১৯৭১ সাল। একদিকে রণাঙ্গনে চলছে সশস্ত্র লড়াই, অন্যদিকে কাগজ-কলম আর রঙ-তুলির হাতিয়ারে চলছে আরেক যুদ্ধ মানুষের মন ও বিশ্ববিবেক জয় করার যুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে কলকাতায় অবস্থিত অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও প্রচার দফতর থেকেই প্রকাশিত হয়েছিল বহু পোস্টার ও লিফলেট, যেগুলো আজও ইতিহাসের এক অমূল্য দলিল হয়ে টিকে আছে। এই আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন শিল্পাচার্য কামরুল হাসান। তাঁর সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন দেবদাস চক্রবর্তী, নিতুন কুদ্দুস (নিতুন কুন্ডু), জহির আহমদ, প্রাণেশ মণ্ডলসহ আরও অনেক গুণী শিল্পী। তাঁরা শুধু ছবিই আঁকেননি রঙ ও তুলি দিয়ে তৈরি করেছিলেন যুদ্ধের এক নতুন ভাষা, যা রাইফেলের চেয়েও ধারালো হয়ে উঠেছিল।
বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি ও তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণের উদ্ধৃতি থেকে শুরু করে পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতার চিত্র, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সবকিছুই ফুটে উঠেছিল এই পোস্টার ও লিফলেটগুলোতে। এগুলো শুধু প্রচারপত্র ছিল না, ছিল একেকটি অগ্নিস্ফুলিঙ্গ, যা মুক্তিকামী মানুষের মনে সাহস জুগিয়েছিল এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের মুক্তির ডাক পৌঁছে দিয়েছিল। আজ কয়েক দশক পরেও এই চিত্রলিপিগুলো আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী।
বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি ও ভাষণের প্রতিধ্বনি
বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি, মুক্তিযোদ্ধার দৃপ্ত মুখচ্ছবি, হানাদার বাহিনীর নরপশু চেহারা সবই ফুটে উঠেছিল এসব প্রচারপত্রে। অসংখ্য পোস্টারে পাওয়া যায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি ও তাঁর ভাষণের উদ্ধৃতি যেমন "এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম", সেই বিখ্যাত তর্জনী উঁচানো প্রতীকী ভঙ্গি অঙ্কিত হয়েছিল পোস্টারের জমিনজুড়ে। আবার অনেক লিফলেটে বঙ্গবন্ধুর দৃঢ় ঘোষণা ছিল বাংলাদেশের মুক্তির অদম্য স্পৃহাকে কিছুতেই নিভিয়ে দেয়া যাবে না। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতেও তাঁর কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছিল মুক্তিকামী মানুষের সবচেয়ে বড় প্রেরণা।
প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের বার্তাও স্থান পেয়েছিল প্রচারপত্রে। "পাকিস্তান আজ মৃত" কিংবা "বিজয় আমাদেরই" এমন শিরোনামে প্রকাশিত লিফলেটে ফুটে উঠেছিল বাঙালীর অদম্য আত্মবিশ্বাস। এসব ভাষণ ও বার্তা শুধু মুক্তিযোদ্ধাদের সাহসী করে তোলেনি, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও পৌঁছে দিয়েছিল বাংলাদেশের মুক্তির ডাক।
পাকিস্তানি বর্বরতার চিত্র
পোস্টারের বড় অংশে উঠে এসেছে পাকিস্তানি সেনাদের বর্বরতা। শিল্পী কামরুল হাসানের আঁকা ইয়াহিয়া খানের ক্যারিকেচার "এই জানোয়ারদের হত্যা করতে হবে" একইসঙ্গে প্রতিরোধের শ্লোগান এবং ইতিহাসের শক্তিশালী চিত্রকর্মে পরিণত হয়েছিল। আবার অন্য পোস্টারে দেখানো হয়েছে কঙ্কাল আর হাড়ের স্তুপের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা পাকিস্তানি সেনা যা ছিল গণহত্যার প্রতীকী উপস্থাপনা।
কিছু পোস্টারে তুলে ধরা হয়েছিল পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পশ্চিমাদের বৈষম্যমূলক অর্থনীতি। যেমন "সোনার বাংলা শ্মশান কেন" এই প্রশ্নবোধক পোস্টারে বাজেটের খাতভিত্তিক বৈষম্য স্পষ্ট করে দেখানো হয়। এভাবেই সাধারণ মানুষকে বোঝানো হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের যৌক্তিকতা।
শিল্পী নিতুন কুদ্দুসের আঁকা একাধিক পোস্টারে দেখা যায় মুক্তিযোদ্ধার সাহসী মুখচ্ছবি, নিচে লেখা "সদাজাগ্রত বাংলার মুক্তিবাহিনী"। আরেক পোস্টারে ঘোষণা "বাংলাদেশের কৃষক শ্রমিক ছাত্র যুবক সবাই আজ মুক্তিযোদ্ধা।" পোস্টারগুলোর মধ্য দিয়েই স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি সর্বজনীন সংগ্রাম।
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা
মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রকাশিত কিছু পোস্টারে পাওয়া যায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দৃঢ় ঘোষণা। এক পোস্টারে পাশাপাশি আঁকা হয়েছিল মসজিদ, মন্দির, গির্জা ও বৌদ্ধ বিহার। তার নিচে লেখা "বাংলার হিন্দু, বাংলার খ্রীস্টান, বাংলার বৌদ্ধ, বাংলার মুসলমান, আমরা সবাই বাঙালী।"
আজ মুক্তিযুদ্ধের সেই পোস্টার, লিফলেট ও পুস্তিকাগুলো সংরক্ষিত আছে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরসহ নানা প্রতিষ্ঠানে। নতুন করে ছাপানোও হচ্ছে কিছু। এগুলো শুধু প্রচারপত্র নয় এগুলোই একাত্তরের চিত্রকথা, বাঙালীর লড়াইয়ের নান্দনিক দলিল। ইতিহাসবিদ ও গবেষকরা মনে করেন, এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রচারস্মারকগুলো বিশ্লেষণ করলে মুক্তিযুদ্ধের অজানা অধ্যায়গুলো আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
মুক্তিযুদ্ধ ছিল আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধ। সেই অস্তিত্ব রক্ষার গল্প লেখা হয়েছিল শুধু রণাঙ্গনে নয়, বরং দেয়াল, কাগজ আর পোস্টারের অক্ষরে অক্ষরে। আজকের প্রজন্মের কাছে এই পোস্টার-লিফলেটগুলো শুধু স্মারক নয়, এগুলো আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসের জীবন্ত দলিল।
পোস্টারের গ্যালারি: একাত্তরের প্রতিটি ছবির গল্প
- ১. ১৯৭১ এর পোস্টারে বঙ্গবন্ধু
- ২. মুক্তিযুদ্ধের পোস্টার- জয় বাংলা
বহু পোস্টারে লিফলেটে খুঁজে পাওয়া যায় বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি ও তাঁর নির্দেশনা। তেমন একটি পোস্টারে দেখা যায় পুরো জমিনজুড়ে মুজিবের প্রতিকৃতি। তর্জনী উঁচিয়ে বাঙালীর উদ্দেশে অবিসংবাদিত নেতা বলছেন "এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম… রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরও দেব… ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো।" সাত মার্চের ভাষণে এই গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দিয়েছিলেন বাঙালীর অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিব। এই ঐতিহাসিক ভাষণ মুক্তিকামী মানুষকে আন্দোলিত করেছিল, সাহস জুগিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রকাশিত পোস্টারে ভাষণটির মূল ভাব উদ্ধৃত করা হয়। তাঁর ডাকে নয় মাস সশস্ত্র সংগ্রাম করেছিল বাঙালী, আজও যেন সেই সাক্ষ্য দেয় এসব পোস্টার।
(১)
(২)
- ৩. মুক্তিযুদ্ধের পোস্টার- আমরা সবাই বাঙালি
পোস্টারটি বলছে, ধর্ম ও সম্প্রদায়ের পার্থক্যকে ছাপিয়ে বাঙালি জাতির জন্য সবাই একত্রিত। হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ, মুসলমান সবাই এক রকমের বাঙালি, এবং স্বাধীনতার জন্য ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন। ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমতার প্রতীক এই পোস্টার প্রমাণ করে, মুক্তিযুদ্ধ শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতার যুদ্ধই নয়, এটি একটি ন্যায় ও মানবতার যুদ্ধও। পোস্টারটি দেখায় যে ধর্মের পার্থক্য মানুষকে বিভাজিত করতে পারবে না, বরং সবাইকে সমান অধিকার ও মর্যাদাসহ বাঙালি হিসেবে গণ্য করা হবে।
১৯৭১ সালে সশস্ত্র সংগ্রাম ও রাজনৈতিক বিপর্যয়ের মধ্যে প্রচারপত্র ও পোস্টার ছিল জনগণকে একত্রিত করার এবং যুদ্ধের উদ্দেশ্য পরিষ্কারভাবে বোঝানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। পাকিস্তানি শাসনের সময় বাঙালি সমাজকে ধর্ম, অঞ্চল বা ভাষার ভিত্তিতে বিভক্ত করার যে চেষ্টা হয়েছিল, মুক্তিযুদ্ধের পোস্টারগুলো সেই বিভাজনকে অগ্রাহ্য করে জাতীয় চেতনা ও ঐক্যের বার্তা প্রচার করে। এটি ছিল একটি শক্তিশালী সামাজিক ও রাজনৈতিক বার্তা, যা তখনকার পরিস্থিতিতে মানুষকে উৎসাহিত করেছিল। ডিজাইনার: বরেণ্য চিত্রশিল্পী দেবদাস চক্রবর্তী (২৫ ডিসেম্বর ১৯৩৩ – ৫ ফেব্রুয়ারি ২০০৮)।
(৩)
- ৪. মুক্তিযুদ্ধের পোস্টার -"এই জানোয়ারদের হত্যা করতে হবে"
- ৫. মুক্তিযুদ্ধের পোস্টার -পটুয়া কামরুল হাসান
- ৬. মুক্তিযুদ্ধের পোস্টার - মুক্তিবাহিনী, ১৯৭১
বাংলাদেশের স্বনামধন্য পটুয়া শিল্পী কামরুল হাসানের আঁকা এই পোস্টারটি ছিল সবচেয়ে জনপ্রিয়। বাংলার মানুষদের বিরুদ্ধে ইয়াহিয়ার জল্লাদ রূপই এই পোস্টারটিতে ফুটে উঠেছে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের দলিলের সঙ্গে এই পোস্টারটিও হয়ে উঠেছে এক মূল্যবান দলিল। "এই জানোয়ারদের হত্যা করতে হবে" পোস্টারটি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের এক শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।
এই পোস্টারে পাকিস্তানের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ইয়াহিয়া খানের মুখাবয়বকে অশুভ জানোয়ার রূপে চিত্রিত করা হয়েছিল, যা মুক্তিযুদ্ধের সময় জনগণের মধ্যে প্রতিরোধের চেতনা জাগ্রত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পোস্টারটির ইংরেজি অনুবাদ ছিল "ANNIHILATE THESE DEMONS"। এই পোস্টারটি শুধুমাত্র একটি শিল্পকর্ম নয়, বরং একটি রাজনৈতিক প্রতিবাদ হিসেবে স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে রয়েছে।
(৪)
(৫)
(৬)
- ৭. সদা জাগ্রত বাংলার মুক্তিবাহিনী -১৯৭১ এর পোস্টার
এই পোস্টারটি প্রমাণ করে, বাংলার স্বাধীনতা অর্জনে বাংলার দামাল ছেলেরা প্রয়োজনে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিতে সদাপ্রস্তুত। দিন-রাত, সকাল-সন্ধ্যা, শীত-গ্রীষ্ম প্রকৃতির বৈরিতা কোনও কিছুর তোয়াক্কা না করে বুকের রক্ত বিলিয়ে যারা স্বাধীনতা এনেছে, তাদের দৃঢ় সংকল্প ও অনমনীয়তা এই পোস্টারে ফুটে উঠেছে। ডিজাইনার: চিত্রশিল্পী, নকশাবিদ ও ভাস্কর নিতুন কুন্ডু
(৭)
- ৮. মুক্তিযুদ্ধের পোস্টার — বাংলার মায়েরা, বাংলার মেয়েরা
লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমহানির বিনিময়ে অর্জিত হয় বাংলার স্বাধীনতা। যুদ্ধ ময়দানে এদেশের নারীদের অবদানের কথা অনস্বীকার্য। এই পোস্টারগুলো বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল — বিশ্ববাসী জানতে পেরেছিল, বাংলার স্বাধীনতার জন্য বাংলাদেশের মায়েরা, মেয়েরা সবাই যুদ্ধ করছে। দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল এই পোস্টার। শিল্পী: প্রাণেশ মণ্ডল।
(৮)
- ৯. মুক্তিযুদ্ধের পোস্টার — ১৯৭১
বাংলার প্রতিটি অক্ষরই যেন একজন বাঙালীর জীবনের প্রতিরূপ। বাংলাভাষা বাঁচানো মানেই বাঙালীর জীবন, সংস্কৃতি ও পরিচয় রক্ষা করা। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধের যোগসূত্র এখানে স্পষ্ট ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে ভাষার জন্য রক্ত দেওয়া হয়েছিল, আর ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ সেই ধারাবাহিকতার চূড়ান্ত রূপ, যেখানে ভাষা, সংস্কৃতি ও স্বাধীনতার প্রশ্ন একাকার হয়ে দাঁড়ায়।
মুক্তিযুদ্ধে যে লাখো মানুষ জীবন দিলেন, তাদের প্রতিটি জীবন যেন বাংলা অক্ষরের মতো অপরিহার্য কারো ত্যাগ উপেক্ষা করলে ভাষা ও স্বাধীনতার পূর্ণাঙ্গ চিত্র অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। এই পোস্টার বাঙালীদের মনে করিয়ে দিয়েছিল, শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ মানেই নিজের ভাষা ও অস্তিত্বকে বাঁচানো। তাই লড়াই কেবল জমি-ঘরের জন্য নয়, বরং প্রতিটি অক্ষর, প্রতিটি মানুষের জীবনের মর্যাদার জন্য।
(৯)
- ১০. ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের পোস্টার — মুক্তিবাহিনী
পোস্টারটি সাধারণ জনগণকে আহ্বান জানাচ্ছিল যে, মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া যেসব সৈনিক আহত বা ক্ষতিগ্রস্ত, তাদের সাহায্য করা আমাদের সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্ব। পোস্টারে উল্লেখ করা হয়েছে "এ আপনারই সন্তান" যা দেখায় মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের পরিবারের অংশ, তাদের সাহায্য করা মানে নিজের সন্তানকে সহায়তা করা।
এভাবে অর্থ, খাদ্য, চিকিৎসা বা আশ্রয়ের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সাহায্য করতে সাধারণ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা হতো। এটি তখনকার সময়ে দেশের মানুষকে একত্রিত করে স্বাধীনতার সংগ্রামের প্রতি সমর্থন জোরদার করার একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক উদ্যোগ ছিল মানবিক, ব্যক্তিগত এবং রাজনৈতিক স্তরে জনগণকে সচেতন ও সাহায্য করতে উদ্বুদ্ধ করার এক শক্তিশালী হাতিয়ার।
(১০)
- ১১. মুক্তিযুদ্ধের পোস্টার — ১৯৭১ এর রণাঙ্গন
পোস্টারটি দেশের সব শ্রেণীর মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে উদ্বুদ্ধ করছে। এটি বুঝাতে চায় যে মুক্তিযুদ্ধ শুধু সামরিক যুদ্ধ নয়, এটি একটি সামাজিক আন্দোলন, যেখানে প্রতিটি নাগরিক মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ভূমিকা রাখছে। পোস্টারটি মানুষের মধ্যে স্বাধীনতার চেতনা ও আত্মত্যাগের মনোভাব জাগানোর চেষ্টা করেছিল, সব সাধারণ মানুষকেই মুক্তিযুদ্ধের অংশীদার হিসেবে তুলে ধরে দেশের সকল স্তরের মানুষকে একত্রিত করার লক্ষ্যে।
(১১)
- ১২. মুক্তিযুদ্ধের পোস্টার — "বাংলাদেশে সম্পদ বৃদ্ধি করুন"
পোস্টারটি বুঝাতে চায় যে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সম্পদ বৃদ্ধিতে নিজস্ব উদ্যোগ নিতে হবে। পাকিস্তানি উৎপাদিত পণ্য কেনার পরিবর্তে স্থানীয় পণ্য ব্যবহার করতে উদ্বুদ্ধ করা হতো, যা তখনকার সময়ে একটি অর্থনৈতিক প্রতিবাদ ও স্বাধিকার চেতনার অংশ ছিল। পাকিস্তানি পণ্য বর্জন করা মানে ছিল শত্রুর প্রতি অমান্যতা ও দেশের স্বাধীনতার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান। এই পোস্টারটি অর্থনৈতিক স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে কাজ করছিল এবং জনগণকে সতর্ক ও সক্রিয়ভাবে পাকিস্তানি শোষণ ও প্রভাবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে উদ্বুদ্ধ করছিল।
(১২)
- ১৩. ১৯৭১ এর পোস্টার — "স্টপ জেনোসাইড"
পাকিস্তানি সেনাদের দ্বারা সংঘটিত গণহত্যার বিরুদ্ধে এই পোস্টারটি আন্তর্জাতিক সমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। পোস্টারের মূল বার্তা ছিল আন্তর্জাতিক সমর্থন ও মানবিক সাহায্য প্রেরণের সুযোগ তৈরি করা। ছবি, স্লোগান ও শব্দের সহজ অথচ শক্তিশালী ব্যবহার পোস্টারটিকে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের জন্য সহজলভ্য ও লক্ষ্যণীয় করেছে। এই পোস্টারটি আন্তর্জাতিকভাবে গণহত্যার খবর ছড়িয়ে দেওয়া এবং বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান ছিল।
(১৩)
শেষ কথা: রঙ-তুলিতে লেখা মুক্তির ইতিহাস
১৯৭১ সালের সেই উত্তাল দিনগুলোতে প্রচারপত্র ও পোস্টারগুলো কেবল কাগজ আর রঙের মিশ্রণ ছিল না; সেগুলো ছিল একেকটি অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। কামরুল হাসান, দেবদাস চক্রবর্তী, নিতুন কুণ্ডু ও প্রাণেশ মণ্ডলের মতো শিল্পীদের তুলি সেদিন রাইফেলের চেয়েও ধারালো হয়ে উঠেছিল। বঙ্গবন্ধুর বজ্রকণ্ঠের নির্যাস থেকে শুরু করে পাকিস্তানি জানোয়ারদের নৃশংসতা এবং বাংলার সব ধর্মের মানুষের অটুট ঐক্য — সবই এই পোস্টারগুলোর মাধ্যমে বিশ্ববিবেকের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল।
আজ কয়েক দশক পরেও এই চিত্রলিপিগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, একটি জাতির স্বাধীনতা শুধু অস্ত্রের মুখে আসে না, তার জন্য প্রয়োজন অদম্য সাংস্কৃতিক জাগরণ ও আদর্শিক ঐক্য। এই অমূল্য দলিলগুলো আমাদের ইতিহাসের অবিনাশী সাক্ষী, যা চিরকাল প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে দেশপ্রেমের দীপশিখা জ্বালিয়ে রাখবে।
সংক্ষিপ্ত জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন: ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পোস্টার ও লিফলেট কোথা থেকে প্রকাশিত হতো?
উত্তর: কলকাতায় অবস্থিত অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও প্রচার দফতর থেকে এসব পোস্টার ও লিফলেট প্রকাশিত হতো।
প্রশ্ন: এই পোস্টার আন্দোলনের নেতৃত্বে কে ছিলেন?
উত্তর: শিল্পাচার্য কামরুল হাসান এর নেতৃত্বে ছিলেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন দেবদাস চক্রবর্তী, নিতুন কুদ্দুস (নিতুন কুন্ডু), জহির আহমদ ও প্রাণেশ মণ্ডলসহ আরও অনেক শিল্পী।
প্রশ্ন: "এই জানোয়ারদের হত্যা করতে হবে" পোস্টারটি কার আঁকা এবং এতে কাকে দেখানো হয়েছে?
উত্তর: এটি এঁকেছিলেন কামরুল হাসান। পোস্টারে পাকিস্তানের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ইয়াহিয়া খানকে জানোয়ার রূপে চিত্রিত করা হয়েছিল। ইংরেজিতে এর শিরোনাম ছিল "ANNIHILATE THESE DEMONS"।
প্রশ্ন: "আমরা সবাই বাঙালি" পোস্টারটির মূল বার্তা কী ছিল?
উত্তর: এই পোস্টারে মসজিদ, মন্দির, গির্জা ও বৌদ্ধ বিহার পাশাপাশি এঁকে দেখানো হয়েছিল যে ধর্ম-সম্প্রদায় নির্বিশেষে সব বাঙালি এক ও ঐক্যবদ্ধ। এর ডিজাইনার ছিলেন দেবদাস চক্রবর্তী।
প্রশ্ন: "সদা জাগ্রত বাংলার মুক্তিবাহিনী" পোস্টারটি কে ডিজাইন করেছিলেন?
উত্তর: চিত্রশিল্পী, নকশাবিদ ও ভাস্কর নিতুন কুন্ডু এটি ডিজাইন করেছিলেন।
প্রশ্ন: "বাংলার মায়েরা বাংলার মেয়েরা" পোস্টারটির শিল্পী কে?
উত্তর: শিল্পী প্রাণেশ মণ্ডল। এই পোস্টারে মুক্তিযুদ্ধে নারীদের অবদান ও ত্যাগ তুলে ধরা হয়েছে।
প্রশ্ন: "স্টপ জেনোসাইড" পোস্টারটির উদ্দেশ্য কী ছিল?
উত্তর: পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করা এবং বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানানো ছিল এর মূল উদ্দেশ্য।
প্রশ্ন: আজ এই পোস্টার ও লিফলেটগুলো কোথায় সংরক্ষিত আছে?
উত্তর: এগুলো মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সংরক্ষিত আছে, এবং কিছু পোস্টার নতুন করে ছাপানোও হচ্ছে।














