয়ারু সরদারের জন্ম ১৮৯৩ সালে এবং মৃত্যু ১৯৬১ সালে। তিনি পুরান ঢাকার হোসনি দালান, বকশিবাজার ও নাজিমউদ্দিন রোড এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত দানশীল ও শিক্ষানুরাগী ব্যক্তি। ২২টি পঞ্চায়েতের প্রধান হিসেবে তাঁর সামাজিক প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী।
প্রশ্ন ১০: বর্তমান প্রজন্মের কাছে পিয়ারু সরদারের অবদান স্মরণীয় কেন?
উত্তর: পিয়ারু সরদার আমাদের শেখান যে জাতির কল্যাণে নিজের পেশাগত ঝুঁকি, সম্পদ ও নিরাপত্তা বিসর্জন দেওয়াই প্রকৃত দেশপ্রেম। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে তিনি শুধু একজন ঠিকাদার ছিলেন না, তিনি ছিলেন বাঙালি জাতির জাগরণের এক নীরব পাহারাদার। তাঁর অসাধারণ মানবিকতা ও সাহসিকতা আজও আমাদের প্রেরণা জোগায়। তাই বর্তমান প্রজন্মের উচিত এই নেপথ্য নায়ককে যথাযথ সম্মানের সাথে স্মরণ করা।
প্রশ্ন ১১: পিয়ারু সরদারের ভাষা আন্দোলনের অবদান কি স্কুল-কলেজের পাঠ্যবইয়ে আছে?
উত্তর: সম্প্রতি বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় ভাষা আন্দোলনের বিভিন্ন নেপথ্য নায়কদের সম্পর্কে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে পিয়ারু সরদারের নাম অনেক পাঠ্যবইয়ে এখনও যথাযথভাবে স্থান পায়নি। তবে ২০১৫ সালে একুশে পদক পাওয়ার পর তাঁর অবদান সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বিভিন্ন গবেষণা প্রবন্ধ ও নিবন্ধে তাঁকে তুলে ধরা হচ্ছে।
