কিছু গান শুধু কানে বাজে না, বুকের ভেতর একটা জায়গা দখল করে নেয়, আর সেখানেই স্থায়ীভাবে থেকে যায়। জন ডেনভারের "টেক মি হোম, কান্ট্রি রোডস" তেমনই একটি গান। ১৯৭১ সালে মুক্তি পাওয়া এই গান পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় ধরে পৃথিবীর নানা প্রান্তে মানুষকে কাঁদিয়েছে, হাসিয়েছে, আর সবচেয়ে বেশি করে মনে করিয়ে দিয়েছে "বাড়ি ফেরা" নামের এক চিরন্তন, সর্বজনীন অনুভূতির কথা। মজার ব্যাপার হলো, এই গান যাঁরা লিখেছিলেন, তাঁদের একজন কখনও ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ায় পা-ই রাখেননি, তবু গানটা এমনভাবে লেখা হলো যে কালক্রমে সেটাই হয়ে উঠল গোটা একটা রাজ্যের প্রাণের সুর, এমনকি তার সরকারি সংগীত পর্যন্ত।
একটা প্রায় বাতিল হয়ে যাওয়া গান কীভাবে রাতারাতি একজন অখ্যাত লোকশিল্পীকে বিশ্বতারকা বানিয়ে দিল, কীভাবে একটা সামান্য ভৌগোলিক ভুলও মানুষের ভালোবাসায় স্থায়ী সত্যি হয়ে উঠল, আর কীভাবে যুদ্ধবিধ্বস্ত শহরের রাস্তা থেকে শুরু করে ভিডিও গেমের জগৎ পর্যন্ত এই গান আজও সমানভাবে বেঁচে আছে আজকের লেখায় আমরা সেই পুরো গল্পটাই খুঁজে দেখব, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত। গানের স্রষ্টাদের ব্যক্তিগত জীবনের ছোট ছোট মুহূর্ত, রেকর্ডিং-এর নেপথ্যের কাহিনি, আর দশকের পর দশক ধরে এই সুরের বেঁচে থাকার রহস্য সবকিছু নিয়েই আজকের এই আয়োজন। চলুন, ফিরে যাই সেই সময়টায়, যখন একটা সাধারণ, নিরহংকার গান জন্ম নিয়েছিল বাড়ি ফেরার এক গভীর আকুতি থেকে।
যে গান লেখা হয়েছিল না-দেখা এক জায়গা নিয়ে
মজার ব্যাপার হলো, এই গান যিনি লিখেছিলেন, বিল ড্যানফ, তিনি নিজে কখনও ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ায় পা রাখেননি! তিনি ম্যাসাচুসেটসে বড় হয়েছিলেন, আর ছোটবেলায় রেডিওতে হুইলিং শহরের একটা স্টেশন থেকে "হিলবিলি মিউজিক" শুনতেন। সেই দূরের, অচেনা জায়গাটা তার কাছে ছিল প্রায় রূপকথার মতো এতটাই দূরের যে তার মনে হতো ইউরোপের মতোই অজানা কিছু। ঠিক এই দূরত্ব আর কৌতূহল থেকেই জন্ম নেয় গানটার কথা।
গানটা লেখা হয়েছিল বিল ড্যানফ ও তার তৎকালীন স্ত্রী টাফি নিভার্টের হাতে, ১৯৭০ সালের শেষদিকে। ওয়াশিংটন ডিসি-র জর্জটাউন এলাকার এক ছোট্ট কফিহাউস "সেলার ডোর"-এ প্রথমবার এই গান মানুষের সামনে গাওয়া হয়। সেই সময় ড্যানফ-নিভার্ট জুটির গানটাকে হিট বলেই মনে হয়েছিল কথাগুলো সুন্দর, সুরটা কানে লেগে থাকার মতো, গাইতে ভালো লাগে। কিন্তু আসল গল্প তখনও বাকি ছিল।
জন ডেনভারের হাতে পড়ার গল্প
গানটা প্রথমে জনি ক্যাশকে দেওয়ার কথা ভাবা হয়েছিল। কিন্তু ভাগ্যক্রমে সেটা হয়নি। এক রাতে ওয়াশিংটনে নিজের অ্যাপার্টমেন্টে জন ডেনভার এলে ড্যানফ প্রথমে গানটা তাকে শোনাতে দ্বিধায় ছিলেন। কিন্তু একবার শোনার পরই ডেনভার বুঝে গিয়েছিলেন, এই গান তারই গাওয়া উচিত, আর সঙ্গে সঙ্গে সেটা রেকর্ড করার সিদ্ধান্ত নেন। তখন জন ডেনভার নিজেও খুব পরিচিত নাম ছিলেন না। এর আগে তিনি "মিচেল ট্রায়ো" নামের একটা লোক-সংগীত দলে গান করতেন, আর তার লেখা "লিভিং অন আ জেট প্লেন" গানটা পিটার, পল অ্যান্ড মেরির কণ্ঠে হিট হয়েছিল যদিও ডেনভার নিজে তখনও সেভাবে পরিচিতি পাননি। "কান্ট্রি রোডস" রেকর্ড হয় ১৯৭১ সালের জানুয়ারিতে নিউ ইয়র্ক সিটিতে, আর মুক্তি পায় সেই বছরের ১২ এপ্রিল, তার অ্যালবাম "পোয়েমস, প্রেয়ার্স অ্যান্ড প্রমিসেস"-এর সিঙ্গেল হিসেবে।
গানটা মুক্তির পরই বিলবোর্ড হট ১০০ চার্টে দুই নম্বরে উঠে আসে, আর সেখান থেকেই শুরু হয় জন ডেনভারের তারকা হয়ে ওঠার যাত্রা। এই একটা গানই তাকে রাতারাতি এক অখ্যাত লোকশিল্পী থেকে আন্তর্জাতিক তারকায় পরিণত করে দেয়।
গানের কথায় লুকানো ছোট্ট রহস্য
মজার একটা তথ্য হলো গানের কথায় "ব্লু রিজ মাউন্টেনস" আর "শেনানডোয়া নদী"-র যে বর্ণনা আছে, ভূগোলবিদরা বলেন সেগুলো আসলে ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার চেয়ে পশ্চিম ভার্জিনিয়ার (western Virginia) সঙ্গে বেশি মেলে। শেনানডোয়া নদীর মূল উৎস ভার্জিনিয়ায়, আর সেটা ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার একটা ছোট অংশ দিয়েই কেবল বয়ে যায়। তবে বিল ড্যানফ নিজে কখনও এলাকাটা দেখেননি, তাই হয়তো ভৌগোলিক নিখুঁততার চেয়ে গানের সুর আর ছন্দই তার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আর সেই "ভুল"টাই আজ ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার মানুষের কাছে সবচেয়ে প্রিয় সত্যি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গানে ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার নাম আসার পেছনেও একটা মজার কারণ আছে। ড্যানফের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন অভিনেতা ক্রিস সারানডন, যিনি ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার বেকলি শহরের মানুষ। এছাড়া, সেই সময়ের ছোট ছোট ক্লাবগুলোতে ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার একটা কমিউনের কিছু মানুষ নিয়মিত গান শুনতে আসতেন, তাদের কুকুর নিয়ে সামনের সারিতে বসতেন। এভাবেই আস্তে আস্তে ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া গানের ভেতর ঢুকে পড়ে।
কেন এই গান মানুষের এত কাছের
"কান্ট্রি রোডস"-এর জনপ্রিয়তার আসল রহস্য লুকিয়ে আছে এর সরল, সৎ আবেগে। এটা কোনো জটিল রূপক বা কঠিন কাব্যভাষায় লেখা গান নয় এটা সোজাসুজি বাড়ি ফেরার আকুতি, শিকড়ের প্রতি টান, আর সাধারণ গ্রামীণ জীবনের প্রতি এক গভীর মমতার কথা বলে। জন ডেনভার নিজেও তার গানে বারবার প্রকৃতি আর সহজ জীবনের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করেছেন "রকি মাউন্টেন হাই", "সানশাইন অন মাই শোল্ডারস"-এর মতো গানেও একই সুর।
যে কেউ, পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে বসে, নিজের গ্রাম, নিজের ছোটবেলার বাড়ি, নিজের শিকড়ের কথা ভেবে এই গানে নিজেকে খুঁজে পান। এই কারণেই গানটা শুধু আমেরিকায় নয়, সারা পৃথিবীতে জনপ্রিয় হয়েছে জানা যায় এটি এ পর্যন্ত ১৫০ বারেরও বেশি অন্য শিল্পীরা কভার করেছেন, আর অন্তত ১৯টি ভাষায় রেকর্ড করা হয়েছে।
এক গান, এক রাজ্যের পরিচয়
সবচেয়ে চমকপ্রদ ব্যাপার হলো, ২০১৪ সালে "টেক মি হোম, কান্ট্রি রোডস" আনুষ্ঠানিকভাবে ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যের সরকারি সংগীত হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এই উদ্যোগের নেতৃত্বে ছিলেন ড্রেমা ডেনভার নামের একজন নারী, যিনি বিখ্যাত টিভি চরিত্র "গিলিগ্যান"-এর অভিনেতা বব ডেনভারের স্ত্রী ছিলেন (কাকতালীয়ভাবে পদবি একই, কিন্তু জন ডেনভারের সঙ্গে কোনো পারিবারিক সম্পর্ক নেই)। ২০১৭ সালে ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার পর্যটন বিভাগ আনুষ্ঠানিকভাবে এই গানের ব্যবহারের অধিকার নিয়ে নেয়, কারণ ততদিনে গানটা রাজ্যের সঙ্গে প্রায় সমার্থক হয়ে গিয়েছিল। রাজ্যের পাহাড়ি সৌন্দর্য, সরল জীবনযাত্রা আর আপ্যায়নের যে পরিচয়, তার সবটাই যেন এই একটা গানে ধরা পড়ে।
আজও যে গান বেঁচে আছে
এই গান শুধু ইতিহাসের পাতায় বন্দি হয়ে থাকেনি। ২০১৮ সালে জনপ্রিয় ভিডিও গেম "ফলআউট ৭৬"-এ এই গানের একটা নতুন সংস্করণ ব্যবহার করার পর নতুন প্রজন্মের কাছে গানটা আবার জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, এমনকি বিলবোর্ডের কান্ট্রি ডিজিটাল সং চার্টেও জায়গা করে নেয়। এছাড়া সুপার বোলের একটা বিজ্ঞাপনের সময় পুরো স্টেডিয়াম ভর্তি দর্শক হঠাৎ একসঙ্গে এই গান গেয়ে ওঠার দৃশ্য অনেকের নজর কাড়ে।
২০২৩ সালে যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভেও এই গান গাওয়া হয়েছিল মার্কিন সিনেটর জো ম্যানচিন আর কান্ট্রি সংগীতশিল্পী ব্র্যাড পেইজলি সেখানে গিয়ে এই গান গেয়ে শুনিয়েছিলেন, যেন যুদ্ধের মাঝেও "বাড়ি"-র ধারণাটা এক লহমার জন্য হলেও কাছে টেনে আনা যায়। এই ঘটনাই বোঝায়, এই গান কতটা সর্বজনীন হয়ে উঠেছে এটা আর শুধু আমেরিকার নয়, এটা এখন গোটা পৃথিবীর "বাড়ি ফেরার" গান।
শেষ কথা
জন ডেনভার নিজে কখনও কল্পনাও করেননি যে অন্যের লেখা একটা গান তাকে এভাবে অমর করে দেবে। কিন্তু "টেক মি হোম, কান্ট্রি রোডস" প্রমাণ করে দেয়, সবচেয়ে সহজ, সবচেয়ে সৎ অনুভূতিগুলোই আসলে সবচেয়ে বেশি মানুষের হৃদয় ছুঁতে পারে। বাড়ি, শিকড়, ফেলে আসা জায়গার জন্য মন কেমন করা — এই অনুভূতির কোনো ভাষা বা সীমানা নেই। আর হয়তো ঠিক এই কারণেই, পাহাড়ের কোলে হোক বা বাংলার কোনো নদীর তীরে, এই গানের সুর শুনলে আজও মন হঠাৎ বাড়ির পথ খুঁজে ফেরে।
সংক্ষিপ্ত তথ্যকণিকা (FAQ)
প্রশ্ন ১: Take Me Home, Country Roads গানটির গায়ক কে?
উত্তর: গানটি গেয়েছিলেন জন ডেনভার, এবং তাঁর কণ্ঠেই এটি বিশ্বজুড়ে খ্যাতি পায়। তবে এটি লিখেছিলেন বিল ড্যানফ, টাফি নিভার্ট ও জন ডেনভার একসঙ্গে।
প্রশ্ন ২: Take Me Home, Country Roads গানটি কে লিখেছিলেন?
উত্তর: বিল ড্যানফ, টাফি নিভার্ট এবং জন ডেনভার একসঙ্গে গানটি লেখেন, ১৯৭০ সালের শেষদিকে।
প্রশ্ন ৩: Take Me Home, Country Roads গানটি কবে মুক্তি পায়?
উত্তর: ১৯৭১ সালের ১২ এপ্রিল, "পোয়েমস, প্রেয়ার্স অ্যান্ড প্রমিসেস" অ্যালবামের সিঙ্গেল হিসেবে।
প্রশ্ন ৪: Take Me Home, Country Roadsগানটি কি সত্যিই ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া নিয়ে লেখা?
উত্তর: আংশিকভাবে। এর ভৌগোলিক বর্ণনা আসলে পশ্চিম ভার্জিনিয়ার সঙ্গে বেশি মেলে, তবে গানটি ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার সঙ্গে এতটাই মিশে গেছে যে ২০১৪ সালে এটি রাজ্যের সরকারি সংগীত হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
প্রশ্ন ৪: Take Me Home, Country Roads গানটি কতবার অন্যরা গেয়েছেন?
উত্তর: জানা যায়, বিশ্বজুড়ে ১৫০ বারেরও বেশি শিল্পী এই গান কভার করেছেন এবং অন্তত ১৯টি ভাষায় এটি রেকর্ড হয়েছে।
আরও পড়ুন:
- Hotel California: Eagles-এর কালজয়ী গান
- নভেম্বর রেইন: এক গান এক ইতিহাস, জীবন
- আইয়ুব বাচ্চু : রূপালি গিটারের এক মিথের নাম
- ব্যান্ড মাইলস (Miles): শুরুর পাঁচটি অ্যালবাম
- ওয়ারফেজ: আমাদের কৈশোরের নস্টালজিয়া
- আর্টসেল (Artcell) ব্যান্ডের সম্পূর্ণ ডিস্কোগ্রাফি
- আর্ক (Ark) ব্যান্ডের সম্পূর্ণ ডিস্কোগ্রাফি: ইতিহাস


