বাংলাদেশের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টিতে হ্যাটট্রিক: ইতিহাস, রেকর্ড ও লজ্জার পরিসংখ্যান

বাউল পানকৌড়ি
আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের ইতিহাসে প্রথম হ্যাটট্রিকটি হয়েছিল বাংলাদেশের বিপক্ষে। এরপর কেটে গেছে প্রায় দুই দশক, কিন্তু দুঃখজনকভাবে এই প্রবণতা এখনও থেমে নেই। সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও একের পর এক বোলার বাংলাদেশের বিপক্ষে এই বিরল কীর্তি গড়ে চলেছেন। গতকাল পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশের বিপক্ষে মোট ৮টি হ্যাটট্রিক হয়েছে। টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে হ্যাটট্রিক একটি বিরল ও আকর্ষণীয় ঘটনা। কোনো বোলারের জন্য এটি ক্যারিয়ারের অন্যতম গর্বের মুহূর্ত, কিন্তু ব্যাটিং সাইডের জন্য তা চরম হতাশার। আর দুর্ভাগ্যক্রমে বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা এমন ঐতিহাসিক মুহূর্তের বারবার সাক্ষী হয়ে চলেছেন যেখানে বিশ্বের সেরা বোলারদের বিপক্ষে নিজেদের উইকেট বিলিয়ে দিয়ে আসতে হয়েছে তাদের। 

শুধু সর্বোচ্চ হ্যাটট্রিকের শিকার হওয়াই নয়, এর সাথে যুক্ত হয়েছে আরও কিছু নজিরবিহীন রেকর্ড। যেমন টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের ইতিহাসে প্রথম হ্যাটট্রিকটিই ঘটেছিল বাংলাদেশের বিপক্ষে, এবং বাংলাদেশের অলরাউন্ডার মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ টি-টোয়েন্টি হ্যাটট্রিকের শিকার হয়েছেন তিনবার  যা বিশ্ব ক্রিকেটে বিরল এক ইতিহাস। এমনকি কোনো বোলারের অভিষেক ম্যাচে প্রথম হ্যাটট্রিকের সাক্ষীও হয়েছে বাংলাদেশ। চলুন, ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নেওয়া সেই আট বোলার এবং তাদের শিকার হওয়া বাংলাদেশি ব্যাটারদের নিয়ে বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক।।

টি-২০তে বাংলাদেশের বিপক্ষে যত হ্যাটট্রিক

এক নজরে বাংলাদেশের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি হ্যাটট্রিক

টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে হ্যাটট্রিক সবসময়ই একটি বিরল ও স্মরণীয় ঘটনা। তবে বাংলাদেশের জন্য এই ঘটনাগুলো বেশিরভাগ সময়ই এসেছে হতাশার স্মৃতি হয়ে। ক্রিকেট ইতিহাসের প্রথম টি-টোয়েন্টি হ্যাটট্রিক থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক সময়ের একাধিক হ্যাটট্রিক, বারবার বাংলাদেশকেই হতে হয়েছে প্রতিপক্ষ বোলারদের ঐতিহাসিক কীর্তির সাক্ষী। নিচের সারণিতে বাংলাদেশের বিপক্ষে হওয়া টি-টোয়েন্টি হ্যাটট্রিকগুলোর গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান ও উল্লেখযোগ্য তথ্য এক নজরে তুলে ধরা হলো।
রেকর্ড তথ্য
মোট হ্যাটট্রিক ৮টি
প্রথম হ্যাটট্রিক ব্রেট লি (২০০৭)
সর্বশেষ হ্যাটট্রিক রোমারিও শেফার্ড (২০২৫/২৬)
সর্বাধিক শিকার ব্যাটার মাহমুদউল্লাহ (৩ বার)
প্রথম টি-টোয়েন্টি হ্যাটট্রিক বাংলাদেশের বিপক্ষে
অভিষেকে হ্যাটট্রিক নাথান এলিস (২০২১)
আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে বাংলাদেশের বিপক্ষে এখন পর্যন্ত ৮টি হ্যাটট্রিক হয়েছে। প্রথমটি করেছিলেন ব্রেট লি, আর সর্বশেষ কীর্তিটি গড়েছেন রোমারিও শেফার্ড।

ব্রেট লি, কেপটাউন (২০০৭/০৮)

টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের ইতিহাসে প্রথম হ্যাটট্রিকটি করেন অস্ট্রেলিয়ার কিংবদন্তি পেসার ব্রেট লি। ২০০৭ সালের উদ্বোধনী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের বিপক্ষে এই ঐতিহাসিক কীর্তি গড়েন তিনি। তার হ্যাটট্রিকের শিকার হয়েছিলেন বাংলাদেশের তৎকালীন তারকা ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান, মাশরাফি বিন মোর্তাজা এবং অলোক কাপালি। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের একেবারে সূচনালগ্নে ঘটা এই ঘটনাটি আজও ইতিহাসের পাতায় একটি স্মরণীয় মুহূর্ত হিসেবে থেকে গেছে।
  • শিকার:
    • সাকিব আল হাসান
    • মাশরাফি বিন মোর্তজা
    • অলোক কাপালি

বিশেষত্ব:আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট ইতিহাসের প্রথম হ্যাটট্রিক।


ব্রেট লি

লাসিথ মালিঙ্গা, কলম্বো (২০১৬/১৭)

ক্রিকেট ইতিহাসের আরেক কিংবদন্তি লাসিথ মালিঙ্গা তার ক্যারিয়ারে একাধিকবার হ্যাটট্রিকের কীর্তি গড়েছেন, আর তার মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য হ্যাটট্রিক এসেছে বাংলাদেশের বিপক্ষেই। ২০১৬/১৭ মৌসুমে কলম্বোয় অনুষ্ঠিত সেই ম্যাচে মালিঙ্গার বিধ্বংসী ইয়র্কারের শিকার হন মুশফিকুর রহিম, মাশরাফি বিন মোর্তাজা এবং মেহেদী হাসান মিরাজ।
  • শিকার:
    • মুশফিকুর রহিম
    • মাশরাফি বিন মোর্তজা
    • মেহেদী হাসান মিরাজ

বিশেষত্ব: মালিঙ্গার বিখ্যাত ইয়র্কার-নির্ভর আরেকটি আন্তর্জাতিক হ্যাটট্রিক।


লাসিথ মালিঙ্গা

দীপক চাহার, নাগপুর (২০১৯/২০):

২০১৯/২০ মৌসুমে ভারতের নাগপুরে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে দুর্দান্ত এক স্পেল করেন দীপক চাহার। পরপর তিন বলে তিনি ফিরিয়ে দেন শফিউল ইসলাম, মুস্তাফিজুর রহমান এবং আমিনুল ইসলাম বিপ্লবকে, সম্পূর্ণ করেন হ্যাটট্রিক। সুইং ও গতির অসাধারণ মিশেলে গড়া সেই স্পেলটি এখনও আলোচিত হয় বাংলাদেশ-ভারত টি-টোয়েন্টি লড়াইয়ের ইতিহাসে।
  • শিকার:
    • শফিউল ইসলাম
    • মুস্তাফিজুর রহমান
    • আমিনুল ইসলাম বিপ্লব

বিশেষত্ব: টি-টোয়েন্টি ইতিহাসের অন্যতম সেরা বোলিং স্পেল; ম্যাচে ৬ উইকেট নিয়ে মাত্র ৭ রান দেন


দীপক চাহার

নাথান এলিস, ঢাকা (২০২১):

২০২১ সালে ঢাকার মাটিতে অস্ট্রেলিয়ার তরুণ পেসার নাথান এলিসের সামনে পড়ে বাংলাদেশ। সিরিজের শেষ ম্যাচে দুর্দান্ত বোলিং করে মাহমুদউল্লাহ, মুস্তাফিজুর রহমান এবং মেহেদী হাসানকে পরপর তিন বলে ফিরিয়ে দেন এলিস। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এটি ছিল টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের ইতিহাসে কোনো বোলারের অভিষেক ম্যাচে প্রথম হ্যাটট্রিক আর এই বিরল রেকর্ডের সাক্ষী থাকতে হলো বাংলাদেশকেই।
  • শিকার:
    • মাহমুদউল্লাহ
    • মুস্তাফিজুর রহমান
    • মেহেদী হাসান মিরাজ

বিশেষত্ব:টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ইতিহাসে অভিষেক ম্যাচে প্রথম হ্যাটট্রিক।


নাথান এলিস

করিম জানাত, সিলেট (২০২৩):

২০২৩ সালে সিলেটে আফগানিস্তানের অলরাউন্ডার করিম জানাতের হ্যাটট্রিকের শিকার হয় বাংলাদেশ দল। তার শিকার হয়েছিলেন মেহেদী হাসান মিরাজ, তাসকিন আহমেদ এবং নাসুম আহমেদ। আফগানিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশের এই বিব্রতকর অভিজ্ঞতা মনে করিয়ে দেয়, উঠতি ক্রিকেট শক্তির বিপক্ষেও বাংলাদেশ এই দুর্বলতা থেকে মুক্ত নয়।
  • শিকার:
    • মেহেদী হাসান মিরাজ
    • তাসকিন আহমেদ
    • নাসুম আহমেদ

বিশেষত্ব:বাংলাদেশের মাটিতে আফগানিস্তানের প্রথম টি-টোয়েন্টি হ্যাটট্রিক।


করিম জানাত

নুয়ান থুশারা, সিলেট (২০২৩/২৪):

২০২৩/২৪ মৌসুমে শ্রীলঙ্কার পেসার নুয়ান থুশারা সিলেটের মাঠেই পরপর তিন বলে ফিরিয়ে দেন বাংলাদেশের তারকা ব্যাটসম্যান নাজমুল হোসেন শান্ত, তৌহিদ হৃদয় এবং মাহমুদউল্লাহকে। এই হ্যাটট্রিকের মধ্য দিয়ে মাহমুদউল্লাহ দ্বিতীয়বারের মতো হ্যাটট্রিকের শিকার হওয়া বাংলাদেশি ব্যাটার হিসেবে নাম লেখান।
  • শিকার:
    • নাজমুল হোসেন শান্ত
    • তৌহিদ হৃদয়
    • মাহমুদউল্লাহ

বিশেষত্ব:হমুদউল্লাহ দ্বিতীয়বারের মতো টি-টোয়েন্টি হ্যাটট্রিকের শিকার হন।


নুয়ান থুশারা,

প্যাট কামিন্স, নর্থ সাউন্ড (২০২৪):

২০২৪ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক প্যাট কামিন্স বাংলাদেশের বিপক্ষে হ্যাটট্রিকের কীর্তি গড়েন। তার শিকার হয়েছিলেন মাহমুদউল্লাহ, মেহেদী হাসান এবং তৌহিদ হৃদয়। এই হ্যাটট্রিকের মধ্য দিয়েই মাহমুদউল্লাহ হয়ে যান বিশ্ব ক্রিকেট ইতিহাসে তিনবার হ্যাটট্রিকের শিকার হওয়া বিরল তালিকার একজন।
  • শিকার:
    • মাহমুদউল্লাহ
    • মেহেদী হাসান
    • তৌহিদ হৃদয়

বিশেষত্ব:টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের মঞ্চে বাংলাদেশের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক; মাহমুদউল্লাহ তৃতীয়বার হ্যাটট্রিকের শিকার হন।


প্যাট কামিন্স

রোমারিও শেফার্ড, চট্টগ্রাম (২০২৫/২৬):

সবশেষ, ২০২৫/২৬ মৌসুমে চট্টগ্রামের মাটিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের পেসার রোমারিও শেফার্ড বাংলাদেশের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করেন। তার শিকার হয়েছিলেন নুরুল হাসান, তানজিদ হাসান এবং শরিফুল ইসলাম। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে, সমস্যাটি এখনও অব্যাহত এবং সাম্প্রতিক সময়েও এর কোনো সমাধান আসেনি।
  • শিকার:
    • নুরুল হাসান
    • তানজিদ হাসান
    • শরিফুল ইসলাম

বিশেষত্ব:বাংলাদেশের বিপক্ষে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে অষ্টম হ্যাটট্রিক


রোমারিও শেফার্ড

কারা কতবার হ্যাটট্রিকের শিকার হয়েছেন?

আট হ্যাটট্রিকের শিকার ব্যাটারদের তালিকা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই অভিজ্ঞতা কেবল একজন-দুজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ রয়েছেন সবার শীর্ষে তিনি একাই তিনবার হ্যাটট্রিকের শিকার হয়েছেন, যা বিশ্ব ক্রিকেটের বিরল ও অনাকাঙ্ক্ষিত রেকর্ডগুলোর একটি। এছাড়া মুস্তাফিজুর রহমান, মেহেদী হাসান মিরাজ, মেহেদী হাসান এবং তৌহিদ হৃদয়  এই চারজনই সমান দুইবার করে হ্যাটট্রিকের অংশ হয়েছেন, এবং তারা মাহমুদউল্লাহর রেকর্ডে ভাগ বসানোর খুব কাছাকাছি অবস্থানে আছেন।

কেন এই বারবার হ্যাটট্রিকের শিকার?

এই বারবার হ্যাটট্রিকের ঘটনা স্পষ্টভাবেই প্রমাণ করে যে, গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে মনোযোগ ধরে রাখা এবং চাপের মুখে মাথা ঠান্ডা রেখে খেলার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ব্যাটারদের আরও উন্নতির প্রয়োজন রয়েছে। এই পরিসংখ্যান দলের জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা এবং ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে কৌশলগত পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে। প্রশ্ন জাগে  টিম ম্যানেজমেন্ট, কোচ কিংবা কোচিং স্টাফ কি আদৌ ব্যাটারদের মাঠে নামার আগে বলে দেন হ্যাটট্রিক ঠেকানোর কথা? মনে পড়ে যায় স্কুলজীবনের ক্রিকেটের কথা, যখন সিনিয়র বা বন্ধুরা বলতেন  "হ্যাটট্রিক চান্স, ঠেক দেইস কিন্তু!" অথচ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এসেও এই মৌলিক সতর্কতার অভাব যেন থেকেই যাচ্ছে। এই ধরনের রেকর্ড আমাদের জন্য যে সত্যিকার অর্থেই লজ্জার, তা আমাদের ক্রিকেটারদের অনুধাবন করার সময় এসেছে।

3/related/default