অমৃত মেঘের বারি মুখের কথায় কি মেলে।চাতক স্বভাব না হলে চাতক পাখির এমনি ধারা
বাংলার লোকসংস্কৃতির মহাসাধক ফকির লালন সাঁই তাঁর গানে প্রকৃতি ও জীবজগতের নানা প্রতীক ব্যবহার করেছেন। এর মধ্যে চাতক পাখি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। লোকবিশ্বাসে চাতক এমন এক পাখি, যে মাটির পানি কখনো পান করে না। আকাশ থেকে বৃষ্টি নামলে সে বৃষ্টির ফোঁটাকে অপেক্ষা করে চেয়ে থাকে। তার তৃষ্ণা মেটানোর একমাত্র উৎস সেই আকাশের জল।
লালন সাঁই এই চাতককে মানুষের অতৃপ্ত সাধনা, প্রেম ও আধ্যাত্মিক তৃষ্ণার প্রতীক হিসেবে দেখেছেন। মানুষ যতই জাগতিক ভোগে ডুবে থাকুক, তার অন্তরের গভীরে এক অদৃশ্য তৃষ্ণা কাজ করে। সেই তৃষ্ণা কেবল সত্য, প্রেম ও পরমাত্মার সান্নিধ্যে মেটানো সম্ভব। যেমন চাতক পাখি শুধু আকাশের জল চায়, তেমনি সত্যসাধক মানুষ কেবল স্রষ্টার প্রেম চায়, আর কোনো বস্তু দিয়ে তার তৃষ্ণা মেটে না।
চাতক স্বভাব: আধ্যাত্মিক নিষ্ঠা ও একনিষ্ঠতার প্রতীক
লালন সাঁইয়ের দর্শনে ‘চাতক স্বভাব’ হলো সাধকের সেই মনস্তাত্ত্বিক ও আত্মিক অবস্থা, যেখানে জাগতিক কোনো লোভ বা বিকল্প আনন্দ সাধককে মূল পথ থেকে বিচ্যুত করতে পারে না। লোকসংস্কৃতিতে চাতক পাখির যে অনন্য বৈশিষ্ট্য অর্থাৎ নদী, নালা, সমুদ্রের বিপুল জলরাশি পাশে থাকা সত্ত্বেও সে কেবল মেঘের এক ফোঁটা জলের জন্য চাতক চেয়ে থাকে তাকে লালন তুলনা করেছেন মানুষের শুদ্ধ ভক্তির সাথে।
সংসারে কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাৎসর্য এই ষড়রিপু মানুষকে চারপাশ থেকে ঘিরে রাখে। এগুলো হলো সেই ‘অন্য বারি’ বা জাগতিক জল, যা সাময়িকভাবে মানুষের তৃষ্ণা মেটালেও আত্মাকে কলুষিত করে। চাতক যেমন অন্য জলে চঞ্চু ভেজায় না, তেমনি প্রকৃত সত্যসাধকও সংসারের এই মেকি সুখে গা ভাসান না।
সমুদ্রের কিনারায় তৃষ্ণা: চাতক ও বিরহ তত্ত্ব
লালন শাহের গানে চাতকের আকুলতা মূলত সুফি তত্ত্বের ‘বিরহ’ বা বৈষ্ণব দর্শনের ‘রাধাভাব’-এর সমার্থক। মামুন নদীয়ার কণ্ঠে গীত গানটিতে যখন বলা হয়—“সমুদ্রের কিনারায় থেকে জল বিনে চাতকী ম’লো”, তখন এক পরম বিস্ময় ও বেদনার সৃষ্টি হয়। চোখের সামনে অগাধ জলরাশি, অথচ চাতকী তৃষ্ণার্ত।
আধ্যাত্মিক দৃষ্টিতে এই 'সমুদ্র' হলো আমাদের এই দৃশ্যমান পৃথিবী, যা বৈষয়িক সুখে পরিপূর্ণ। কিন্তু সাধকের আত্মা এই জাগতিক সুখে শান্ত হয় না। তার চাই ‘নবঘন বারি’ বা ঈশ্বরের করুণা। সাধক নিজের জীবন বিসর্জন দিতে প্রস্তুত, কিন্তু আদর্শ ও প্রতিজ্ঞা থেকে চ্যুত হতে রাজি নন। এই একনিষ্ঠ প্রেমই মানুষকে সাধারণ জীব থেকে ‘মহৎ’ মানুষে রূপান্তরিত করে।
জ্যান্তে মরা ও হৃৎকমলের বিকাশ
'জ্যান্তে মরা' বা জীবন্মৃত অবস্থা হলো লালন দর্শনের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। এর অর্থ শারীরিক মৃত্যু নয়, বরং বেঁচে থেকেও নিজের অহংকার, অহংবোধ এবং জাগতিক কামনা-বাসনাকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করা। চাতক যেমন ডালে বসে কেবল মেঘের ধেয়ানে মগ্ন থাকে, তেমনি সাধককেও নিজের ভেতরের ‘আমি’কে মেরে গুরুর চরণে সমর্পণ করতে হয়।
যখন এই ডাক বা সাধনা তীব্র থেকে তীব্রতর হয়, তখন সাধকের ভেতরের ‘হৃৎকমল’ বা হৃদয়ের পদ্মটি বিকসিত হয়। লালন বলছেন, সেই বিকসিত পদ্মেই তখন আধ্যাত্মিক সুধার ‘মধুর চাক’ বা পরমানন্দের সৃষ্টি হয়। অর্থাৎ, পরম সত্য বাইরে কোথাও নেই, চাতক স্বভাব ধারণ করে অন্তরে ডুব দিলেই সেই অমৃতের সন্ধান মেলে।
অন্তিম উড্ডয়ন: চাতক ও মোক্ষ লাভ
চাতক পাখির মিথ অনুযায়ী, জীবনের শেষ মুহূর্তে সে সূর্যের দিকে ডানা মেলে উড়ে যায়। সূর্য হলো সমস্ত শক্তির উৎস এবং পরম আলোর প্রতীক। লালন সাঁইজির গানে এই অন্তিম দর্শনের প্রতিফলন ঘটে সাধকের মোক্ষ বা ফানা (খোদার প্রেমে বিলীন হওয়া) লাভের মাধ্যমে।
মানুষের মন স্বভাবতই চঞ্চল। লালন আক্ষেপ করে বলেছেন, “মন হয়েছে পবন গতি উড়ে বেড়ায় দিবারাতি”। এই পবনগতির মনকে চাতকের মতো একমুখী করাই হলো আসল সাধনা। সাধক যখন গুরুর প্রতি পূর্ণ নিরিখ বা দৃষ্টি স্থাপন করতে পারেন, তখন তার চঞ্চল মন স্থির হয়। জীবনের শেষলগ্নে এসে সেই সাধক চাতকের মতোই সমস্ত পার্থিব বন্ধন ছিন্ন করে পরম জ্যোতি বা স্রষ্টার আলোতে নিজেকে বিলীন করে দেন।
চাতক বাঁচে কেমনে মেঘের বরিষন বিনে
কন্ঠ- বাউল শফি মন্ডল
চাতক বাঁচে কেমনে মেঘের বরিষণ বিনে।
তুমি দাতার শিরোমণি আমি চাতক অভাগিনী
তোমা ভিন্ন আর না জানি রেখো চরণে
মেঘের বরিষণ বিনে
চাতক বাঁচে কেমনে মেঘের বরিষণ বিনে।
চাতক ম’লে যাবে জানা ঐ নামের গৌরব রবে না
জল দিয়ে কর সান্তনা অবোধ লালনে
মেঘের বরিষণ বিনে
চাতক বাঁচে কেমনে মেঘের বরিষণ বিনে।।
সমুদ্রের কিনারায় থেকে জল বিনে চাতকী ম’লো
কন্ঠ- মামুন নদীয়া
সমুদ্রের কিনারায় থেকে জল বিনে চাতকী ম’লো
হায়রে বিধি ওরে বিধি তোর মনে কি ইহাই ছিলো।
নবঘন বিনে বারি খায় না চাতক অন্য বারি
চাতকের প্রতিজ্ঞা ভারি যায় যাবে প্রাণ সেও ভালো।
চাতক থাকে মেঘের আশে মেঘ বরিষণ অন্য দেশে
বলো চাতক বাঁচে কিসে ওষ্ঠাগত প্রাণ আকুল।
লালন ফকির বলে রে মন হলো না মোর ভজন সাধন
ভুলে সিরাজ সাঁইজীর চরণ মানব জনম বৃথা গেল ।
কবে সাধুর চরন ধুলি মোর লাগবে গায়
কন্ঠ- সাধু গুরু রব ফকির
কবে সাধুর চরন ধুলি মোর লাগবে গায়
আমি বসে আছি আশাসিন্ধু হয়ে সদাই
চাতক যেমন মেঘের জল বিনে
অহর্নিশি চেয়ে থাকে মেঘ ধোয়ানে
ও সে তৃষ্ণায় মৃত্যুর গতি জীবনে হোল
সে দশা আমার
ভজন সাধন আমাতে নাই
কেবল মহৎ নামেএ দেই গো দোহাই
তোমার নামের মহিমা জানাও গো সাঁই
পাপী হও সদয় ॥
শুনেছি সাধুর করুনা
সাধুর চরণ পরশিলে হয়গো সোনা
বুঝি আমার ভাগ্যে তাও হোলনা ফকির
লালন কেঁদে কয়।
সে রূপ দেখবি যদি নিরবধি সরল হয়ে থাক
কন্ঠ- শহিদুল বাউল
সে রূপ দেখবি যদি নিরবধি সরল হয়ে থাক
আয় না চলে ঘোমটা ফেলে নয়ন ভরে দেখ।
সরল ভাবে যে তাকাবে অমনি সে রূপ দেখতে পাবে
রূপেতে রূপ মিশে যাবে ঢাকনি দিয়ে ঢাক।
চাতক পাখির এমনি ধারা অন্য বারি খায় না তারা
প্রান থাকিতে জ্যান্তে মরা ঐ রূপ ডালে বসে ডাক।
ডাকতে ডাকতে রাগ ধরিবে হৃৎকমল বিকশিত হবে
লালন বলে সেই কমলে হবে মধুর চাক।
অমৃত মেঘের বারি মুখের কথায় কি মেলে
কন্ঠ-
অমৃত মেঘের বারি মুখের কথায় কি মেলে।
চাতক স্বভাব না হলে চাতক পাখির এমনি ধারা
তৃষ্ণায় জীবন যায় গো মারা অন্য বারি খায় না তারা
মেঘের জল বিনে মেঘে কত দেয় গো ফাঁকি
তবু চাতক মেঘের ভুখী।
অমনি নিরিখ রাখলে আঁখি তারে সাধক বলে
মন হয়েছে পবন গতি উড়ে বেড়ায় দিবারাতি
ফকির লালন বলে গুরুর প্রতি মন রয় না সুহালে।।
চাতক জীবনচক্রের অন্তিম দর্শন
চাতক পাখির মিথ অনুযায়ী, সে তৃষ্ণায় জীবন দিলেও অন্য জল পান করে না এবং শেষ সময়ে সূর্যের দিকে উড়াল দিয়ে নিজের জীবনচক্র শেষ করে। লালন সাঁইয়ের গানে এই 'চাতক স্বভাব' আসলে একজন প্রকৃত সত্যসন্ধানীর প্রতিকৃতি, যে জগতের হাজারো প্রলোভন এড়িয়ে কেবল অমৃতের সন্ধানে নিমগ্ন থাকে। ফকির লালন সাঁই তাঁর গানে প্রকৃতি ও জীবজগতের নানা প্রতীক ব্যবহার করেছেন, যার মধ্যে চাতক পাখি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
লোকবিশ্বাসে চাতক কেবল বৃষ্টির জলের জন্য অপেক্ষা করে। লালন এই চাতককে মানুষের অতৃপ্ত আধ্যাত্মিক সাধনা এবং পরমাত্মার প্রতি ব্যাকুলতার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছেন। জগতসংসারের মায়া ত্যাগ করে কেবল 'অমৃত মেঘের বারি' বা স্রষ্টার প্রেমের প্রত্যাশাই হলো চাতক স্বভাব। আজকের এই অতি-ভোগবাদী এবং কৃত্রিমতার যুগে লালন সাঁইয়ের ‘চাতক দর্শন’ আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। মানুষ আজ চারপাশের সস্তা ও ক্ষণস্থায়ী সুখে মত্ত হয়ে নিজের ভেতরের আত্মিক পিপাসাকে ভুলে যাচ্ছে।
লালন আমাদের মনে করিয়ে দেন, মুখের কথায় বা অগভীর চাতুরিতে সেই ‘অমৃত মেঘের বারি’ বা পরম শান্তি মেলে না। তার জন্য অন্তরে চাতকের মতো একনিষ্ঠতা, সততা এবং ধৈর্যের প্রয়োজন। চাতক পাখি তাই কেবল লালনের গানের একটি রূপক নয়, এটি প্রতিটি মানুষের অন্তরের সেই চিরন্তন সত্যসন্ধানী সত্তারই এক মূর্ত প্রতীক।

