১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের কথা উঠলেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সাহসিকতা। কিন্তু স্বাধীনতার এই সংগ্রাম শুধু বন্দুকের নলেই সীমাবদ্ধ ছিল না। শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, ক্রীড়াবিদ সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে লড়াই করেছিলেন। সেই ইতিহাসের অন্যতম উজ্জ্বল অধ্যায় স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গঠন, মুক্তিযুদ্ধের জন্য তহবিল সংগ্রহ এবং বিশ্বের সামনে বাংলাদেশের অস্তিত্ব তুলে ধরতে ১৯৭১ সালে গঠিত হয় এই ঐতিহাসিক ফুটবল দল। পৃথিবীর ইতিহাসে যুদ্ধকালীন সময়ে গঠিত প্রথম ফুটবল দল হিসেবে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল আজও একটি অনন্য নজির।
কেন গঠিত হয়েছিল স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল?
১৯৭১ সালের মার্চে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গণহত্যার পর লাখো মানুষ ভারতে আশ্রয় নেন। একই সময়ে মুক্তিযোদ্ধারা দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিরোধ গড়ে তুলছিলেন। যুদ্ধ চালিয়ে যেতে যেমন অস্ত্র ও প্রশিক্ষণের প্রয়োজন ছিল, তেমনি দরকার ছিল অর্থ এবং আন্তর্জাতিক সমর্থন।এই বাস্তবতা থেকেই জন্ম নেয় স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল। দলটির মূল লক্ষ্য ছিল—
- মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত সৃষ্টি করা।
- মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অর্থ সংগ্রহ করা।
- বিশ্বের সামনে বাংলাদেশের স্বাধীনতার দাবি তুলে ধরা।
- ক্রীড়াকে স্বাধীনতার আন্দোলনের একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা।
যেভাবে গঠিত হয় স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল
১৯৭১ সালের জুন মাসে মুজিবনগরে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের স্বাক্ষরিত চিঠির মাধ্যমে বিভিন্ন ফুটবলারকে মুজিবনগরে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
পরে আকাশবাণী কলকাতা থেকেও ঘোষণা প্রচার করা হয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থানরত ফুটবলাররা সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে মুজিবনগরে পৌঁছান। প্রায় ৪০ জন খেলোয়াড়ের মধ্য থেকে বাছাই করে গঠন করা হয় স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল।
দলের অধিনায়ক করা হয় মোহাম্মদ জাকারিয়া পিন্টুকে এবং সহ-অধিনায়ক হন প্রতাপ শংকর হাজরা। কোচ হিসেবে দায়িত্ব নেন কিংবদন্তি ননী বসাক এবং ম্যানেজার ছিলেন তানভীর মাজহারুল ইসলাম তান্না।
ইতিহাসের সাক্ষী: ২৫ জুলাই ১৯৭১
১৯৭১ সালের ২৫ জুলাই বাংলাদেশের ক্রীড়া ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় দিন। ভারতের নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগর স্টেডিয়ামে নদীয়া জেলা ক্রীড়া সমিতির বিপক্ষে ঐতিহাসিক প্রীতি ম্যাচে মাঠে নেমেছিল স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল।
ম্যাচটি ২-২ গোলে ড্র হলেও, বিশ্বমঞ্চে এটি ছিল এক অভাবনীয় বার্তা। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের পক্ষে সেদিন গোল করেছিলেন শাহজাহান ও এনায়েত। প্রায় ২০-২৫ হাজার দর্শকের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এই ম্যাচে বাংলাদেশ দলের দাবি ছিল—মাঠে ভারতের পতাকার পাশাপাশি বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা উড়বে এবং জাতীয় সংগীত বাজবে।
তখনো ভারত বাংলাদেশকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি না দিলেও, খেলোয়াড় ও কর্মকর্তাদের অদম্য পীড়াপীড়িতে জেলা প্রশাসক দীপক কান্তি ঘোষ অনুমতি দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। অধিনায়ক মো. জাকারিয়া পিন্টু ও সহ-অধিনায়ক প্রতাপ শঙ্কর হাজরার নেতৃত্বে বাংলাদেশের পতাকা হাতে সেই মাঠ প্রদক্ষিণ ছিল এক গৌরবময় মুহূর্ত।
দলের নেপথ্য কারিগর ও সংগঠক
স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল আকাশ থেকে পড়েনি; বরং এর পেছনে ছিল একদল নিবেদিতপ্রাণ সংগঠকের অক্লান্ত পরিশ্রম।
- সাইদুর রহমান প্যাটেল (উদ্যোক্তা): স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের মূল উদ্যোক্তা ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা সাইদুর রহমান প্যাটেল। ১৯৫১ সালে জন্ম নেওয়া এই গুণী মানুষটি তরুণ বয়স থেকেই রাজনীতি ও ফুটবলের সাথে জড়িত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠন ও তহবিল সংগ্রহের লক্ষ্যে তিনি এই দলকে সংগঠিত করেছিলেন। তাঁর প্রচেষ্টায় ভারতের বিভিন্ন স্থানে খেলা ১৬টি ম্যাচ থেকে সংগৃহীত ৫ লাখ রুপি মুক্তিযুদ্ধের তহবিলে জমা দেওয়া হয়েছিল। ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট তিনি আমাদের ছেড়ে চিরতরে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান।
- তানভীর মাজহারুল ইসলাম তান্না (ম্যানেজার): সত্তর দশকের তারকা ক্রিকেটার ও শেখ কামালের ঘনিষ্ঠ বন্ধু তানভীর মাজহারুল ইসলাম তান্না ছিলেন এই দলের ম্যানেজার। পরবর্তী জীবনে তিনি আবাহনী ক্রীড়া চক্র ও বিসিবির মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে সফল সংগঠক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
- ননী বসাক (কোচ): কিংবদন্তি কোচ ননী বসাক ছিলেন এই দলের প্রাণশক্তি। ১৯৫০-এর দশকে রেফারি হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করা এই মানুষটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় খেলোয়াড়দের সুশৃঙ্খলভাবে প্রস্তুত করেছিলেন। ১৯৯৬ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
দলের গর্বিত খেলোয়াড়দের কথা (পর্ব-১)
স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের প্রতিটি খেলোয়াড় ছিলেন এক একজন বীর। তাঁদের সাহসিকতায় বাঙালি জাতি বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পেয়েছিল।
- মো. জাকারিয়া পিন্টু (অধিনায়ক)
মোহাম্মদ জাকারিয়া পিন্টু ছিলেন স্বাধীণ বাংলা ফুটবল দল এবং স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় ফুটবল দলের অধিনায়ক। জন্ম: ১লা জানুয়ারি ১৯৪৩ নওগাঁয় জন্ম। ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ১৬টি ম্যাচে অংশ নিয়েছিল এবং ১২টিতে জয়লাভ করেছিলো যার অধিনায়ক ছিলেন তিনি।
স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় ফুটবল দলকেও নেতৃত্ব দেন জাকারিয়া পিন্টু। তাঁর অধিনায়কত্বে ১৯৭৩ সালে মালয়েশিয়ার মারদেকা কাপে অংশ নেয় বাংলাদেশ।অধিনায়কত্বের বাইরে একজন ডিফেন্ডার হিসেবেও বাংলাদেশের ফুটবলে বিশেষ স্থান আছে জাকারিয়া পিন্টুর।
এই তারকা ফুটবলার সংগঠক হিসেবে জড়িত ছিলেন মোহামেডানের সঙ্গে। বাংলাদেশের ফুটবলের প্রথম অধিনায়ক ৮১ বছর বয়সে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ১৮ নভেম্বর ২০২৪ সালে ইন্তেকাল করেন বাংলার এই বীর মুক্তিযোদ্ধা ফুটবলার। আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।
- প্রতাপ শংকর হাজরা (সহ-অধিনায়ক)
স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলেল সহ-অধিনায়কসহ-অধিনায়ক ছিলেন প্রতাপ শংকর হাজরা। জন্ম ১৯৪৩ সালের ৩ এপ্রিল মুন্সিগঞ্জ জেলার শ্রীনগর উপজেলায়। প্রতাপ শংকর হাজরা বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দল ও জাতীয় হকি দলের প্রতিনিধিত্ব করার গর্বিত একজন সদস্য। তাঁর শৈশবের পুরোটা ঢাকার আরমানিটোলায় কাটান।
১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী আরমানিটোলায় তাদের বাড়ি পুড়িয়ে দিয়ে ছিলো। ১৯৬১ সালে জগন্নাথ কলেজের প্রতিনিধিত্ব করে আন্তঃকলেজ ফুটবল খেলা শুরু করেন এবং একই বছর ঢাকা প্রথম বিভাগ লীগে ভিক্টোরিয়া এসসিতে যোগ দেন। ১৯৬৩ সালে, প্রতাপ মোহামেডান এসসি-তে যোগ দেন , যেখানে তিনি ১৯৭৭ সালে অবসর গ্রহণের আগ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।
লেফট উইঙ্গার হিসেবে খেলে ছয়বার ঢাকা লীগ, দুবার আগা খান গোল্ড কাপ এবং স্বাধীনতা দিবস কাপ এবং একবার মোহাম্মদ আলী বগুড়া শিল্ড জিতেছিলেন। কোটিং ক্যারিয়েও সফল একজন তিনি। ১৯৮২ থেকে ১৯৮৪ এবং আবার ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত মোহামেডান এসসি ফিল্ড হকি দলের কোচ ছিলেন, এই সময়কালে তিনি পাঁচবার প্রথম বিভাগ হকি লীগ জিতেছিলেন।
- কাজী সালাহউদ্দিন
কাজী মোহাম্মদ সালাহউদ্দীন ছিলেন বাংলাদেশের ফুটবলের সবচেয়ে জনপ্রিয় তারকা এবং তাকে বলা হয় বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ স্টাইকার। জন্ম: ২৩ সেপ্টেম্বর ১৯৫৩ ঢাকাতে। নিজ জেলা ফরিদপুর। ১৯৬৮ সালে, দিলকুশা ক্লাবের যুব পর্যায়ের হয়ে খেলার মাধ্যমে সালাহউদ্দীন ফুটবল জগতে প্রবেশ করেছিলেন।
এক মৌসুমের জন্য ঢাকা মোহামেডানেও খেলেছিলেন। তারপরের পুরোটাই তার ঢাকা আবাহানীরে সাথে। যেখানে তিনি ৪৩ ম্যাচে ৪০টি গোল করেছিলেন। পরবর্তীকালে, ১৯৭৫–৭৬ মৌসুমে, তিনি হংকংয়ের ক্লাব ক্যারোলাইন হিলে যোগদান করার মাধ্যমে প্রথম বাংলাদেশী ফুটবলার হিসেবে দেশের বাইরে পেশাদার লীগে খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন।
সেখানে তিনি ১৮ ম্যাচে অংশগ্রহণ করেছিলেন। সর্বশেষ ১৯৭৬–৭৭ মৌসুমে, তিনি ক্যারোলাইন হিল হতে বাংলাদেশী ক্লাব ঢাকা আবাহনীতে যোগদান করেছিলেন; ঢাকা আবাহনীর হয়ে ৮ মৌসুম খেলার পর তিনি অবসর গ্রহণ করেছিলেন।
খেলোয়াড়ি জীবনের ইতি টানার পর ১৯৮৫ সালে, সালাহউদ্দীন বাংলাদেশী ফুটবল ক্লাব ঢাকা আবাহনীর ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করার মাধ্যমে ম্যানেজার হিসেবে ফুটবল জগতে অভিষেক করেন। তিনি সর্বশেষ বাংলাদেশের ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। অর্জন করেছেন দেশি বিদেশে হাজারো পুরস্কার সম্মাননা।
- একেএম নওশেরুজ্জামান
একেএম নওশেরুজ্জামান ৫ ডিসেম্বর ১৯৫০ মুন্সিগঞ্জ জেলায়। নিজ জেলা চাঁদপুর। ছিলেন স্বাধীন বাংলা ফটবল দল এবং বাংলাদেশ প্রথম জাতীয় দলেল গর্বিত সদস্য। ১৯৭৩ সালে সিংগাপুরের সাথে প্রাতি ম্যাচে গোল করে হয়ে আছেন স্মরনীয়। কারন ঐ ম্যাচটাই ছিলো বাংলাদেশে প্রথম আর্ন্তজাতিক ম্যাচ জয়।
খেলতেন স্ট্রাইকার এবং লেফট উইঙ্গার প্রজিশনে। ক্লাব পর্যায়ে থাকাকালীন, তার সেরা মৌসুম ছিল ১৯৭৫ সালে মোহামেডান এসসি-র হয়ে। যেবার তিনি ২১ গোল করে প্রথম বিভাগ লীগের শীর্ষস্থানীয় খেলোয়াড় হন। একজন ক্রিকেটারও ছিলেন ফুটবল অফ সিজনে খেলতেন মোহমেডানের হয়ে। এই কৃর্তিমান বীর মুক্তিযোদ্ধা ২০২০ সালে ২১ নভেম্বর মাত্র ৭০ বছর বয়সে কোভিড-১৯ দ্বারা আক্রান্ত হয়ে মারা যান । তাঁর প্রতি আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।
স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল: ইতিহাসের অমর এক অধ্যায়
স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল শুধু একটি ফুটবল দল ছিল না; এটি ছিল স্বাধীনতার স্বপ্নে বিভোর একটি জাতির প্রতীক। ২৫ জুলাই ১৯৭১ কৃষ্ণনগর স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত প্রথম ম্যাচটি বাংলাদেশের ক্রীড়া ইতিহাসকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়।
সেদিন ফুটবলের মাঠে যে পতাকা উড়েছিল, সেটিই ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন, সাহস ও আত্মমর্যাদার প্রতীক। পর্ব–২-এ থাকছে: স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের দলের গর্বিত ফুটবলারদের জীবন, অবদান ও মুক্তিযুদ্ধের অজানা ইতিহাস।
