বাংলার লোকসংস্কৃতির ভাণ্ডারে এমন অনেক দেবতা, অপদেবতা ও লোকবিশ্বাস ছড়িয়ে আছে, যাদের পরিচয় মূলধারার ধর্মীয় আচার থেকে একেবারেই আলাদা। কোথাও গাছকে ঘিরে পূজা, কোথাও পাথর বা মাটির ঢিবি হয়ে উঠেছে দেবতার প্রতীক, আবার কোথাও অদ্ভুত আকৃতির মূর্তিকে কেন্দ্র করে বহু বছর ধরে চলে আসছে লোকাচার। ঢাকার নবাবগঞ্জের নিশকাইন্দা তেমনই এক রহস্যময় লোকদেবতা বা অপদেবতার নাম। তাঁর মূর্তি প্রচলিত দেবদেবীর মতো নয় খোলা আকাশের নিচে মাটির তৈরি প্রায় ৩০ ফুট লম্বা এক চতুষ্পদ অবয়ব, যার হাত-পা চারদিকে ছড়ানো। স্থানীয় বিশ্বাসে নিশকাইন্দার সঙ্গে শিবের সম্পর্ক রয়েছে। লোকসংস্কৃতি গবেষণার দৃষ্টিতে এটি বাংলার প্রাচীন স্থানীয় ভূতদেবতা বা লোকদেবতার ধারার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।
নেই কোনো বড় মন্দির, নেই পাকা বেদি, নেই স্থায়ী ছাউনি। তবু বছরের পর বছর ধরে এখানে মোমবাতি জ্বলছে, বাতাসা ভোগ দেওয়া হচ্ছে। চৈত্রসংক্রান্তিতে বসছে পূজা, মেলা ও বিচারগানের আসর। আবার বাংলার অন্য প্রান্তের নিশিকান্ত নামের এক ভূতদেবতার সঙ্গে তাঁর নাম ও মূর্তির কিছু আশ্চর্য মিলও পাওয়া যায়। সেই মিল কি কোনো পুরোনো লোকঐতিহ্যের ইঙ্গিত? নাকি কেবলই কাকতাল? নিশ্চিত উত্তর হয়তো এখনো নেই। তবে নিশকাইন্দার গল্পটি যে বাংলার লোকসংস্কৃতির একটি বিস্মৃত অধ্যায়ের দরজা খুলে দেয়, তাতে সন্দেহ নেই।
কোথায় রয়েছে নিশকাইন্দার থান?
নবাবগঞ্জ শহর পেরিয়ে দোহারমুখী সড়কে এগোলে ইমামনগর সেতুর কাছে দূর থেকেই চোখে পড়ে একটি লাল নিশান। আশপাশের স্বাভাবিক দৃশ্যের মধ্যে সেটি আলাদা করে নজর কাড়ে। সেতুর দক্ষিণ পাশে এগিয়ে গেলে দেখা যায় একটি পাকুড়গাছ। গাছটির নিচে বেশ নিরিবিলি পরিবেশ। দিনের ব্যস্ততা যেন এখানে এসে কিছুটা থেমে গেছে। এই গাছের নিচেই নিশকাইন্দার থান। গাছের ছায়ায় পড়ে থাকা মাটির বিশাল অবয়বটির চারপাশে কোনো জাঁকজমক নেই। পূজার সময় ছাড়া জায়গাটি বেশ শান্ত। কখনো মোমবাতির অবশিষ্টাংশ, কখনো শুকনো ফুল কিংবা বাতাসার টুকরো পড়ে থাকতে দেখা যায়। নিশকাইন্দার অদূরেই রয়েছে ছোট একটি মন্দির। সেখানে সিংহবাহিনী দেবীর মূর্তি রয়েছে। কিন্তু ওই মন্দির আর নিশকাইন্দার থানের চরিত্র একেবারেই আলাদা। একটি পরিচিত মন্দিরের কাঠামোয় আবদ্ধ; অন্যটি যেন সরাসরি মাটি, গাছ আর খোলা আকাশের সঙ্গে মিশে থাকা এক লোকবিশ্বাস।
এক নজরে নিশকাইন্দা
- অবস্থান: ইমামনগর সেতুর দক্ষিণ পাশে, নবাবগঞ্জ, ঢাকা
- পরিচয়: স্থানীয়ভাবে ভূতদেবতা/অপদেবতা হিসেবে পরিচিত
- মূর্তি: মাটির তৈরি বিশাল চতুষ্পদ অবয়ব
- দৈর্ঘ্য: প্রায় ৩০ ফুট
- উচ্চতা: প্রায় ৬ ফুট
- প্রধান পূজা: চৈত্রসংক্রান্তি
- পূজার সময়কাল: তিন দিন
- উৎসব: মেলা ও বিচারগানের আসর
- সারা বছরের আচার: সন্ধ্যায় মোমবাতি জ্বালানো ও বাতাসার ভোগ
- স্থানীয় বিশ্বাস: নিশকাইন্দা মহাদেবের একটি রূপ
- লোকসংস্কৃতির দৃষ্টিতে: প্রাচীন স্থানীয় লোকদেবতা বা ভূতদেবতার ধারার সম্ভাব্য উত্তরাধিকার
প্রচলিত দেবমূর্তির মতো নয় নিশকাইন্দা
নিশকাইন্দার সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় তাঁর মূর্তি। সাধারণ দেবমূর্তিতে যেমন মানুষের মুখ, হাত, অস্ত্র বা নির্দিষ্ট প্রতীক দেখা যায়, এখানে সেই পরিচিত ছক একেবারেই নেই। মাটি দিয়েই বিশাল এক চতুষ্পদ প্রাণীর মতো অবয়ব গড়া হয়েছে। বিভিন্ন বর্ণনা অনুযায়ী এর দৈর্ঘ্য প্রায় ৩০ ফুট আর উচ্চতা ছয় ফুটের কাছাকাছি। শরীরটা টানা লম্বা করে গড়া উত্তর-দক্ষিণে।
- মাথা: উত্তর দিকে, ত্রিভুজের মতো। চোখ-মুখের স্পষ্ট কোনো আকার নেই।
- মুখের প্রতীক: সিঁদুর মাখা একটি কাঠের গজাল, তার আশপাশে রঙিন মাটির বৃত্ত, মাঝখানে শুকনো গাঁদার মালা। এগুলোকেই চোখ-নাকের ইঙ্গিত ধরা হয়।
- পিঠ: মোটামুটি সমতল, তাতে লাল-হলুদ দাগ ও ফোঁটা।
- হাত-পা: চারপাশে ছড়ানো, প্রতিটিতে মাটির তৈরি রঙিন বালা।
সব মিলিয়ে মূর্তিটি মন্দিরের দেবমূর্তির চেয়ে অনেক বেশি লোকজ। এখানে নিখুঁত ভাস্কর্যের চেয়ে প্রতীক আর বিশ্বাসের গুরুত্বই বেশি।
নিশকাইন্দার পূজা: নিত্য আচার ও চৈত্রসংক্রান্তির মেলা
নিশকাইন্দার পূজা শুধু বছরের একটি বিশেষ দিনকে ঘিরে নয়। স্থানীয় রীতি অনুযায়ী, সারা বছর সন্ধ্যায় নিশকাইন্দার থানে মোমবাতি জ্বালানো হয়। দেওয়া হয় বাতাসার ভোগ। থানের পাশে ছোট একটি তুলসীমঞ্চেও কখনো মোমবাতি ও বাতাসা রাখা থাকে। আধপোড়া মোমবাতির পাশে পিঁপড়ার সারি এসে বসে ভোগে দৃশ্যটি খুব সাধারণ, কিন্তু এর মধ্যেই ধরা পড়ে বহুদিনের একটি লোকাচারের ধারাবাহিকতা। এখানে ভক্তির প্রকাশও খুব সরল। নেই বিশাল আয়োজন, নেই প্রতিদিনের বড় অনুষ্ঠান। ছোট ছোট আচারেই টিকে আছে নিশকাইন্দার সঙ্গে স্থানীয় মানুষের সম্পর্ক। তবে বছরের সবচেয়ে বড় আয়োজন আসে চৈত্রসংক্রান্তিতে।
- নিত্য পূজা: সারা বছর রোজ সন্ধ্যায় থানে মোমবাতি জ্বালানো হয় আর বাতাসার ভোগ দেওয়া হয়।
- বার্ষিক পূজা: চড়ক পূজার সময়, প্রতিবছর চৈত্রসংক্রান্তির দিন শুরু হয়ে চলে তিন দিন।
- মেলা ও গান: পূজা উপলক্ষে বড় মেলা বসে, জমে ওঠে বিচারগানের আসর। প্রতি রাতে প্রসাদ বিতরণ করা হয়।
স্থানীয়দের বক্তব্য অনুযায়ী, চড়কপূজার সময় নিশকাইন্দার পূজা অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিবছর চৈত্রসংক্রান্তির দিন পূজা শুরু হয়ে তিন দিন ধরে চলে। এই কয়েক দিনে থানটির চেহারা বদলে যায়। বসে মেলা। আশপাশের মানুষ ছাড়াও দূর-দূরান্ত থেকে লোকজন আসেন। বিচারগানের আসর বসে বলে স্থানীয়ভাবে জানা যায়। রাতে প্রসাদ বিতরণ করা হয়। ধর্মীয় আচার, লোকগান, মেলা ও মানুষের সমাগম সব মিলিয়ে নিশকাইন্দার পূজা তখন একটি বড় সামাজিক আয়োজনের রূপ নেয়।এই দিকটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ লোকদেবতার পূজা অনেক সময় শুধু ধর্মীয় বিশ্বাসের বিষয় থাকে না; তার সঙ্গে স্থানীয় মানুষের বিনোদন, সামাজিক যোগাযোগ এবং ঐতিহ্যও জড়িয়ে যায়। নিশকাইন্দার ক্ষেত্রেও চৈত্রসংক্রান্তির আয়োজনটি সম্ভবত সেই পুরোনো গ্রামীণ সংস্কৃতিরই একটি ধারাবাহিকতা।
শিবের রূপ নাকি লোকদেবতা উত্তরাধিকার?
নিশকাইন্দাকে ঘিরে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বাস হলো তিনি মহাদেব শিবের একটি বিশেষ রূপ। সেবাইত পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো এক সময়ে দেবাদিদেব মহাদেব নিশকাইন্দা রূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন। সেই বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এখানে পূজা হয়ে আসছে। তবে এখানে একটি পার্থক্য মনে রাখা দরকার। স্থানীয় বিশ্বাস আর ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত তথ্য এক জিনিস নয়। বাংলার লোকসংস্কৃতিতে বহু স্থানীয় দেবতা পরবর্তী সময়ে পরিচিত দেবদেবীর সঙ্গে সম্পর্কিত হয়েছেন। কোনো দেবতা শিবের রূপ পেয়েছেন, কোনোটি কালী বা মনসার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। ফলে নিশকাইন্দার সঙ্গে শিবের সম্পর্কটি স্থানীয় ধর্মীয় সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও, এটিকে নিশ্চিত ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য আরও গবেষণা প্রয়োজন।
বাংলার গ্রামীণ সংস্কৃতিতে স্থানীয় দেবতা ও অপদেবতার ইতিহাস অনেক পুরোনো। কোনো অঞ্চলে একটি গাছ, কোথাও পাথর, কোথাও পুকুর বা নদী, আবার কোথাও মাটির ঢিবি হয়ে উঠেছে পূজার কেন্দ্র। এসব বিশ্বাসের অনেকগুলো লিখিত শাস্ত্রে স্থান পায়নি। মানুষের মুখে মুখে, পারিবারিক রীতিতে এবং স্থানীয় আচারেই সেগুলো টিকে থেকেছে। সময়ের সঙ্গে এমন বহু লোকবিশ্বাস হারিয়ে গেছে। কিছু অন্য ধর্মীয় ধারার সঙ্গে মিশেছে। কিছু পরিচিত দেবতার সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে নতুন পরিচয় পেয়েছে। আবার কিছু হয়তো এখনো কোনো গ্রামের নির্দিষ্ট কোণে পুরোনো রূপেই টিকে আছে। নিশকাইন্দার মূর্তির ধরন, খোলা আকাশের নিচে থান, স্থানীয় পূজার রীতি এবং ভূতদেবতা হিসেবে পরিচিতি সব মিলিয়ে তাঁকে বাংলার সেই স্থানীয় লোকবিশ্বাসের ধারার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা যায়। তবে এটিও একটি সাংস্কৃতিক ব্যাখ্যা, নিশ্চিত ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নয়।
নিশকাইন্দা আর নিশিকান্ত: কোনো যোগসূত্র আছে?
নিশকাইন্দার কাহিনির সবচেয়ে কৌতূহলজাগানো অধ্যায় সম্ভবত এটি। পশ্চিমবঙ্গের নদীয়ার শান্তিপুরের ফুলিয়া গ্রামে নিশিকান্ত নামে এক ভূতদেবতার থান আছে। মৃগাঙ্ক চক্রবর্তীর বাংলার দেবতা, অপদেবতা ও লোকদেবতা বইয়ে তাঁর উল্লেখ পাওয়া যায়। নাম যেমন কাছাকাছি, মূর্তির গড়নেও তেমনি মিল আছে। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, নিশিকান্তের পূজা আদিতে হতো টাঙ্গাইলের বামনকুইচা গ্রামে। সেখানকার বসাক পরিবার কয়েক শতাব্দী ধরে তাঁর আরাধনা করত। লোককথায় বলা হয়, পরিবারের কেউ স্বপ্নে দেবতার আদেশ পেয়েছিলেন, পূজা না করলে অমঙ্গল হবে। দেশভাগের পর পরিবারটি ফুলিয়ায় বসতি গড়লে পূজার ধারাও সেখানে চলে যায়। যদিও নদীয়ার অনেকে বলেন, ফুলিয়ার তালতলার এক যাদব সন্ন্যাসীই এই পূজা চালু করেছিলেন। ফুলিয়ায় অল্প দূরত্বেই একাধিক ভূতপূজা হয়, তাই কোনটি বেশি প্রাচীন তা বলা কঠিন।
ফুলিয়ার নিশিকান্তের রূপ কিছুটা ভিন্ন। মাটির ঢিবিতে মানুষের আকৃতি গড়া হয়, আলাদা মাথা থাকে না, বুকের ওপরেই বসানো থাকে চোখ, নাক আর লকলকে জিভ বের করা মুখ। পূজায় পাঁঠা বলিও হয়। স্থানীয় গল্পে শোনা যায়, রাতে বউয়ের বেশে এক অশরীরী ঘুরে বেড়ায়, আর হারিয়ে যাওয়া মানুষকে পরদিন থানের সামনে অজ্ঞান অবস্থায় পাওয়া যায়। এসব গল্প অতিপ্রাকৃত ঘটনার প্রমাণ নয়, লোককথা। তবে এ ধরনের কাহিনিই একটি স্থানকে সাধারণ জায়গা থেকে আলাদা করে তোলে, সেখানে ভয় আর শ্রদ্ধা একসঙ্গে জন্মায়। তাই একটা কথা পরিষ্কার থাকা দরকার। নাম আর মূর্তির মিল থাকলেও নিশকাইন্দা ও নিশিকান্তকে একই দেবতার দুই রূপ বলার মতো যথেষ্ট ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। বিষয়টিকে সম্ভাব্য লোকঐতিহ্যগত যোগসূত্র হিসেবেই দেখা ভালো। একই দেবতা যদি সত্যিই দেশভাগের সীমানা পেরিয়ে দুই বাংলায় দুই নামে টিকে থাকেন, তবে সেটি শুধু ধর্মবিশ্বাসের নয়, উদ্বাস্তু জীবনের স্মৃতিরও চিহ্ন। মানুষ ঘর ছেড়েছে, কিন্তু দেবতাকে সঙ্গে নিয়ে গেছে।
বাংলার ভূতবৈচিত্র্য: নিশকাইন্দা কোথায় দাঁড়িয়ে?
বাংলার ভূতজগৎ নিজেই এক বিচিত্র ভুবন। ব্রাহ্মণের ভূত ব্রহ্মদৈত্য, মুসলমান ভূত মামদো, অবিবাহিত প্রেত-পেতনি, বিবাহিত নারীর প্রেতাত্মা শাঁখচুন্নী, মেছো ভূত, জলের দেশের হাঁড়া-আলেয়া, বৈশাখী ঝড়ের ভূত বাঁড়ুল, এমনকি গরুরূপী গোদানা আর প্যাঁচারূপী পেঁচাপেঁচি সবই আছে এই তালিকায়। এসব সংস্কারের বেশিরভাগ এখন বিলুপ্তির পথে। অনেক ভূত শুধু ভয়ের গল্পেই বেঁচে থাকে। কিন্তু নিশকাইন্দা বা নিশিকান্তের মতো কিছু ভূতদেবতা ভয়ের জায়গা থেকে উঠে এসে নিয়মিত পূজা, মেলা আর উৎসবের অংশ হয়ে গেছেন। ভূত থেকে দেবতা হয়ে ওঠার এই যাত্রাই বাংলা লোকধর্মের এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য।
ভয় আর ভক্তির টানে কেন এখনো টিকে আছেন নিশকাইন্দা?
নিশকাইন্দার ক্ষেত্রেও ভয় ও ভক্তির একটি মিশ্র অনুভূতি কাজ করে বলে মনে হয়। ভূতদেবতা বা অপদেবতার ধারণার মধ্যে সাধারণত শুধু পূজা থাকে না; থাকে অজানা শক্তির প্রতি মানুষের এক ধরনের শ্রদ্ধা ও আশঙ্কা। হয়তো সেই কারণেই এমন দেবতার থানে নিয়মিত মোমবাতি জ্বালানো হয়, ভোগ দেওয়া হয় এবং বিশেষ সময়ে বড় পূজার আয়োজন করা হয়। নিশকাইন্দাকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের বিশ্বাসকে বাইরে থেকে শুধু কুসংস্কার বলে উড়িয়ে দিলে এই সংস্কৃতির একটি বড় অংশ অদৃশ্য হয়ে যায়। কারণ বিশ্বাসটি কীভাবে তৈরি হয়েছে, কেন টিকে আছে এবং কীভাবে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে পৌঁছেছে সেই ইতিহাসও গুরুত্বপূর্ণ।
সময়ের সঙ্গে অনেক লোকদেবতার পূজা হারিয়ে গেছে। আধুনিক জীবন, নগরায়ণ, মানুষের স্থানান্তর এবং সামাজিক পরিবর্তনের কারণে বহু পুরোনো লোকাচার এখন আর আগের মতো দেখা যায় না। তারপরও নিশকাইন্দা টিকে আছেন। এর পেছনে স্থানীয় মানুষের দীর্ঘদিনের বিশ্বাস যেমন আছে, তেমনি রয়েছে পারিবারিক উত্তরাধিকার। সেবাইত পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই পূজার সঙ্গে যুক্ত। চৈত্রসংক্রান্তির মেলা ও বিচারগানও এই ঐতিহ্যকে মানুষের সামাজিক জীবনের সঙ্গে যুক্ত রেখেছে। অর্থাৎ নিশকাইন্দা শুধু পূজার একটি প্রতীক নন; তিনি এলাকার স্মৃতির অংশ। একটি শিশুর কাছে হয়তো তিনি শৈশবের মেলার স্মৃতি, কারও কাছে পারিবারিক পূজার অংশ, আবার কারও কাছে কৌতূহলের একটি অদ্ভুত স্থান। এইভাবেই একটি লোকবিশ্বাস কেবল ধর্মীয় আচার হিসেবে নয়, সাংস্কৃতিক স্মৃতি হিসেবেও বেঁচে থাকে।
হারিয়ে যাওয়ার আগে সংরক্ষণ জরুরি
নিশকাইন্দার মতো লোকঐতিহ্যের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো এর ইতিহাসের বড় অংশ লিখিত নয়। কখন প্রথম পূজা শুরু হয়েছিল? মূর্তির বর্তমান আকৃতি কত পুরোনো? আগে কি মূর্তি অন্যরকম ছিল? নিশকাইন্দা নামটির উৎপত্তি কী? স্থানীয় শিব-সম্পর্কিত বিশ্বাসটি কখন থেকে প্রচলিত? নিশিকান্তের সঙ্গে কোনো ঐতিহাসিক সম্পর্ক আদৌ আছে কি না? এসব প্রশ্নের উত্তর হয়তো স্থানীয় প্রবীণ মানুষের স্মৃতি, সেবাইত পরিবারের বংশপরম্পরা কিংবা পুরোনো কোনো নথির মধ্যে লুকিয়ে আছে। তাই এই ধরনের লোকঐতিহ্য সংরক্ষণের জন্য শুধু মূর্তির ছবি তুলে রাখা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন স্থানীয় মানুষের সাক্ষাৎকার, পূজার আচার, মেলার বিবরণ, পুরোনো ছবি, পারিবারিক স্মৃতি এবং স্থানটির পরিবর্তনের ইতিহাস নথিবদ্ধ করা। কারণ একটি লোকঐতিহ্য হারিয়ে গেলে শুধু একটি মূর্তি হারায় না; তার সঙ্গে হারিয়ে যেতে পারে একটি এলাকার বহু প্রজন্মের স্মৃতি।
শেষ কথা: নিশকাইন্দা শুধু একটি মূর্তি নয় লোক ঐতিহ্যের দলিল
নবাবগঞ্জের ইমামনগর সেতুর পাশে পাকুড়গাছের নিচে পড়ে থাকা মাটির বিশাল অবয়বটি প্রথম দেখায় অদ্ভুত লাগতেই পারে। কিন্তু একটু থামলে দৃশ্যটি অন্যরকম হয়ে ওঠে। মাটির শরীরে লাল-হলুদ রঙের চিহ্ন, পাশে শুকনো ফুল, কোথাও মোমবাতির দাগ, বাতাসার ভোগ, মাথার ওপর লাল নিশান সবকিছু যেন একসঙ্গে একটি গল্প বলে। সেটি কেবল কোনো দেবতার গল্প নয়। এটি মানুষের বিশ্বাসের গল্প, ভয়কে আচার দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করার গল্প, স্থানীয় সংস্কৃতির গল্প এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে স্মৃতি বহন করে চলার গল্প। নিশকাইন্দা সত্যিই শিবের কোনো রূপ কি না তা স্থানীয় বিশ্বাসের বিষয়। তিনি কোনো প্রাচীন ভূতদেবতার উত্তরাধিকার কি না তা গবেষণার প্রশ্ন। নিশিকান্তের সঙ্গে তাঁর নাম ও মূর্তির মিল কোনো পুরোনো সম্পর্কের ইঙ্গিত দেয় কি না সেটিও এখনো নিশ্চিত নয়।
কিন্তু এসব প্রশ্নের উত্তর না মিললেও নিশকাইন্দার সাংস্কৃতিক গুরুত্ব কমে না। কারণ তিনি আজও দাঁড়িয়ে আছেন একটি পাকুড়গাছের ছায়ায়, খোলা আকাশের নিচে, নবাবগঞ্জের মানুষের স্মৃতি আর বিশ্বাসের মাঝখানে। চৈত্রসংক্রান্তি এলে হয়তো আবার সেখানে মেলা বসবে। সন্ধ্যায় আবার জ্বলবে মোমবাতি। কেউ বাতাসা ভোগ দেবেন, কেউ দূর থেকে এসে কৌতূহলী চোখে তাকাবেন মাটির সেই বিশাল অবয়বটির দিকে। আর তখন মনে হবে বাংলার লোকসংস্কৃতির অনেক গল্পই হয়তো বইয়ের পাতায় লেখা নেই। তারা বেঁচে আছে কোনো গাছের নিচে, কোনো মাটির ঢিবিতে, কোনো পুরোনো মেলায় কিংবা মানুষের মুখে মুখে। নিশকাইন্দা তেমনই এক জীবন্ত লোকঐতিহ্য যার ভেতরে ধর্ম, লোকবিশ্বাস, ভয়, স্মৃতি ও বাংলার গ্রামীণ সংস্কৃতি এক অদ্ভুত সুতায় গাঁথা।

