জীবনানন্দ হয়ে সংসারে আজও আমিসবকিছু ভুলে যেন করি লেনদেনতুমিও তো বেশ আছো, ভালোই আছোকবিতায় পড়া সেই বনলতা সেন
বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনে এমন কিছু শিল্পী আছেন যাঁরা কখনো প্রচারের আলোয় নিজেকে মেলে ধরার চেষ্টা করেননি। অথচ শ্রোতার হৃদয়ে গড়ে তুলেছেন এক চিরস্থায়ী আসন। ওস্তাদ নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরী তেমনই এক কিংবদন্তি নাম। শাস্ত্রীয় সংগীত, খেয়াল, ঠুমরি থেকে শুরু করে নজরুলসংগীত, আধুনিক গান, গজল কিংবা চলচ্চিত্রের প্লেব্যাক প্রতিটি ধারাতেই তিনি রেখে গেছেন নিজস্ব এক স্বাক্ষর, যা সহজে অনুকরণযোগ্য নয়।
'জীবনানন্দ হয়ে সংসারে আজও আমি', 'আজ এই বৃষ্টির কান্না দেখে', 'কিছু লোক কিছু কথা বলবে', 'সুখ আমার সুখ পাখি', 'এক তাজমহল যাব যে গড়ে' এমন অসংখ্য কালজয়ী গান আজও শ্রোতাদের মনে সমান আবেদন নিয়ে বেঁচে আছে। এই গানগুলো শুধু সুরের মূর্ছনা নয়, বরং এক গভীর অনুভূতির প্রকাশ, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষকে ছুঁয়ে যায়।
অথচ এই বিশাল সৃষ্টিশীলতার বিপরীতে তাঁর ব্যক্তিজীবন ছিল বিস্ময়করভাবে প্রচারবিমুখ। মঞ্চে বা টেলিভিশনের পর্দায় তাঁকে সরাসরি দেখার সৌভাগ্য খুব কম মানুষেরই হয়েছে। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিল্পীর পরিচয় তাঁর সৃষ্টিতেই নিহিত থাকা উচিত, ক্যামেরার ফ্ল্যাশে নয়। তাই খ্যাতির মোহ তাঁকে কখনো টলাতে পারেনি। এই নিভৃতচারিতাই তাঁকে করে তুলেছে আরও অনন্য এক প্রকৃত সাধকের মতো, যিনি সংগীতের সাধনাকেই জীবনের ব্রত মনে করেছেন, আর রেখে গেছেন এমন সব গান, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম শ্রোতার হৃদয়ে বেঁচে থাকবে।
সুরের হাতেখড়ি ও পথচলা
ওস্তাদ নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরীর জন্ম ১৯৫২ সালের ১৩ জানুয়ারি নরসিংদী জেলার শিবপুর উপজেলার খৈনকুট গ্রামে। ছোটবেলা থেকেই সংগীতের প্রতি ছিল প্রবল আকর্ষণ। তাঁর সংগীতে হাতেখড়ি হয় ওস্তাদ মরহুম আয়াতুল্লাহ খানের কাছে। পরে পাক-ভারত উপমহাদেশের প্রখ্যাত পাটিয়ালা ঘরানার দুই মহাগুরু ওস্তাদ আমানত আলী খান এবং ওস্তাদ ফতেহ আলী খান-এর কাছে দীর্ঘদিন তালিম গ্রহণ করেন। এই কঠোর সাধনাই তাঁকে পরিণত করে বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ধ্রুপদী শিল্পীতে।
সংগীতচর্চার পাশাপাশি তিনি উচ্চশিক্ষাও অর্জন করেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি কিছু সময় ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনে লেকচারার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। জ্ঞান, সংগীত এবং সংস্কৃতির সমন্বয়ে গড়ে ওঠা তাঁর ব্যক্তিত্ব তাঁকে সমকালীন শিল্পীদের কাছে বিশেষ মর্যাদা এনে দেয়। নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরীর পরিবারও সংগীতময়। তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন বিশিষ্ট সংগীতজ্ঞ ওস্তাদ সৈয়দ জাকির হোসেন-এর কন্যা সাবরা নিয়াজ-এর সঙ্গে। সাবরা নিয়াজ নিজেও একজন দক্ষ সংগীতশিল্পী।
সুরের জাদুকর ও তাঁর বৈশিষ্ট্য
নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরীর কণ্ঠের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর গভীরতা, দরাজ স্বর এবং শাস্ত্রীয় সংগীতের নিখুঁত প্রয়োগ। তিনি উচ্চাঙ্গসংগীতের কঠিন রাগভিত্তিক পরিবেশনকে যেমন সাবলীলতায় ধারণ করেন, তেমনি আধুনিক গানেও সৃষ্টি করেছেন নিজস্ব এক স্বতন্ত্র ধারা। তাঁর গাওয়া প্রতিটি গান যেন এক একটি ক্যানভাস, যেখানে সুরের কারুকাজ আর আবেগের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে সমানতালে। বিস্ময়কর হলেও সত্য যে একজন কিংবদন্তি হওয়া সত্ত্বেও তিনি সারাজীবন প্রচারের আড়ালে থেকেছেন। অগণিত শ্রোতা থাকলেও, তাঁকে সরাসরি মঞ্চে বা টেলিভিশনের পর্দায় দেখার সুযোগ হয়েছে কালেভদ্রে। তবে দীর্ঘ বিরতির পর ২০১৬ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর দেশ টিভির ‘মিউজিক্যাল লাইভ’ অনুষ্ঠানে তাঁর প্রত্যাবর্তন ভক্তদের জন্য ছিল এক অভাবনীয় উপহার। সেই রাতে তিনি কেবল গানই শোনাননি, বরং দর্শকদের সাথে সরাসরি আলাপচারিতায় অংশ নিয়ে এক আবেগঘন মুহূর্তের সৃষ্টি করেছিলেন।
- নিখুঁত সুর
- রাগসংগীতে অসাধারণ দখল
- আবেগঘন পরিবেশনা
- স্পষ্ট উচ্চারণ
- ধ্রুপদী ও আধুনিক সংগীতের সফল মেলবন্ধন
- তাঁর গান শুধু শোনা যায় না—অনুভব করা যায়।
চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক, টেলিভিশনে বিরল উপস্থিতি এবং নজরুলসংগীতে অসামান্য অবদান
উচ্চাঙ্গসংগীতের পাশাপাশি ওস্তাদ নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরী বাংলা চলচ্চিত্রেও একজন সফল প্লেব্যাক শিল্পী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তিনি কণ্ঠ দিয়েছেন বেশ কিছু চলচ্চিত্রে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
- গীত কাহিনী সংগীত কাহিনী
- নতুন বউ
- দেওয়ানা
- দেনা-পাওনা
- চকোরী
- মিস সুন্দরী বাংলাদেশ
প্রচারের আলো থেকে দূরে থাকা এই শিল্পী ছিলেন সত্যিকার অর্থেই একজন প্রচারবিমুখ মানুষ। তাই টেলিভিশনে তাঁর উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত বিরল। ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনের ‘আমার যত গান’ অনুষ্ঠানে প্রথমবার তাঁকে দর্শকরা দেখতে পান। এরপর দীর্ঘ বিরতির পর বিভিন্ন সময়ে তিনি অংশ নেন
- ইত্যাদি
- আড্ডা
- সময় কাটুক গানে গানে
- এটিএন বাংলা
- দেশ টিভি
এসব অনুষ্ঠানে তিনি ধ্রুপদী ও আধুনিক সংগীত পরিবেশন করে দর্শক-শ্রোতাদের মুগ্ধ করেন। ২০০৬ সালে বিটিভির জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’-তে তিনি তাঁর পরিবারকে নিয়ে উপস্থিত হন এবং পরিবেশন করেন নিজের লেখা ও সুর করা গান "কবিতার মত মেয়েটি, গল্পের মত ছেলে..."
অন্যদিকে, নজরুলসংগীতেও তাঁর অবদান ছিল অসামান্য। ২০০২ সালে দ্বিতীয় উত্তর আমেরিকা নজরুল সম্মেলনে তিনি পরিবেশন করেন একাধিক কালজয়ী নজরুলগীতি, যার মধ্যে রয়েছে-
- ভরিয়া পরাণ শুনিতেছি গান
- আমি পথ মঞ্জরী ফুটেছি আঁধার রাতে
- শাওন আসিল ফিরে
- শুভ্র সমুজ্জল হে চির নির্মল
- কাবেরী নদী জলে কে গো বালিকা
- আজি ঘুম নহে
- বনপথে কে যায়
এই পরিবেশনাগুলো আজও সংগীতপ্রেমীদের কাছে গভীর শ্রদ্ধা ও স্মৃতির সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে আছে।
ডিস্কোগ্রাফি: ওস্তাদ নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরীর সুরের ভাণ্ডার
দীর্ঘ সংগীতজীবনে ওস্তাদ নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরী খুব বেশি অ্যালবাম প্রকাশ করেননি। তাঁর উল্লেখযোগ্য অ্যালবামের মধ্যে রয়েছে ‘স্বপনে’, ‘জীবনানন্দ’ এবং ‘আধুনিক বাংলা গান-১’। তবে ‘জীবনানন্দ’ ও ‘আধুনিক বাংলা গান-১’-কে তিনি প্রকৃত অর্থে একক অ্যালবাম মনে করতেন না, কারণ সেগুলোর গান বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশনে পূর্বে ধারণকৃত পরিবেশনা থেকে সংগ্রহ করে প্রকাশ করা হয়েছিল।
২০১৩ সালের ২৩ আগস্ট জি-সিরিজ থেকে প্রকাশিত ‘ওস্তাদ নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরী’ ছিল তাঁর পরিকল্পিত প্রথম একক অ্যালবাম। এই অ্যালবামে মোট ৯টি গান স্থান পায়। ছদ্মনাম ‘অর্পিয়াস’ ব্যবহার করে তিনি সবকটি গানের সুর করেন এবং ছয়টি গানের কথা লেখেন। বাকি তিনটি গানের গীতিকার ছিলেন মুন্সী ওয়াদুদ, মনিরুজ্জামান মনির ও ফয়সাল আহমেদ। বাপ্পা মজুমদারের সংগীত পরিচালনায় নির্মিত অ্যালবামটির প্রতিটি গানে ধ্রুপদী সংগীতের আবহ, রাগভিত্তিক সুরের ছোঁয়া এবং কাহারবা, রূপক ও ঝাঁপতালের সুষম প্রয়োগ লক্ষ করা যায়, যা তাঁর সংগীতসাধনার স্বাক্ষর বহন করে।
- জীবনানন্দ
- স্বপনে
- আধুনিক বাংলা গান-১
- ওস্তাদ নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরী (প্রথম পরিকল্পিত একক অ্যালবাম)
অ্যালবাম: জীবনানন্দ
- শিল্পী: ওস্তাদ নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরী
- অ্যালবামের নাম: জীবনানন্দ
- মোট গান: ১২ টি
- প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান: ডি-সিরিজ
গানসমূহ:জীবনানন্দ
- ভালোবাসার কথা- কথা ও সুর: শহীদুজ্জামন স্বপন
- জীবনানন্দ হয়ে- কথা: ওসমান শওকত, সুর: শাহনেওয়াজ
- আজ এই বৃষ্টির - কথা: কাওসার আহমেদ চৌধুরী, সুর: লাকী আখন্দ
- তোমার কালো দুটি চোখ- কথা ও সুর: শহীদুজ্জামন স্বপন
- নদী মিশে সাগরে- কথা ও সুর: শহীদুজ্জামন স্বপন
- ভালোবাসার সুখ- কথা ও সুর: শহীদুজ্জামন স্বপন
- কিছু লোক কিছু কথা- কথা: মনিরুজ্জামন মনির, সুর : আলাউদ্দিন আলী
- এক ফোঁটা বিষ- কথা: ওসমান শওকত, সুর: শাহনেওয়াজ
- সুখ আমার সুখ তারা- কথা: মনিরুজ্জামন মনির, সুর : আলাউদ্দিন আলী
- নদীরে তোর বুকে কত- কথা ও সুর: শহীদুজ্জামন স্বপন
- এক তাজমহল- কথা: মনিরুজ্জামন মনির, সুর : আবু তাহের
- অনেক আশার খেলাঘর- কথা ও সুর: শহীদুজ্জামন স্বপন
অ্যালবাম: ওস্তাদ নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরী (Self-Titled)
এই অ্যালবামে তিনি নিজেই সুরকার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ছদ্মনাম অর্পিয়াস ব্যবহার করে তিনি নিজেই সব গানের সুর করেন এবং ছয়টি গানের কথা লেখেন।
- শিল্পী: ওস্তাদ নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরী
- অ্যালবামের নাম: ওস্তাদ নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরী (Self-Titled Album)
- সংগীত পরিচালনা ও সংগীতায়োজন: বাপ্পা মজুমদার
- সুরকার: ওস্তাদ নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরী (ছদ্মনাম অর্পিয়াস)
- মোট গান: ৯টি
- প্রকাশের তারিখ: ২৩ আগস্ট ২০১৩
- প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান: জি-সিরিজ (G-Series)
- মোড়ক উন্মোচনের স্থান: গুলশান ক্লাব, ঢাকা
- পৃষ্ঠপোষক: ব্র্যাক ব্যাংক
গানসমূহ:ওস্তাদ নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরী
- ঝরঝর বৃষ্টি তুমি ঝরো না- কথা ও সুর: নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরী
- ডেকো না পিছু ডেকো না- কথা ও সুর: নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরী
- চলে গেছে যে- কথা ও সুর: নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরী
- গভীর রাতে সূর্য খুঁজি- কথা: ফয়সাল আহমেদ, সুর : নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরী
- ফিরায়ে দিয়েছো ফিরে চলে যাই- কথা ও সুর: নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরী
- হারানো দিনের স্মৃতি- কথা ও সুর: নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরী
- যেয়ো না গো তুমি- কথা ও সুর: নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরী
- হৃদয়ের কান্না শুনতে চেয়ো না- কথা: মনিরুজ্জামন মনির, সুর : নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরী
- তুমি কি জানো না- কথা: মুন্সি ওয়াদুদ, সুর : নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরী
ওস্তাদ নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরী এমন এক শিল্পী, যিনি কখনো জনপ্রিয়তার জন্য গান করেননি; গান করেছেন সংগীতের প্রতি গভীর ভালোবাসা থেকে। প্রচারের আলো থেকে দূরে থেকেও তিনি বাংলা সংগীতকে সমৃদ্ধ করেছেন অগণিত কালজয়ী সৃষ্টি দিয়ে। আজও যখন 'জীবনানন্দ হয়ে' কিংবা 'কিছু লোক কিছু কথা বলবে' বাজতে শুরু করে।
তখন নতুন-পুরোনো সব শ্রোতার হৃদয়ে একই অনুভূতির জন্ম হয়। সময় বদলেছে, প্রজন্ম বদলেছে, কিন্তু নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরীর সুরের আবেদন আজও অমলিন। বাংলা সংগীতের ইতিহাসে তিনি চিরকাল স্মরণীয় থাকবেন এক অনন্য ধ্রুপদী শিল্পী, একজন সুরসাধক এবং নিভৃতচারী কিংবদন্তি হিসেবে।
