আল্লাহ মেঘ দে পানি দেছায়া দেরে তুই আল্লাহ মেঘ দে,আসমান হইল টুটা টুটা জমিন হইল ফাটামেঘ রাজা ঘুমাইয়া রইছে মেঘ দিব তোর কেডা
বাংলার লোকসাহিত্য ভাণ্ডার অসংখ্য প্রতিভাবান কবি ও গীতিকার দ্বারা সমৃদ্ধ, যাদের সৃষ্টিকর্ম গ্রামীণ জীবনের সুখ-দুঃখ, প্রেম-বিরহ ও প্রকৃতির গভীর অনুভূতিকে ধারণ করে। সেই ধারারই এক উজ্জ্বল নক্ষত্র লোককবি আবদুল হাই মাশরেকী। তাঁর রচিত গান, বিশেষ করে “নৈলা” বা বৃষ্টির গান, আজও লোকসংগীতপ্রেমীদের হৃদয়ে বিশেষ স্থান দখল করে আছে।
সহজ-সরল ভাষা, হৃদয়ছোঁয়া সুর ও জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতার মিশেলে তিনি সৃষ্টি করেছেন এক অনন্য সাহিত্যভাণ্ডার। তাঁর গান শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং গ্রামীণ সংস্কৃতি, ভালোবাসা ও মানুষের অনুভূতির এক জীবন্ত দলিল। এই লেখায় আমরা জানবো লোককবি আবদুল হাই মাশরেকীর জীবনী, তাঁর বিখ্যাত “নৈলা বা বৃষ্টির গান” এবং তাঁর অমর সৃষ্টিসমূহ সম্পর্কে বিস্তারিত।
জন্ম বংশপরিচয় ও কর্মজীবন
লোককবি আবদুল হাই মাশরেকীর জন্ম ১৯০৯ সালের ১ এপ্রিল (সার্টিফিকেট অনুযায়ী ১৯১৯) ময়মনসিংহ জেলার ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার কাঁকনহাটি গ্রামে তাঁর মামার বাড়িতে। পিতা ওসমান গণি সরকার ছিলেন জমিদার বিরোধী আন্দোলনের এক সাহসী কর্মী, যিনি সাধারণ কৃষকের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সংগ্রাম করে গেছেন। মাতা রহিমা খাতুন ছিলেন এক গৃহিণী, যিনি সন্তানদের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ ও আধ্যাত্মিক চেতনার বীজ বপন করেছিলেন। এই পারিবারিক পরিবেশই পরবর্তীতে আবদুল হাই মাশরেকীর সাহিত্য ও চিন্তাধারার ভিত্তি রচনা করে।
- শৈশব ও কৈশোর: মামার বাড়ির স্মৃতি
কাঁকনহাটি গ্রামের মামার বাড়িতে কাটানো শৈশবের স্মৃতি আবদুল হাই মাশরেকীর কবি-জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। এখানেই তিনি প্রথম দেখেছিলেন প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের অন্তরঙ্গ সম্পর্ক। একবার খরায় যখন গ্রামের ফসল নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়, তখন তাঁর মামা (যিনি পরবর্তীতে কবির শ্বশুরও ছিলেন) উত্তর বন্দে গ্রামের লোকজন নিয়ে ফরজ নামাজের পাশাপাশি নফল নামাজ, দুরুদ ও জিকির আদায় করতে থাকেন।
বৃষ্টি না আসা পর্যন্ত তারা বন্দ থেকেই ইবাদতে মগ্ন থাকতেন। প্রকৃতির এই বৈরী আচরণ ও মানুষের বৃষ্টি পাওয়ার তীব্র আকুতি দেখে কিশোর আবদুল হাই রচনা করেন অমর সৃষ্টি 'আল্লাহ মেঘ দে পানি দে ছায়া দেরে তুই আল্লাহ...'। এই গানটি কেবল তাঁর শৈশবের স্মৃতি নয়, বরং গ্রামবাংলার কৃষকের হাহাকার ও আকুতির এক চিরন্তন দলিল হয়ে আছে।
- শিক্ষাজীবন ও সাহিত্যে হাতেখড়ি
ময়মনসিংহের স্কুলে পড়াশোনার সময় থেকেই আবদুল হাই মাশরেকীর সাহিত্যচর্চা শুরু হয়। মাত্র অষ্টম শ্রেণীতে পড়ার সময় তাঁর প্রথম গ্রন্থ 'চোর' (গল্প) প্রকাশিত হয়। এটি ছিল তাঁর লেখনীর প্রথম আত্মপ্রকাশ, যা পরবর্তী পথচলার দিশা নির্দেশ করে। আনন্দ মোহন কলেজে ইন্টারমিডিয়েটে ভর্তি হওয়ার পর তিনি চাকরির সন্ধানে কলকাতায় পাড়ি জমান।
কলকাতা তখন বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির এক প্রাণকেন্দ্র। সেখানে তিনি এইচএমভি-তে পাঁচ বছরের চুক্তিভিত্তিক গান রচনা শুরু করেন। এই সময় তিনি শহরের আলো-আঁধারি, নগরজীবনের বাস্তবতা এবং পেশাদার সঙ্গীতজগতের সঙ্গে পরিচিত হন। কিন্তু ১৯৪৬ সালের হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার প্রেক্ষাপটে তিনি কলকাতা ছেড়ে পূর্ববঙ্গে (বর্তমান বাংলাদেশ) চলে আসেন এবং ঢাকার এইচএমভি-তে গান রচনার জন্য নতুন চুক্তিতে আবদ্ধ হন।
- কর্মজীবন: শিক্ষকতা থেকে সাংবাদিকতা
আবদুল হাই মাশরেকীর কর্মজীবন ছিল বহুমুখী ও বৈচিত্র্যময়। তিনি যেমন শিক্ষকতা করেছেন, তেমনি জুট রেগুলেশন বিভাগে কাজ করেছেন। তবে তাঁর সবচেয়ে পরিচিত পরিচয় হচ্ছে সাংবাদিকতা। তিনি দৈনিক সংবাদ পত্রিকায় সহ-সম্পাদক, দৈনিক বাংলা পত্রিকার সহ-সমপাদক এবং পরবর্তীতে কৃষি মন্ত্রণালয়ের 'কৃষিকথা' পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৬ সালে তিনি চাকুরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন।
সাংবাদিক হিসেবে তিনি যেমন সংবাদপত্রের পাতায় সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট ছিলেন, তেমনি তাঁর সাহিত্য ও গানের মাধ্যমেও তিনি সমাজের আয়না তুলে ধরেছেন। তাঁর রচনায় ফুটে উঠেছে কৃষকের দুঃখ, শ্রমিকের বেদনা, নিপীড়িতের হাহাকার এবং প্রান্তিক মানুষের স্বপ্ন।
ভাষা আন্দোলন ও রাজনৈতিক চেতনা
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ছিল বাঙালির জাতিসত্ত্বার অন্যতম গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। আবদুল হাই মাশরেকী এই আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন ঢাকা ও ময়মনসিংহে। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন মাতৃভাষার জন্য আন্দোলন শুধু ভাষার অধিকার নয়, বরং বাঙালির অস্তিত্ব ও মর্যাদার প্রশ্ন। তাঁর গান ও লেখনী ভাষা আন্দোলনের চেতনাকে জনমনে ছড়িয়ে দিতে সহায়ক হয়েছিল।
তিনি রাজনৈতিক দিক থেকেও ছিলেন অত্যন্ত সচেতন ও নীতিনিষ্ঠ। ১৯৬৭-৬৮ সালে তাঁর বিখ্যাত গান 'ওরে আমার ঝিলাম নদীর পানি'-এর জন্য তৎকালীন পাকিস্তান সরকার তাঁকে রাষ্ট্রীয় 'তঘমাই ইমতিয়াজ' পুরস্কার ঘোষণা করে। কিন্তু আবদুল হাই মাশরেকী তাৎক্ষণিকভাবে তা প্রত্যাখ্যান করেন। এটি ছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর প্রতি তাঁর ঘৃণা ও স্বাধীনচেতা মনোভাবের প্রতিফলন। তিনি কোনো পুরস্কারের লোভে নিজের আদর্শ ও বিশ্বাসের সাথে আপস করতে রাজি ছিলেন না।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতি তাঁর ছিল অগাধ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। ১৯৬৭ সালে তৎকালীন সরকার যখন কিছু সাহিত্যিককে দিয়ে রবীন্দ্রবিরোধী স্বাক্ষর সংগ্রহ করছিল, তখন তাঁরা আবদুল হাই মাশরেকীর কাছেও স্বাক্ষর নিতে আসেন। কিন্তু তিনি স্পষ্টভাবে স্বাক্ষর না দিয়ে ধিক্কার জানিয়ে তীব্র প্রতিবাদ করেছিলেন। তাঁর এই সাহসী অবস্থান বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে।
সাহিত্যকর্ম ও সৃষ্টিশীল ভাণ্ডার
- পালাগান ও পুঁথি রচনা
আবদুল হাই মাশরেকী ছিলেন পালাগানের একজন দক্ষ রচয়িতা। তাঁর লেখা পালাগানগুলো বাংলার লোকজ সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে। তাঁর উল্লেখযোগ্য পালাগানের মধ্যে রয়েছে:
- 'রাখাল বন্ধু'
- 'জরিনা সুন্দরী'
- 'আল্লা মেঘ দে ছায়া দে'
- জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবনীভিত্তিক 'দুখু মিয়ার জারি'
- বঙ্গবন্ধু ও স্বাধীনতার জারি'
- 'কাফনচোরা'
এছাড়া তিনি হজরত আবু বকর (রা.)-এর জীবন নিয়ে রচনা করেছেন পুঁথি কাব্য। এতে তাঁর আধ্যাত্মিক চেতনা ও ইসলামি মূল্যবোধের প্রতি অনুরাগ প্রকাশ পেয়েছে।
- কবিতা ও গান
আবদুল হাই মাশরেকীর কবিতা ও গান দুটি ভাগে বিভক্ত একটি গ্রামীণ জীবনের সরলতা, প্রকৃতি ও কৃষকের জীবন নিয়ে, অন্যটি সামাজিক রাজনৈতিক সচেতনতা ও প্রতিবাদ নিয়ে। তাঁর আধুনিক কাব্যগ্রন্থসমূহ:
- 'কিছু রেখে যেতে চাই'
- 'হে আমার দেশ'
- 'দেশ দেশ নন্দিতা'
- 'মাঠের কবিতা মাঠের গান'
তাঁর 'হে আমার দেশ' কবিতায় তিনি দেশপ্রেমের এক অনন্য দৃষ্টান্ত রেখেছেন। তিনি হৃদয়ের গভীর প্রেম দিয়ে দেশকে ভালোবাসার আহ্বান জানিয়েছেন। আবার 'এই ত পেয়েছি মাকে' কবিতায় স্বাধীনতা-উত্তর বিধ্বস্ত বাংলাদেশের করুণ দৃশ্য তিনি তুলে ধরেছেন।
- গল্পগ্রন্থ ও অন্যান্য
'কুলসুম', 'নদী ভাঙে'। উল্লেখযোগ্য যে, উপমহাদেশের বিখ্যাত অনুবাদক ননী ভৌমিক আবদুল হাই মাশরেকীর 'কুলসুম' গল্পগ্রন্থটি রুশ ভাষায় অনুবাদ করেছেন। এটি তাঁর সাহিত্যকর্মের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ছোটদের কাব্য 'হুতুম ভুতুম রাত্রি'। গীতিনাট্য 'ভাটিয়ালী'। খণ্ড কাব্য 'অভিশপ্তের বাণী'। পল্লীগীতিকা 'ডাল ধরিয়া নুয়াইয়া কন্যা'।
তাঁর লেখা বিখ্যাত কিছু গান
- আল্লাহ মেঘ দে পানি দে
আল্লাহ মেঘ দে পানি দেছায়া দেরে তুই আল্লাহ মেঘ দে,আসমান হইল টুটা টুটা জমিন হইল ফাটামেঘ রাজা ঘুমাইয়া রইছে মেঘ দিব তোর কেডাআল্লাহ মেঘ দে আল্লাহ মেঘ দেআল্লাহ মেঘ দে পানি দে পানিছায়া দেরে তুই আল্লাহ মেঘ দে।।- ফান্দে পরিয়া বগা কান্দে রে
ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দে রেফাঁদ বসাইছে ফান্দি রে ভাই পুঁটি মাছো দিয়াওরে মাছের লোভে বোকা বগা পড়ে উড়াল দিয়া রে
ফান্দে পড়িয়া বগা করে টানাটুনাওরে আহারে কুংকুরার সুতা, হল লোহার গুনারে
ফান্দে পড়িয়া বগা করে হায়রে হায়ওরে আহারে দারুন বিধি সাথী ছাইড়া যায় রেআর বগা আহার করে ধল্লা নদীর পারেরে- কাঙ্খের কলসি গিয়াছে ভাসি
আমার কাংখের কলসী গিয়াছে ভাসিমাঝিরে তোর নৌকার ঢেউ লাগিয়ারেমাঝিরে তোর নৌকার ঢেউলাগিয়া
ধীরে নৌকা বাইয়া যদি নদী হইতে পাড়তবে কি ভাসিতো জলে কলসী আমারআমার সহে না দেরী, আমি উপায় কি করিগৃহে যাবার সময় গেল বইয়ারে- বহু দিনের পরিতি বন্ধ
বহু দিনের পিরিত গো বন্ধু একই দিনে ভেঙ্গ না একই দিনে ভেঙো না গোএকই দিনে ভেঙ্গ না
কে যে রে ভাই বংশিওয়ালাবাজাও বাঁশি দুপুর বেলা, আরো একেলা তোমার বাশীর সুরে মনও হরে গো
ঘরে রইতে দিলি না, বহু দিনের..মাতা মইল পিতা মইলগুণের ভাই ছাড়িয়া রে গেল, সঙ্গে নিল না
- ওরে আমার ঝিলাম নদীর পানি
ওরে আমার ঝিলাম নদীর পানিদিনে রাতে চাও ভুলিবার দুঃখের কাহিনী।
- আল্লাহ মেঘ দে পানি দে
আল্লাহ মেঘ দে পানি দে
ছায়া দেরে তুই আল্লাহ মেঘ দে,
আসমান হইল টুটা টুটা জমিন হইল ফাটা
মেঘ রাজা ঘুমাইয়া রইছে মেঘ দিব তোর কেডা
আল্লাহ মেঘ দে আল্লাহ মেঘ দে
আল্লাহ মেঘ দে পানি দে পানি
ছায়া দেরে তুই আল্লাহ মেঘ দে।।
- ফান্দে পরিয়া বগা কান্দে রে
ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দে রে
ফাঁদ বসাইছে ফান্দি রে ভাই পুঁটি মাছো দিয়া
ওরে মাছের লোভে বোকা বগা পড়ে উড়াল দিয়া রে
ফান্দে পড়িয়া বগা করে টানাটুনা
ওরে আহারে কুংকুরার সুতা, হল লোহার গুনারে
ফান্দে পড়িয়া বগা করে হায়রে হায়
ওরে আহারে দারুন বিধি সাথী ছাইড়া যায় রে
আর বগা আহার করে ধল্লা নদীর পারেরে
- কাঙ্খের কলসি গিয়াছে ভাসি
আমার কাংখের কলসী গিয়াছে ভাসি
মাঝিরে তোর নৌকার ঢেউ লাগিয়ারে
মাঝিরে তোর নৌকার ঢেউলাগিয়া
ধীরে নৌকা বাইয়া যদি নদী হইতে পাড়
তবে কি ভাসিতো জলে কলসী আমার
আমার সহে না দেরী, আমি উপায় কি করি
গৃহে যাবার সময় গেল বইয়ারে
- বহু দিনের পরিতি বন্ধ
বহু দিনের পিরিত গো বন্ধু একই দিনে ভেঙ্গ না
একই দিনে ভেঙো না গো
একই দিনে ভেঙ্গ না
কে যে রে ভাই বংশিওয়ালা
বাজাও বাঁশি দুপুর বেলা, আরো একেলা
তোমার বাশীর সুরে মনও হরে গো
ঘরে রইতে দিলি না, বহু দিনের..
মাতা মইল পিতা মইল
গুণের ভাই ছাড়িয়া রে গেল, সঙ্গে নিল না
- ওরে আমার ঝিলাম নদীর পানি
ওরে আমার ঝিলাম নদীর পানি
দিনে রাতে চাও ভুলিবার দুঃখের কাহিনী।
মহাপ্রয়াণ ও চিরস্থায়ী উত্তরাধিকার
বাংলার লোকসাহিত্যের এই মহান সাধক কবি আবদুল হাই মাশরেকী ১৯৮৮ সালের ৪ ডিসেম্বর নিজ বাড়িতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মহাপ্রয়াণে বাংলা লোকসংগীতের আকাশে নেমে আসে এক অপূরণীয় শূন্যতা। কিন্তু মৃত্যুই তাঁর সৃষ্টিশীল যাত্রার ইতি টানতে পারেনি; বরং তাঁর রেখে যাওয়া অমর সৃষ্টিগুলোই আজ তাঁকে চিরঞ্জীব করে রেখেছে মানুষের হৃদয়ে। আবদুল হাই মাশরেকী ছিলেন প্রকৃত অর্থেই মাটি ও মানুষের কবি। গ্রামবাংলার সহজ-সরল জীবন, মানুষের সুখ-দুঃখ, প্রেম-বিরহ, প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য এবং আধ্যাত্মিক অনুভূতির গভীর প্রকাশ তাঁর লেখনীতে এক অনন্য মাত্রা পেয়েছে।
তাঁর প্রতিটি গান যেন মানুষের জীবনের গল্প বলে, হৃদয়ের না বলা কথাগুলোকে সুরের মাধ্যমে প্রকাশ করে। বিশেষ করে তাঁর রচিত “নৈলা” বা বৃষ্টির গানগুলোতে আমরা খুঁজে পাই প্রকৃতি ও মানবমনের এক অপূর্ব মেলবন্ধন। একই সঙ্গে সমাজের নানা অসঙ্গতি, কুসংস্কার ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাঁর সাহসী অবস্থান তাঁকে শুধু একজন কবি নয়, বরং একজন সচেতন সমাজসংস্কারক হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করেছে। গণতন্ত্র, মানবতা ও দেশপ্রেমের প্রতি তাঁর গভীর বিশ্বাস তাঁর সৃষ্টিকে দিয়েছে শক্তিশালী এক আদর্শিক ভিত্তি।
যদিও ১৯৮৮ সালে তিনি আমাদের ছেড়ে চিরবিদায় নিয়েছেন, তবুও তাঁর রচিত গান, পালাগান ও সাহিত্যকর্ম আজও গ্রামবাংলার আনাচে-কানাচে, মানুষের কণ্ঠে ও সংস্কৃতির ধারায় বেঁচে আছে। তাঁর সৃষ্টি শুধু অতীতের স্মৃতি নয়, বরং বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক অমূল্য প্রেরণার উৎস। এই মহান লোককবির প্রতি জানাই আমাদের গভীর শ্রদ্ধা ও বিনম্র প্রণাম। তাঁর অমর সৃষ্টিসমূহ যুগ যুগ ধরে বাঙালির হৃদয়ে বেঁচে থাকবে এটাই আমাদের বিশ্বাস।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
প্রশ্ন ১: আবদুল হাই মাশরেকী কে ছিলেন?
উত্তর: আবদুল হাই মাশরেকী ছিলেন একজন মাটি ও মানুষের কবি, গীতিকার, পালাগান রচয়িতা ও সাংবাদিক। তিনি ছিলেন অসাম্প্রদায়িক ও মানবতাবাদী চেতনার অধিকারী। 'আল্লাহ মেঘ দে পানি দে', 'ওরে আমার ঝিলাম নদীর পানি'সহ অসংখ্য কালজয়ী গান ও পালাগানের রচয়িতা তিনি। গণতন্ত্র, দেশপ্রেম ও কুসংস্কারবিরোধী অবস্থানের জন্য তিনি বিশেষভাবে পরিচিত।
প্রশ্ন ২: আবদুল হাই মাশরেকীর জন্ম ও মৃত্যু সম্পর্কে জানতে চাই।
উত্তর: তাঁর জন্ম ১৯০৯ সালের ১ এপ্রিল (সার্টিফিকেট অনুযায়ী ১৯১৯) ময়মনসিংহ জেলার ঈশ্বরগঞ্জের কাঁকনহাটি গ্রামে তাঁর মামার বাড়িতে। পিতার নাম ওসমান গণি সরকার ও মাতার নাম রহিমা খাতুন। তাঁর মৃত্যু হয় ১৯৮৮ সালের ৪ ডিসেম্বর নিজ বাড়িতে।
প্রশ্ন ৩: 'আল্লাহ মেঘ দে পানি দে' গানটি তিনি কীভাবে রচনা করেছিলেন?
উত্তর: স্কুলে পড়ার সময় কিশোর আবদুল হাই তাঁর মামার বাড়ি কাঁকনহাটি গ্রামে লক্ষ্য করেন খরায় ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তাঁর মামা ও গ্রামের লোকজন বৃষ্টির জন্য ফরজ ও নফল নামাজ, দুরুদ-জিকির আদায় করতেন। প্রকৃতির এই বৈরী পরিবেশ ও মানুষের বৃষ্টি পাওয়ার আকুতি দেখেই তিনি এই জনপ্রিয় পল্লীগীতি রচনা করেন।
প্রশ্ন ৪: তাঁর উল্লেখযোগ্য পালাগান ও গ্রন্থগুলো কী কী?
উত্তর: তাঁর লেখা উল্লেখযোগ্য পালাগানের মধ্যে রয়েছে—'রাখাল বন্ধু', 'জরিনা সুন্দরী', 'আল্লা মেঘ দে ছায়া দে', জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবনীভিত্তিক 'দুখু মিয়ার জারি', বঙ্গবন্ধু ও স্বাধীনতার জারি', 'কাফনচোরা' এবং হজরত আবু বকর (রা.)-এর জীবন নিয়ে পুঁথি। তাঁর গ্রন্থগুলোর মধ্যে আধুনিক কাব্য 'কিছু রেখে যেতে চাই', 'হে আমার দেশ', 'দেশ দেশ নন্দিতা', 'মাঠের কবিতা মাঠের গান', গল্পগ্রন্থ 'কুলসুম' ও 'নদী ভাঙে' বিশেষভাবে পরিচিত।
প্রশ্ন ৫: ভাষা আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা কী ছিল?
উত্তর: ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে আবদুল হাই মাশরেকী সক্রিয়ভাবে কাজ করেছেন ঢাকা ও ময়মনসিংহে। তিনি ভাষা আন্দোলনের পক্ষে জনমত গঠনে সাহিত্য ও সঙ্গীতের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
প্রশ্ন ৬: 'তঘমাই ইমতিয়াজ' পুরস্কার প্রত্যাখ্যানের ঘটনাটি কী?
উত্তর: ১৯৬৭-৬৮ সালে 'ওরে আমার ঝিলাম নদীর পানি' গানের জন্য তৎকালীন পাকিস্তান সরকার তাঁকে রাষ্ট্রীয় 'তঘমাই ইমতিয়াজ' পুরস্কার ঘোষণা করলে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে তা প্রত্যাখ্যান করেন। এটি ছিল তাঁর অসাম্প্রদায়িক ও স্বাধীনচেতা মনোভাবের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
প্রশ্ন ৭: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতি তাঁর মনোভাব কী ছিল?
উত্তর: ১৯৬৭ সালে তৎকালীন সরকার কিছু সাহিত্যিককে দিয়ে রবীন্দ্রবিরোধী স্বাক্ষর সংগ্রহ করছিল। যখন তাঁদের কাছে আবদুল হাই মাশরেকীর কাছে স্বাক্ষর নিতে আসে, তিনি স্বাক্ষর না দিয়ে ধিক্কার জানিয়ে তীব্র প্রতিবাদ করেছিলেন। এটি তাঁর রবীন্দ্রনাথের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও স্বাধীনচেতা মনোভাবের পরিচয় দেয়।
প্রশ্ন ৮: তাঁর লেখা বিখ্যাত গানগুলো কী কী?
উত্তর: তাঁর লেখা কয়েকটি বিখ্যাত গান হলো—
- "আল্লাহ মেঘ দে পানি দে ছায়া দেরে তুই আল্লাহ"
- "ওরে আমার ঝিলাম নদীর পানি"
- "ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দে রে"
- "কাঙ্খের কলসি গিয়াছে ভাসি"
- "বহু দিনের পিরিত গো বন্ধু একই দিনে ভেঙো না"
- "কে যে রে ভাই বংশিওয়ালা"
- "এসো গণতন্ত্র গড়ে তুলি"
- "এ যে শহীদেও স্মৃতির মিনার"
- "বাংলা মা তোর শ্যামল বরণ"
- "একদিন হবে ভুলিতে"
প্রশ্ন ৯: কবি হিসেবে তাঁর বিশেষ অবদান কী?
উত্তর: আবদুল হাই মাশরেকী শুধু গ্রামীণ বিষয়বস্তু নিয়ে সাহিত্য সৃষ্টি করেননি, তিনি গণতন্ত্রের মন্ত্রে দীক্ষিত করেছেন তাঁর গানের মাধ্যমে। তাঁর লেখনীতে ফুটে উঠেছে রাজপথের বীভৎস হানাহানি, মানুষের রক্তে ভেজা রাজপথ, স্বাধীনতা-উত্তর বিধ্বস্ত বাংলাদেশের করুণ দৃশ্যপট। তিনি অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে তীক্ষ্ণ সনেট রচনা করেছেন। উপমহাদেশের বিখ্যাত অনুবাদক ননী ভৌমিক তাঁর 'কুলসুম' গল্পগ্রন্থ রুশ ভাষায় অনুবাদ করেছেন।
প্রশ্ন ১০: আবদুল হাই মাশরেকী কেন আজও প্রাসঙ্গিক?
উত্তর: আবদুল হাই মাশরেকী আজও প্রাসঙ্গিক কারণ—
- তিনি ছিলেন অসাম্প্রদায়িক ও মানবতাবাদী—যা আজকের বিভক্ত সমাজে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়
- তাঁর গানে ফুটে উঠেছে কৃষক-শ্রমিক-সাধারণ মানুষের কথা
- গণতন্ত্র ও দেশপ্রেমের চেতনা তিনি ছড়িয়ে দিয়েছেন
- কুসংস্কার ও অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে তাঁর প্রতিবাদী সনেটগুলো আজও প্রাসঙ্গিক
- তাঁর 'আল্লাহ মেঘ দে' গানটি আজও কৃষকের আকুতির অমর প্রতীক
- বাংলা লোকসংস্কৃতির ভাণ্ডারকে তিনি সমৃদ্ধ করেছেন
