২০১৪ সাল যদি হয় বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার ফুটবলের "জন্মলগ্নের রূপকথা", তবে ২০২৬ সাল হলো তাদের পরিপক্কতা ও নতুন ইতিহাস গড়ার মিশন
ফুটবল শুধু ৯০ মিনিটের একটি খেলা নয়; অনেক সময় এটি একটি জাতির ইতিহাস, আত্মপরিচয়, আশা এবং পুনর্জাগরণের প্রতীক। ইউরোপের বলকান অঞ্চলের ছোট্ট দেশ বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার গল্পও ঠিক তেমনই। নব্বইয়ের দশকের ভয়াবহ বসনিয়া যুদ্ধ, জাতিগত সংঘাত এবং অসংখ্য মানুষের প্রাণহানির ক্ষত বয়ে চলা এই দেশটি ধীরে ধীরে নিজেদের নতুন করে গড়ে তুলেছে। সেই পুনর্গঠনের অন্যতম শক্তিশালী প্রতীক হয়ে উঠেছে দেশটির জাতীয় ফুটবল দল, যাদের সমর্থকেরা ভালোবেসে ডাকেন ‘ড্রাগনস’ (Zmajevi) নামে। মাঠে প্রতিটি ম্যাচ তাই তাদের কাছে শুধু জয়-পরাজয়ের হিসাব নয়, বরং একটি জাতির সাহস, ঐক্য এবং আত্মবিশ্বাসের প্রতিফলন।
২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো অংশগ্রহণ করে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা বিশ্ব ফুটবলের নজর কেড়েছিল। যদিও সেই আসরে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হয়, তবুও সেটিই ছিল দেশটির ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবময় সূচনা। এরপর দীর্ঘ অপেক্ষা, ব্যর্থতা এবং নতুন করে দল গঠনের কঠিন পথ পেরিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপে আবারও বিশ্বমঞ্চে ফিরে আসে তারা। এবার শুধু অংশগ্রহণেই সীমাবদ্ধ থাকেনি ‘ড্রাগনস’; দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে গ্রুপ পর্ব অতিক্রম করে নিশ্চিত করেছে বিশ্বকাপের দ্বিতীয় রাউন্ড (Round of 32), যা বসনিয়ান ফুটবলের ইতিহাসে আরেকটি স্মরণীয় মাইলফলক।
দীর্ঘ এক যুগ পর উত্তর আমেরিকার মাটিতে নকআউট পর্বে ওঠা এবং স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে লড়াইয়ের সুযোগ পাওয়া বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার জন্য নিঃসন্দেহে এক ঐতিহাসিক অর্জন। আজকের এই লেখায় আমরা জানব অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা এই দেশের সংক্ষিপ্ত পরিচয়, তাদের জাতীয় ফুটবল দলের উত্থান-পতনের গল্প, ২০১৪ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত বিশ্বকাপ যাত্রার গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে সেই বহুল প্রতীক্ষিত নকআউট লড়াইয়ের প্রেক্ষাপট।
দেশের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি: ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ভূপ্রকৃতি
বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের বলকান উপদ্বীপে অবস্থিত একটি অনন্য রাষ্ট্র। এর উত্তরে, পশ্চিমে ও দক্ষিণে রয়েছে ক্রোয়েশিয়া, পূর্বে সার্বিয়া এবং দক্ষিণ-पूर्वी কোণে মন্টিনিগ্রো। দেশটির একটি খুব ছোট (মাত্র ২০ কিলোমিটার) উপকূলরেখা রয়েছে যা অ্যাড্রিয়াটিক সাগরের সাথে যুক্ত। দেশটির নাম মূলত দুটি অঞ্চলের সংমিশ্রণ। উত্তরের বড় অংশটিকে বলা হয় ‘বসনিয়া’। যা মূলত ঘন জঙ্গল, পাহাড় ও সুন্দর নদী দিয়ে ঘেরা। আর দক্ষিণের ছোট অংশটি হলো ‘হার্জেগোভিনা’। যা কিছুটা শুষ্ক এবং ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ুর ছোঁয়াযুক্ত। দেশটির রাজধানী এবং বৃহত্তম শহর হলো সারায়েভো (Sarajevo)। পাহাড় বেষ্টিত এই শহরটিকে তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও বহুসাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কারণে প্রায়শই "ইউরোপের জেরুজালেম" বলা হয়।
- বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার আধুনিক ইতিহাস বেশ জটিল ও বেদনাদায়ক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এটি সমাজতান্ত্রিক যুগোস্লাভিয়ার অংশ ছিল। কিন্তু ১৯৯২ সালে যুগোস্লাভিয়া ভেঙে যাওয়ার সময় বসনিয়া স্বাধীনতা ঘোষণা করলে সেখানে এক ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। ১৯৯২ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত চলা এই যুদ্ধে প্রায় এক লক্ষ মানুষ প্রাণ হারায় এবং লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়। অবশেষে ১৯৯৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ‘ডেটন চুক্তি’ (Dayton Agreement)-র মাধ্যমে এই যুদ্ধের অবসান ঘটে এবং আজকের স্বাধীন ও সার্বভৌম বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা রাষ্ট্রটি পূর্ণতা পায়।
- এই দেশে মূলত তিনটি প্রধান জাতিগোষ্ঠী বসবাস করে: বসনিয়াক (যারা প্রধানত মুসলিম), সার্ব (যারা অর্থোডক্স খ্রিস্টান) এবং ক্রোট (যারা ক্যাথলিক খ্রিস্টান)। এই তিন সংস্কৃতির মেলবন্ধনে দেশটির স্থাপত্য, খাবার ও জীবনযাত্রায় এক দারুণ বৈচিত্র্য দেখা যায়। পূর্ব ও পশ্চিমের এই সংমিশ্রণই দেশটিকে ইউরোপের অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে আলাদা করে তুলেছে।
ফুটবল বিশ্বকাপ ইতিহাস: ২০১৪ রূপকথার শুরু
একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের মানুষের জন্য ফুটবল ছিল এক হওয়ার এবং আনন্দ পাওয়ার অন্যতম বড় মাধ্যম। ১৯৯৫ সালে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ১৯৯৬ সালে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন ফিফা (FIFA) এবং উয়েফা (UEFA)-র পূর্ণ সদস্যপদ লাভ করে। এরপর থেকে প্রতিটি বড় টুর্নামেন্টের বাছাইপর্বে তারা লড়াকু পারফরম্যান্স দেখায়, কিন্তু অল্পের জন্য মূল পর্বে জায়গা পাচ্ছিল না। বিশেষ করে ২০১০ বিশ্বকাপ এবং ২০১২ ইউরোর প্লে-অফে পর্তুগালের কাছে হেরে তাদের স্বপ্নভঙ্গ হয়। কিন্তু তাদের অপেক্ষার অবসান ঘটে ২০১৪ সালে।
- ব্রাজিলের টিকিট এবং দেশজুড়ে উৎসব
২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে বসনিয়া এক অবিশ্বাস্য ফুটবল খেলে। গ্রিস, স্লোভাকিয়ার মতো দলকে পেছনে ফেলে তারা গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে সরাসরি বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে। ২০১৩ সালের অক্টোবর মাসে যখন লিতুয়ানিয়াকে ১-০ গোলে হারিয়ে তাদের বিশ্বকাপ নিশ্চিত হয়। তখন সারায়েভোর রাস্তায় লাখো মানুষ নেমে আসে। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে পুরো দেশ যেন এক হয়ে মেতে উঠেছিল জয়ের উল্লাসে। ১৯৯0-এর দশকের যুদ্ধের পর এটাই ছিল দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আনন্দের উপলক্ষ।
গ্রুপ পর্বের লড়াই: প্রথম গোল ও প্রথম জয়
- ২০১৪ বিশ্বকাপে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা ছিল একমাত্র দল, যারা প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ খেলছিল। তারা গ্রুপ ‘F’-এ শক্তিশালী আর্জেন্টিনা, নাইজেরিয়া এবং ইরানের মুখোমুখি হয়।
- বনাম আর্জেন্টিনা (ঐতিহাসিক মারাকানা স্টেডিয়াম): বিশ্বকাপের ইতিহাসে নিজেদের প্রথম ম্যাচেই তারা মুখোমুখি হয় লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনার। ম্যাচের ৩ মিনিটের মাথায় একটি আত্মঘাতী গোল এবং দ্বিতীয়ার্ধে মেসির জাদুকরী গোলের কারণে বসনিয়া ২-১ ব্যবধানে হেরে যায়। তবে ম্যাচের ৮৪ মিনিটে দেশের ফুটবল ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপ গোলটি করেন তারকা স্ট্রাইকার বেদাদ ইবিসেভিচ (Vedad Ibišević)। হারলেও বিশ্ববাসীর মন জয় করে নেয় তারা।
- বনাম নাইজেরিয়া (বিতর্কিত পরাজয়): দ্বিতীয় ম্যাচে নাইজেরিয়ার কাছে ১-০ গোলে হেরে যায় বসনিয়া। তবে এই ম্যাচটি ছিল চরম বিতর্কিত। বসনিয়ার অধিনায়ক এডিন জেকোর একটি বৈধ গোল অফসাইডের অজুহাতে বাতিল করে দেন রেফারি, যা পরবর্তীতে ভুল প্রমাণিত হয়। এই হারের ফলে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিশ্চিত হয়ে যায় ড্রাগনদের।
- বনাম ইরান (প্রথম বিশ্বকাপ জয়): বিদায় নিশ্চিত হয়ে গেলেও শেষ ম্যাচে নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দেয় বসনিয়া। ইরানকে ৩-১ গোলে উড়িয়ে দিয়ে বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ঐতিহাসিক জয় তুলে নেয় তারা। দলের হয়ে গোল করেন এডিন জেকো, মিরালেম পিয়ানিচ ও আভদিয়া ভ্রাসায়েভিচ।
গ্রুপ পর্বে ৩ পয়েন্ট নিয়ে তৃতীয় হয়ে তারা বিশ্বকাপ মিশন শেষ করে। নকআউট পর্বে যেতে না পারলেও ডেব্যুটান্ট বা নবাগত দল হিসেবে তাদের লড়াকু মানসিকতা ফুটবল বিশ্বে দারুণ প্রশংসিত হয়েছিল।
২০২৬ বিশ্বকাপে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা: এক যুগ পর বিশ্বমঞ্চে
ফুটবল বিশ্বে কিছু প্রত্যাবর্তন কেবল একটি দলের টুর্নামেন্টে ফিরে আসা নয় বরং তা একটি পুরো জাতির আবেগ, অধ্যাবসায় এবং নতুন করে স্বপ্ন দেখার গল্প। ইউরোপের বলকান অঞ্চলের লড়াকু দেশ বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা (Bosnia and Herzegovina)। ২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো খেলতে এসে ফুটবল বিশ্বের নজর কেড়েছিল এই ‘ড্রাগনস’ (Zmajevi) খ্যাত দলটি।
এরপর কেটে গেছে দীর্ঘ ১২টি বছর। উয়েফা ও ফিফার নানা সমীকরণ, প্রজন্মবদল আর বাছাইপর্বের কঠিন বৈতরণী পার হয়ে ২০২৬ সালের উত্তর আমেরিকার (ইউএসএ, মেক্সিকো ও কানাডা) মেগা বিশ্বকাপে দলটির অংশগ্রহণ বলকান ফুটবলে এক নতুন সোনালী অধ্যায়ের সূচনা করেছে।
- বাছাইপর্বের অগ্নিপরীক্ষা ও বিশ্বমঞ্চের টিকিট
২০২৬ সালের বর্ধিত বিশ্বকাপে ইউরোপ মহাদেশের জন্য কোটা বাড়লেও মূল পর্বে জায়গা করে নেওয়া মোটেও সহজ ছিল না। বসনিয়াকে গ্রুপ পর্বে এবং পরবর্তী নকআউট সমীকরণে প্রতি পদে পদে স্নায়ুচাপের পরীক্ষা দিতে হয়েছে। বাছাইপর্বের শুরু থেকেই দলটি তাদের চেনা লড়াকু মানসিকতা প্রদর্শন করে। গ্রুপ পর্বের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে জয়।
শেষদিকের ডু-অর-ডাই (Do-or-die) ম্যাচগুলোতে তরুণ ফুটবলারদের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের ওপর ভর করে তারা উত্তর আমেরিকার টিকিট নিশ্চিত করে। এক যুগ পর যখন দলটির বিশ্বকাপ নিশ্চিত হয়, তখন রাজধানী সারায়েভোর রাস্তায় আবারও নেমে আসে উৎসবের ঢল। ভক্তদের মনে এটি ২০১৪ সালের সেই ঐতিহাসিক লিথুয়ানিয়া ম্যাচের স্মৃতিকে যেন নতুন করে ফিরিয়ে আনে।
- দলীয় রসায়ন: অভিজ্ঞ মেন্টর ও তরুণ রক্তের মেলবন্ধন
২০২৬ বিশ্বকাপের বসনিয়া দলটির সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো এর ভারসাম্য। দলটিতে যেমন রয়েছে অভিজ্ঞতার গভীরতা, তেমনি আছে তরুণদের গতি ও ক্ষুধা। এডিন জেকোর শেষ নাচ (The Last Dance): বসনিয়ান ফুটবলের সর্বকালের সেরা মহাতারকা এবং "বসনিয়ান ডায়মন্ড" খ্যাত এডিন জেকো (Edin Džeko) ক্যারিয়ারের শেষপ্রান্তে দাঁড়িয়েও এই দলের প্রধান চালিকাশক্তি ও অধিনায়ক। মাঠের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি তরুণদের গাইড করার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা অনন্য।
- নতুন প্রজন্মের উত্থান
এই বিশ্বকাপে বসনিয়া মূলত একঝাঁক নতুন প্রতিভার কাঁধে ভর করে মাঠে নামছে। ২৪-২৫ বছর বয়সী একঝাঁক তরুণ তুর্কি, যারা ইউরোপের শীর্ষ লিগগুলোতে খেলছেন, তারা এখন দলের মূল স্তম্ভ। জেকোর মতো অভিজ্ঞদের মেন্টরশিপে এই নতুন প্রজন্ম বিশ্বমঞ্চে যেকোনো পরাশক্তিকে চ্যালেঞ্জ জানাতে প্রস্তুত।
এক যুগ আগে ২০১৪ সালে যখন বসনিয়া প্রথম বিশ্বকাপে খেলেছিল, তখন তাদের মাঝে ছিল নবাগত এক আবেগ। সেবার লক্ষ্য ছিল কেবল বিশ্বমঞ্চে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেওয়া, একটি গোল করা কিংবা একটি জয় পাওয়া (যা তারা ইরানের বিপক্ষে পেয়েছিল)।
বসনিয়ার ঐতিহাসিক সাফল্য: ২য় রাউন্ডে স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রের মুখোমুখি
২০২৬ সালের বিশ্বকাপ যেন বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার জন্য রূপকথাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার মঞ্চ! দীর্ঘ ১২ বছরের প্রতীক্ষা শেষে বিশ্বকাপে ফিরে এসেই দলটি প্রমাণ করেছে কেন তাদের "ড্রাগনস" বলা হয়। গ্রুপ পর্বের অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ লড়াই শেষে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা তাদের দ্বিতীয় রাউন্ড নিশ্চিত করেছে।
সবচেয়ে বড় রোমাঞ্চের জায়গাটি হলো, নকআউট পর্বের এই গুরুত্বপূর্ণ লড়াইয়ে তাদের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে বিশ্বকাপের অন্যতম স্বাগতিক দেশ যুক্তরাষ্ট্র। মাঠভরা হাজার হাজার দর্শকের সামনে, স্বাগতিকদের বিপক্ষে ২য় রাউন্ডের এই ম্যাচটি কেবল একটি ফুটবল ম্যাচ নয়, এটি বসনিয়ার ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা অগ্নিপরীক্ষা।
২০১৪ সালের সেই অপূর্ণ স্বপ্নকে পেছনে ফেলে, এখন পুরো বসনিয়া জাতি তাকিয়ে আছে তাদের প্রিয় তারকা এডিন জেকো এবং বর্তমান প্রজন্মের তরুণ তুর্কিদের দিকে ইতিহাস গড়ার নেশায় তারা কি পারবে স্বাগতিকদের হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে পা রাখতে?
বসনিয়ান ফুটবলের মহাতারকারা
বসনিয়ার ফুটবল ইতিহাসের কথা বলতে গেলে এমন কিছু খেলোয়াড়ের নাম চলে আসে, যারা বিশ্বফুটবলে নিজেদের কিংবদন্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন:
- এডিন জেকো (Edin Džeko): বসনিয়ান ফুটবলের সর্বকালের সেরা তারকা এবং গোলদাতা। ম্যানচেস্টার সিটি, এএস রোমা এবং ইন্টার মিলানের মতো ক্লাবে খেলা এই স্ট্রাইকারকে বলা হয় "বসনিয়ান ডায়মন্ড"। যুদ্ধের বাজারে বেড়ে ওঠা জেকো আজ পুরো দেশের রোল মডেল, যিনি ২০১৪ ও ২০২৬—দুই প্রজন্মের সেতু।
- মিরালেম পিয়ানিচ (Miralem Pjanić): মাঝমাঠের কারিগর বা মিডফিল্ড মায়েস্ট্রো। জুভেন্টাস, বার্সেলোনা এবং রোমার হয়ে খেলা পিয়ানিচ তার নিখুঁত ফ্রি-কিক এবং পাসিংয়ের জন্য বিশ্বখ্যাত।
- আসমির বেগোভিৎচ (Asmir Begović): ২০১৪ বিশ্বকাপে চেলসি ও স্টোক সিটির এই গোলরক্ষক বসনিয়ার পোস্টের নিচে দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন।
ড্রাগনদের গর্জন ও নতুন স্বপ্নযাত্রা
বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার ফুটবল ইতিহাস আমাদের শেখায় কীভাবে প্রতিকূলতাকে জয় করে ছাই থেকে ফিনিক্স পাখির মতো জেগে উঠতে হয়। যে দেশের স্টেডিয়ামগুলো একসময় যুদ্ধের সময় সামরিক ক্যাম্প বা কবরস্থান হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল।
সেই দেশের ছেলেরাই আজ বিশ্বমঞ্চে নিজেদের জাতীয় সঙ্গীত গেয়ে বিশ্বকে স্তব্ধ করে দিচ্ছে। ফুটবল এখানে শুধু ৯০ মিনিটের খেলা নয়; এটি ছিল জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে পুরো জাতিকে এক সুতোয় বাঁধার এক অমোঘ শক্তি। ড্রাগনরা কি পারবে স্বাগতিকদের হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালের মঞ্চে নিজেদের নাম লেখাতে?
সেই উত্তরের অপেক্ষায় এখন সারা বিশ্ব। এক যুগ আগের সেই সোনালী দিনগুলোর অনুপ্রেরণাকে বুকে করেই উত্তর আমেরিকার মাঠে নতুন এক মহাকাব্য লিখতে প্রস্তুত বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা। আমাদের শুভকামনা।
