ফুটবল বিশ্বকাপ শুধু একটি প্রতিযোগিতা নয়, এটি বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের আবেগ, স্বপ্ন ও ভালোবাসার সবচেয়ে বড় মঞ্চ। চার বছর পরপর অনুষ্ঠিত এই মহাযজ্ঞে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য বিশ্বের সেরা ফুটবলাররা একত্রিত হন। এখানে একটি গোলও হয়ে উঠতে পারে ইতিহাসের অংশ, আর বিশ্বকাপের মঞ্চে ধারাবাহিকভাবে গোল করে যাওয়া মানে নিজেকে ফুটবল ইতিহাসের পাতায় চিরস্থায়ী করে তোলা। বিশ্বকাপে গোল করা অন্য যেকোনো টুর্নামেন্টের চেয়ে কঠিন। কারণ এখানে খেলোয়াড়দের মুখোমুখি হতে হয় বিশ্বের সেরা দল, সেরা ডিফেন্ডার এবং সবচেয়ে বড় চাপের।
একটি ভুল মানেই বিদায়, আর একটি মুহূর্তের জাদু মানেই কোটি মানুষের স্মৃতিতে জায়গা করে নেওয়া। তাই বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে দুই অঙ্কের গোলের মাইলফলক স্পর্শ করা যেকোনো ফুটবলারের জন্য অসাধারণ এক অর্জন। প্রায় এক শতাব্দীর বিশ্বকাপ ইতিহাসে হাজার হাজার ফুটবলার অংশ নিয়েছেন। কিন্তু তাদের মধ্যে মাত্র ১৭ জন খেলোয়াড় নিজেদের নামের পাশে লিখতে পেরেছেন ১০ বা তার বেশি গোলের অনন্য রেকর্ড। এই তালিকায় জায়গা পাওয়া মানেই তারা শুধু সফল স্ট্রাইকার নন, বরং বিশ্ব ফুটবলের সর্বকালের সেরা গোলশিকারিদের একজন।
২০২৬ সালের উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপের মঞ্চ পর্যন্ত এসে এই অভিজাত তালিকায় যুক্ত হয়েছে আধুনিক ফুটবলের দুই মহাতারকা লিওনেল মেসি ও কিলিয়ান এমবাপের নাম। একদিকে মেসির দীর্ঘ ক্যারিয়ারের ধারাবাহিকতা, অন্যদিকে এমবাপের বিস্ফোরক গোল করার ক্ষমতা বিশ্বকাপের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় তৈরি করেছে। এই লেখায় আমরা জানব বিশ্বকাপে ১০ বা তার বেশি গোল করা সেই ১৭ জন কিংবদন্তি ফুটবলারের গল্প তাদের গোলসংখ্যা, বিশ্বকাপ যাত্রা, স্মরণীয় মুহূর্ত এবং কীভাবে তারা বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে নিজেদের নাম অমর করে রেখেছেন।
বিশ্বকাপে ১০ বা তার বেশি গোল করা ফুটবলারদের তালিকা
ফুটবল বিশ্বকাপ এমন একটি মঞ্চ, যেখানে একটি মাত্র গোলও একজন ফুটবলারের ক্যারিয়ার বদলে দিতে পারে। কিন্তু এমন কিছু কিংবদন্তি আছেন, যারা এক বা দুই নয়, ১০ বা তারও বেশি গোল করে বিশ্বকাপ ইতিহাসে নিজেদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখেছেন। ১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপ থেকে শুরু করে ২০২৬ বিশ্বকাপ পর্যন্ত মাত্র হাতে গোনা কয়েকজন ফুটবলারই এই অসাধারণ কীর্তি গড়তে পেরেছেন। আর ২০২৬ বিশ্বকাপের মাঝপথেই ইতিহাস নতুন করে লেখা হয়েছে। আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসি বিশ্বকাপে নিজের গোলসংখ্যা ১৯-এ উন্নীত করে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন। তিনি জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসের ১৬ গোলের রেকর্ড ভেঙে নতুন ইতিহাস গড়েছেন।
- লিওনেল মেসি (আর্জেন্টিনা) — ২১ গোল (২০০৬–২০২৬ চলমান)
- কিলিয়ান এমবাপ্পে (ফ্রান্স) — ২০ গোল (২০১৮–২০২৬ চলমান)
- মিরোস্লাভ ক্লোসে (জার্মানি) — ১৬ গোল (২০০২–২০১৪)
- রোনালদো নাজারিও (ব্রাজিল) — ১৫ গোল (১৯৯৪–২০০৬)
- গার্ড মুলার (পশ্চিম জার্মানি) — ১৪ গোল (১৯৭০–১৯৭৪)
- হ্যারি কেইন (ইংল্যান্ড) — ১৪ গোল (২০১৮–২০২৬)
- জাস্ট ফন্টেইন (ফ্রান্স) — ১৩ গোল (১৯৫৮)
- পেলে (ব্রাজিল) — ১২ গোল (১৯৫৮–১৯৭০)
- সান্দর কচিস (হাঙ্গেরি) — ১১ গোল (১৯৫৪)
- ইয়ুর্গেন ক্লিন্সমান (জার্মানি) — ১১ গোল (১৯৯০–১৯৯৮)
- ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো (পর্তুগাল) – ১১ (২০০৬- ২০২৬)
- হেলমুট রাহন (পশ্চিম জার্মানি) — ১০ গোল (১৯৫৪–১৯৫৮)
- গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা (আর্জেন্টিনা) — ১০ গোল (১৯৯৪–২০০২)
- গ্যারি লিনেকার (ইংল্যান্ড) — ১০ গোল (১৯৮৬–১৯৯০)
- তেওফিলো কুবিয়াস (পেরু) — ১০ গোল (১৯৭০–১৯৮২)
- থমাস মুলার (জার্মানি) — ১০ গোল (২০১০–২০২২)
- গ্রেজেগোর্জ লাতো (পোল্যান্ড) — ১০ গোল (১৯৭৪–১৯৮২)
লিওনেল মেসি – নতুন রেকর্ডের রাজা (১৯ গোল)
২০২৬ বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড ছিল মিরোস্লাভ ক্লোসের ১৬। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত ২০২৬ বিশ্বকাপে মেসি দুর্দান্ত ফর্মে ছিলেন। আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক, অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল এবং জর্ডানের বিপক্ষে ফ্রি-কিক থেকে গোল করে তিনি নিজের মোট গোলসংখ্যা ১৯-এ নিয়ে যান।
এই কীর্তির মাধ্যমে তিনি শুধু পুরুষদের নয়, বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবেও নিজের নাম প্রতিষ্ঠা করেন। একই সঙ্গে টানা সাতটি বিশ্বকাপ ম্যাচে গোল করার নজিরও গড়েন।
- বিশ্বকাপ: ২০০৬, ২০১০, ২০১৪, ২০১৮, ২০২২, ২০২৬
- ম্যাচ: ২৯+
- বিশেষ কীর্তি: ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে ৭টি গোল করে আর্জেন্টিনাকে ৩৬ বছর পর বিশ্বকাপ জেতান মেসি। তিনি বিশ্বকাপের ইতিহাসের একমাত্র খেলোয়াড় যিনি গ্রুপ পর্ব, শেষ ১৬, কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল এবং ফাইনাল—সব কটি ধাপে গোল করার রেকর্ড গড়েছেন। ২০২৬ বিশ্বকাপেও নিজের জাদুকরী উপস্থিতি ধরে রেখে তিনি এই তালিকায় নিজের অবস্থান আরও উঁচুতে নিয়ে গেছেন।
মিরোস্লাভ ক্লোসে – জার্মানির নির্ভরতার প্রতীক (১৬ গোল)
২০০২ থেকে ২০১৪ চারটি বিশ্বকাপে ক্লোসে ধারাবাহিকভাবে গোল করেছেন। ২০১৪ সালে ব্রাজিল বিশ্বকাপে তিনি রোনালদোর ১৫ গোলের রেকর্ড ভেঙে ১৬ গোল করেন। দীর্ঘদিন এই রেকর্ড অক্ষুণ্ন ছিল। যা এবারের ২০২৬ সালে মেসি ভেঙে এগিয়ে গিয়েছে। তিনি কোনো জাদুকরী ড্রিবলার ছিলেন না, কিন্তু পেনাল্টি বক্সের ভেতর তার পজিশনিং সেন্স ছিল মারাত্মক।
- বিশ্বকাপ: ২০০২, ২০০৬, ২০১০, ২০১৪
- ম্যাচ: ২৪
- বিশেষ কীর্তি: ক্লোসা অংশ নেওয়া প্রতিটি বিশ্বকাপেই অন্তত ৪টি করে গোল করেছেন। ২০১৪ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের মাটিতে ব্রাজিলেরই কিংবদন্তি রোনালদোর রেকর্ড ভেঙে তিনি এই কীর্তি গড়েন এবং সে বছর জার্মানির হয়ে বিশ্বকাপ ট্রফিও উঁচিয়ে ধরেন।
রোনালদো নাজারিও (ব্রাজিল) – ১৫ গোল
'দ্য ফেনোমেনন' নামে পরিচিত ব্রাজিলের রোনালদোকে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার মনে করা হয়। গতি, শক্তি এবং নিখুঁত ফিনিশিংয়ের এক অবিশ্বাস্য মিশ্রণ ছিলেন তিনি। ১৯৯৮ ও ২০০২ বিশ্বকাপজুড়ে রোনালদোর পারফরম্যান্স আজও কিংবদন্তি। বিশেষ করে ২০০২ সালের ফাইনালে জোড়া গোল করে ব্রাজিলকে শিরোপা জেতানো ছিল তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা মুহূর্ত। তিনি দীর্ঘদিন বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় শীর্ষে ছিলেন।
- বিশ্বকাপ: ১৯৯৪, ১৯৯৮, ২০০২, ২০০৬ (১৯৯৪ সালে স্কোয়াডে থাকলেও মাঠে নামেননি)
- ম্যাচ: ১৯
- বিশেষ কীর্তি: ২০০২ সালের বিশ্বকাপে একাই ৮ গোল করে ব্রাজিলকে পঞ্চম পঞ্চমবারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করেন। ফাইনালে জার্মানির অলিভার কানের বিপক্ষে তার জোড়া গোল ফুটবল ইতিহাস চিরকাল মনে রাখবে।
গের্ড মুলার (জার্মানি) – ১৪ গোল
জার্মানির 'ডার বোম্বার' বা গোলমেশিন বলা হতো গের্ড মুলারকে। গোললাইনের সামনে তার চেয়ে নিখুঁত শিকারি ফুটবল ইতিহাসে খুব কমই এসেছে। ১৯৭০ বিশ্বকাপে ১০ গোল এবং ১৯৭৪ সালে আরও চার গোল করেন। ১৯৭৪ সালের ফাইনালে তাঁর জয়সূচক গোল পশ্চিম জার্মানিকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করে। অসাধারণ পজিশনিং এবং বক্সের ভেতরে সুযোগ কাজে লাগানোর দক্ষতার জন্য তিনি আজও কিংবদন্তি।
- বিশ্বকাপ: ১৯৭০, ১৯৭৪
- ম্যাচ: ১৩
- বিশেষ কীর্তি: মাত্র দুটি বিশ্বকাপ খেলেই তিনি ১৪ গোল করেছিলেন। এর মধ্যে ১৯৭০ বিশ্বকাপেই করেছিলেন ১০ গোল! ১৯৭৪ সালের বিশ্বকাপের ফাইনালে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে তার জয়সূচক গোলটি জার্মানিকে চ্যাম্পিয়ন করেছিল।
কিলিয়ান এমবাপ্পে (ফ্রান্স) – ১৬ গোল (চলমান ২০২৬ বিশ্বকাপ পর্যন্ত)
মাত্র তিনটি বিশ্বকাপ খেলেই মিরোস্লাভ ক্লোসের পাশে নিজের নাম লিখিয়েছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। ২০১৮ সালে মাত্র ১৯ বছর বয়সে চার গোল করে ফ্রান্সকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হতে সাহায্য করেন। ২০২২ সালে আট গোল করে গোল্ডেন বুট জেতেন। এরপর ২০২৬ বিশ্বকাপেও গোলের ধারা অব্যাহত রেখে মোট ১৬ গোলে পৌঁছে যান। এমবাপ্পের গতি, ড্রিবলিং, ফিনিশিং এবং বড় ম্যাচে পারফর্ম করার ক্ষমতা তাঁকে ভবিষ্যতের সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার অন্যতম দাবিদার করে তুলেছে।
- বিশ্বকাপ: ২০২৮,২০২২,২০২৬(চলমান)
- বিশেষ কীর্তি: ২০১৮ বিশ্বকাপে ৪ গোল করে ফ্রান্সকে চ্যাম্পিয়ন করান। ২০২২ বিশ্বকাপে করেন সর্বোচ্চ ৮ গোল (গোল্ডেন বুট জয়ী), যার মধ্যে ফাইনাল ম্যাচেই ছিল একটি অবিশ্বাস্য হ্যাটট্রিক। স্যার জিওফ হার্স্টের পর তিনি দ্বিতীয় খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপ ফাইনালে হ্যাটট্রিক করার গৌরব অর্জন করেন। ২০২৬ বিশ্বকাপেও ফরাসি এই ফরোয়ার্ড নিজের গোলবন্যা বজায় রেখেছেন।
জাস্ট ফন্টেইন (ফ্রান্স) – ১৩ গোল
বিশ্বকাপের এক আসরে সবচেয়ে বেশি গোল করার রেকর্ড এখনও জাস্ট ফন্টেইনের দখলে। ১৯৫৮ সালের সুইডেন বিশ্বকাপে মাত্র ছয় ম্যাচে ১৩ গোল করেছিলেন তিনি। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, এরপর তিনি আর কখনও বিশ্বকাপে খেলেননি। তবুও তাঁর রেকর্ড আজও অটুট। একটি মাত্র বিশ্বকাপ খেলেই ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখে গেছেন ফ্রান্সের জাঁ ফন্টেইন।
- বিশ্বকাপ: ১৯৫৮
- ম্যাচ: ৬
- বিশেষ কীর্তি: ১৯৫৮ সালের সুইডেন বিশ্বকাপে মাত্র ৬ ম্যাচে তিনি ১৩টি গোল করেছিলেন, যা আজ পর্যন্ত একটি একক বিশ্বকাপে কোনো খেলোয়াড়ের করা সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড। আধুনিক ফুটবলে এই রেকর্ড ভাঙা প্রায় অসম্ভব বলে মনে করা হয়।
পেলে (ব্রাজিল) – ১২ গোল
ফুটবল সম্রাট পেলে শুধু গোল করেননি, বিশ্বকাপকে নিজের মঞ্চে পরিণত করেছিলেন। ১৯৫৮ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে বিশ্বকে চমকে দেন। এরপর ১৯৬২ এবং ১৯৭০ সালে ব্রাজিলকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করেন। ফুটবল সম্রাট পেলে। তিনি ফুটবল ইতিহাসের একমাত্র খেলোয়াড় যিনি তিনটি বিশ্বকাপ (১৯৫৮, ১৯৬২, ১৯৭০) জিতেছেন।
- বিশ্বকাপ: ১৯৫৮, ১৯৬২, ১৯৬৬, ১৯৭০
- ম্যাচ: ১৪
- বিশেষ কীর্তি: ১৯৫৮ বিশ্বকাপের ফাইনালে জোড়া গোল করেছিলেন পেলে। চোটের কারণে ১৯৬২ ও ১৯৬৬ বিশ্বকাপে পুরোটা খেলতে না পারলেও ১৯৭০ বিশ্বকাপে জাদুকরী ফুটবল খেলে ব্রাজিলকে চিরতরে জুলে রিমে ট্রফি এনে দেন। বিশ্বকাপে তাঁর মোট গোল ১২ হলেও তাঁর প্রভাব সংখ্যার চেয়েও অনেক বড়।
স্যান্ডর কচিস (হাঙ্গেরি) – ১১ গোল
১৯৫৪ সালের বিশ্বকাপে হাঙ্গেরির হয়ে ১১ গোল করেন স্যান্ডর কচিস। হেডে গোল করার অসাধারণ দক্ষতার জন্য তিনি বিখ্যাত ছিলেন। যদিও ফাইনালে পশ্চিম জার্মানির কাছে হেরে তাঁর বিশ্বকাপ জয় অধরাই থেকে যায়। হেড করার অসাধারণ ক্ষমতার জন্য তাকে 'গোল্ডেন হেড' বলা হতো।
- বিশ্বকাপ: ১৯৫৪
- ম্যাচ: ৫
- বিশেষ কীর্তি: জাঁ ফন্টেইনের মতো তিনিও মাত্র একটি বিশ্বকাপ খেলেই ১১টি গোল করেছিলেন, যার মধ্যে ছিল দুটি হ্যাটট্রিক।
ইয়ুর্গেন ক্লিন্সম্যান (জার্মানি) – ১১ গোল
জার্মানির ক্ল্যাসিক স্ট্রাইকারদের একজন ক্লিন্সম্যান। মাঠে তার ডাইভিং হেড এবং গোল উদযাপনের ভঙ্গি ছিল দারুণ জনপ্রিয়। তিনটি বিশ্বকাপে ১১ গোল করে তিনি জার্মান ফুটবলের ইতিহাসে অন্যতম সফল স্ট্রাইকার হিসেবে পরিচিতি পান।
- বিশ্বকাপ: ১৯৯০, ১৯৯৪, ১৯৯৮
- ম্যাচ: ১৭
- বিশেষ কীর্তি: ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপজয়ী পশ্চিম জার্মানি দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন তিনি। তিনটি ভিন্ন বিশ্বকাপে অন্তত ৩টি করে গোল করা প্রথম খেলোয়াড় তিনি।
হেলমুট রান (পশ্চিম জার্মানি) – ১০ গোল
জার্মান ফুটবলের শুরুর দিকের অন্যতম নায়ক হেলমুট রান। ১৯৫৪ সালের বিশ্বকাপে হাঙ্গেরির বিপক্ষে ফাইনালে তার করা গোলটি জার্মানির ফুটবল ইতিহাসে 'মিরাকল অব বার্ন' নামে পরিচিত। ১৯৫৪ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে তাঁর করা জয়সূচক গোল ফুটবল ইতিহাসে "বার্নের বিস্ময়" নামে পরিচিত। দুটি বিশ্বকাপে মোট ১০ গোল করে তিনি জার্মান ফুটবলের কিংবদন্তি হয়ে ওঠেন।
- বিশ্বকাপ: ১৯৫৪, ১৯৫৮
- ম্যাচ: ১০
- বিশেষ কীর্তি: দুই বিশ্বকাপে ১০ ম্যাচ খেলে ১০ গোল করেন, যার মধ্যে ১৯৫৪ সালের ফাইনালে জয়সূচক গোলসহ জোড়া গোল অন্তর্ভুক্ত।
গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা (আর্জেন্টিনা) – ১০ গোল
আর্জেন্টাইন ফুটবলের অন্যতম সেরা 'নাম্বার নাইন' গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা, যাকে ভক্তরা ভালোবেসে 'বাতিগোল' বলে ডাকতেন। বক্সের বাইরে থেকে বুলেট গতির শটের জন্য তিনি বিখ্যাত ছিলেন। ১৯৯৪, ১৯৯৮ ও ২০০২ বিশ্বকাপ মিলিয়ে তিনি ১০ গোল করেন। তাঁর শক্তিশালী শট এবং দুর্দান্ত ফিনিশিং আজও স্মরণীয়।
- বিশ্বকাপ: ১৯৯৪, ১৯৯৮, ২০০২
- ম্যাচ: ১২
- বিশেষ কীর্তি: ইতিহাসের একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে দুটি ভিন্ন বিশ্বকাপে (১৯৯৪ এবং ১৯৯৮) হ্যাটট্রিক করার অনন্য রেকর্ড রয়েছে বাতিস্তুতার।
গ্যারি লিনেকার (ইংল্যান্ড) – ১০ গোল
ইংল্যান্ডের ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সফল স্ট্রাইকার এবং বিশ্বকাপে দেশের সর্বোচ্চ গোলদাতা। ১৯৯০ বিশ্বকাপে আরও চার গোল করে মোট ১০ গোলের মাইলফলক স্পর্শ করেন। দীর্ঘদিন তিনি ইংল্যান্ডের সর্বোচ্চ বিশ্বকাপ গোলদাতা ছিলেন।
পেরুর ইতিহাসের সর্বকালের সেরা খেলোয়াড় কুবিলাস। লাতিন আমেরিকার অন্যতম সেরা এই মিডফিল্ডার ফ্রি-কিক এবং দূরপাল্লার শটে পারদর্শী ছিলেন। পেরুর ফুটবল ইতিহাসে তাঁর অবদান এতটাই বড় যে তাঁকে দেশটির সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়দের একজন হিসেবে ধরা হয়।
- বিশ্বকাপ ১৯৭০, ১৯৭৮, ১৯৮২
- ম্যাচ: ১৩
- বিশেষ কীর্তি: একজন অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হয়েও দুটি ভিন্ন বিশ্বকাপে (১৯৭০ ও ১৯৭৮) ৫টি করে গোল করার এক অবিশ্বাস্য কীর্তি গড়েন তিনি।
টমাস মুলার (জার্মানি) – ১০ গোল
আধুনিক ফুটবলের অন্যতম বুদ্ধিদীপ্ত ফুটবলার, যাকে বলা হয় 'রাউমডুটার' বা স্পেস ইন্টারপ্রেটার।২০১৪ বিশ্বকাপেও আরও পাঁচ গোল করে মোট ১০ গোল পূর্ণ করেন। বড় ম্যাচে তাঁর অসাধারণ উপস্থিতি জার্মানির সাফল্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
- বিশ্বকাপ: ২০১০, ২০১৪, ২০১৮, ২০২২
- ম্যাচ: ১৯
- বিশেষ কীর্তি: ২০১০ বিশ্বকাপে মাত্র ২০ বছর বয়সে ৫ গোল করে গোল্ডেন বুট এবং সেরা তরুণ খেলোয়াড়ের পুরস্কার জেতেন। ২০১৪ বিশ্বকাপেও ৫ গোল করে জার্মানিকে চ্যাম্পিয়ন করতে বড় ভূমিকা রাখেন।
গ্রজেগোর্জ লাটো (পোল্যান্ড) – ১০ গোল
পোল্যান্ড ফুটবলের সোনালী প্রজন্মের প্রতিনিধি গ্রজেগোর্জ লাটো ছিলেন একজন দুর্দান্ত উইঙ্গার। তার গতি এবং ড্রিবলিং প্রতিপক্ষ রক্ষণভাগকে তছনছ করে দিত।
- বিশ্বকাপ: ১৯৭৪, ১৯৭৮, ১৯৮২
- ম্যাচ: ২০
- বিশেষ কীর্তি: ১৯৭৪ বিশ্বকাপে ৭ গোল করে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা (গোল্ডেন বুট) হন এবং পোল্যান্ডকে তৃতীয় স্থান এনে দেন।
ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো (পর্তুগাল) – ১১ গোল
একটি সাধারণ ভুল ধারণা রয়েছে যে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো বিশ্বকাপে ১০টি গোল করেছেন, তবে এটি আসলে তার সামগ্রিক আন্তর্জাতিক রেকর্ডের কারণে মনে হতে পারে। বিশ্বকাপে তার আসল গোলসংখ্যা ৮টি।
- বিশ্বকাপ: ২০০৬, ২০১০, ২০১৪, ২০১৮, ২০২২ এবং ২০২৬
- রেকর্ড ও বিশেষ কীর্তি: তিনি ফুটবল ইতিহাসের একমাত্র পুরুষ খেলোয়াড় যিনি ৫টি ভিন্ন ভিন্ন বিশ্বকাপে (২০০৬ থেকে ২০২২) গোল করার অনন্য নজির গড়েছেন। এর মধ্যে ২০১৮ সালের বিশ্বকাপে স্পেনের বিপক্ষে তার করা জাদুকরী হ্যাটট্রিকটি বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা পারফরম্যান্স হিসেবে গণ্য করা হয়। তবে নক-আউট পর্বে কোনো গোল না থাকা এবং মোট গোলসংখ্যা ৮ হওয়ায় তিনি এখনো এই ১০ গোলের অভিজাত ক্লাবে পৌঁছাতে পারেননি।
হ্যারী কেইন (ইংল্যান্ড) –১৪ গোল (২০২৬ বিশ্বকাপ চলমান)
ইংল্যান্ডের বর্তমান প্রজন্মের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার হ্যারী কেইনেরও বিশ্বকাপে বর্তমান গোলসংখ্যা ১১টি। ২০২৬ সালের চলমান বিশ্বকাপে তিনি ইংল্যান্ড দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং এই টুর্নামেন্টের মাধ্যমেই ১০ গোলের ক্লাবে সদস্য হয়ে গিয়েছেন।
- বিশ্বকাপ: ২০১৮, ২০২২, ২০২৬
- রেকর্ড ও বিশেষ কীর্তি: ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপে তিনি একাই ৬ গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে 'গোল্ডেন বুট' জয় করেন। এরপর ২০২২ কাতার বিশ্বকাপেও তিনি ২টি গোল করেছিলেন। গ্যারি লিনেকারের (১০ গোল) এর রেকর্ড ভেঙ্গে এখণ তিনি ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপের সবোর্চ্চ গোলদাতা।
বিশ্বকাপে ১০ বা তার বেশি গোল করা মানে শুধু দক্ষ স্ট্রাইকার হওয়া নয়; এর জন্য দরকার বছরের পর বছর ধারাবাহিক পারফরম্যান্স, চাপের মুহূর্তে নিজেকে প্রমাণ করার মানসিকতা এবং বড় মঞ্চে জ্বলে ওঠার ক্ষমতা। জাস্ট ফন্টেইনের এক আসরের ১৩ গোল, রোনালদোর ২০০২ সালের জাদুকরী পারফরম্যান্স, ক্লোসের ধারাবাহিকতা কিংবা মেসি ও এমবাপ্পের আধুনিক যুগের কীর্তি—প্রতিটি গল্পই বিশ্বকাপ ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করেছে।
চলমান ২০২৬ বিশ্বকাপে এখনও কিছু ম্যাচ বাকি থাকায় এই তালিকায় পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে লিওনেল মেসি ও কিলিয়ান এমবাপ্পের গোলসংখ্যা আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকা আগামী দিনগুলোতে আরও নতুন ইতিহাসের সাক্ষী হতে পারে।

