গেরুয়া বসন গায়ে, একতারা হাতে, গভীর তন্ময়তায় যখন কেউ লালন সাঁইয়ের গান ধরেন, তখন সময় যেন থমকে দাঁড়ায়। বাংলার লোকসংস্কৃতির সেই পরিচিত দৃশ্যের একটি নাম বাউল পাগলা বাবুল। কিন্তু তাঁর পরিচয় শুধু একজন বাউল শিল্পীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি একাধারে বীর মুক্তিযোদ্ধা, লালন সাধক এবং একজন সংস্কৃতিকর্মী, যাঁর জীবন ও গান নিয়ে কবিতা লিখেছেন স্বয়ং কবি শামসুর রাহমান। আজকের লেখায় থাকছে তাঁর জীবনের গল্প, তাঁর সাধনার পথ, এবং তাঁর কণ্ঠে উঠে আসা লালন সাঁইজির অমর বাণী।
হাফিজুর রহমান বাবুল থেকে ‘পাগলা বাবুল’
তাঁর প্রকৃত নাম হাফিজুর রহমান বাবুল। কিন্তু এই নামে তাঁকে চেনেন খুব কম মানুষই—কারণ বাংলার লোকমুখে, সংস্কৃতির অঙ্গনে, এমনকি সংগীতের দুনিয়াতেও তিনি পরিচিত এক ভিন্ন নামে: পাগলা বাবুল। এই নামের জন্মকথাও বেশ মমতাময়। ছোট্টবেলায়, যখন তিনি সবে হাঁটতে শিখছেন, দুরন্তপনায় মেতে থাকেন সারাদিন, তখন তাঁর দাদি আদর করে তাঁকে ডাকতেন ‘পাগলা’। শিশুদের এমন আদুরে ডাকনাম অনেকেরই থাকে, কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বড় হওয়ার সাথে সাথে তা হারিয়ে যায় আসল নামের আড়ালে। হাফিজুর রহমান বাবুলের ক্ষেত্রে ঘটল উল্টোটা।
দাদির সেই সোহাগের ডাকনামই একদিন হয়ে উঠল তাঁর পরিচয়ের সবচেয়ে বড় অংশ। বড় হয়ে যখন তিনি বাউল সাধনার পথে পা বাড়ালেন, লালনগীতির সুরে নিজেকে সঁপে দিলেন, তখন সেই ‘পাগলা’ শব্দটিই যেন হয়ে উঠল তাঁর সাধক-সত্তার এক নিখুঁত প্রতীক। বাউল দর্শনে ‘পাগল’ শব্দটি নেতিবাচক কিছু নয় বরং এটি এক গভীর আধ্যাত্মিক অবস্থার ইঙ্গিত দেয়, যেখানে সাধক জাগতিক মোহ-মায়ার বাইরে গিয়ে সত্যের সন্ধানে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে বিলিয়ে দেন। লালন সাঁই নিজেও তাঁর গানে বারবার ‘পাগল’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন এমনই এক রূপক অর্থে। হাফিজুর রহমান তাই যখন ‘পাগলা বাবুল’ নামে পরিচিতি পেলেন, তখন তা যেন কাকতালীয়ভাবে হয়ে উঠল তাঁর ভবিষ্যৎ সাধক-জীবনের এক পূর্বাভাস। কালক্রমে এই নামেই তিনি বাংলার বাউল-সংগীতাঙ্গনে সমাদৃত হয়ে ওঠেন, আর ‘হাফিজুর রহমান বাবুল’ নামটি রয়ে যায় শুধু সরকারি কাগজপত্রেই সীমাবদ্ধ।
মুক্তিযুদ্ধের ময়দানে এক তরুণ
১৯৭১ সাল। বাংলাদেশ তখন এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে স্বাধীনতার জন্য প্রাণপণ লড়াই করছে গোটা জাতি। দেশের প্রতিটি প্রান্তে তখন যুদ্ধের দামামা, ঘরে ঘরে উৎকণ্ঠা, আর তরুণ প্রজন্মের বুকে জ্বলছে মুক্তির আগুন। ঠিক এই সময়েই এক তরুণ, হাফিজুর রহমান বাবুল, সিদ্ধান্ত নেন দেশের জন্য অস্ত্র তুলে নেওয়ার। তবে এই সিদ্ধান্তের পেছনে সবচেয়ে বড় প্রেরণা ছিলেন তাঁর মা। মায়ের কথাতেই তিনি নাম লেখান মুক্তিবাহিনীতে—যে মুহূর্তটি পরবর্তীতে তাঁর গোটা জীবনের গতিপথ বদলে দেবে। মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেওয়ার পর তিনি সরাসরি অংশ নেন ৮ নম্বর সেক্টরের যুদ্ধে, যে সেক্টরটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রণাঙ্গন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে, দিনের পর দিন সম্মুখসমরে থেকে তিনি লড়াই করেছেন দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য।
অস্ত্র হাতে সেই সংগ্রামের অভিজ্ঞতা মৃত্যুভয়, সহযোদ্ধাদের আত্মত্যাগ, আর স্বাধীনতার জন্য নিরন্তর প্রতীক্ষা তাঁর মনোজগতে গভীর ছাপ ফেলে যায়। যুদ্ধ মানুষকে যেমন ভাঙে, তেমনি কখনো কখনো এক নতুন উপলব্ধির দিকেও ঠেলে দেয়। হাফিজুর রহমান বাবুলের ক্ষেত্রেও তা-ই ঘটেছিল বলে মনে করা হয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর, রণাঙ্গনের সেই বীর মুক্তিযোদ্ধা অস্ত্র রেখে দেন। কিন্তু তাঁর ভেতরের সংগ্রাম তখনও শেষ হয়নি শুধু তার রূপ বদলেছে মাত্র। জাগতিক যুদ্ধ জয়ের পর তিনি এবার মনোনিবেশ করেন এক ভিন্ন ধরনের সাধনায়—আত্মার মুক্তির সন্ধানে। অস্ত্রের বদলে হাতে তুলে নেন একতারা, আর শুরু করেন এক নতুন যাত্রা, যেখানে যুদ্ধক্ষেত্রের বীরত্ব রূপান্তরিত হয় আধ্যাত্মিক সাধকের নিষ্ঠায়।
লালনগানের পথে: কুষ্টিয়ায় যাত্রা
মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী জীবনে হাফিজুর রহমান বাবুলের অন্তরে জেগে ওঠে এক গভীর আধ্যাত্মিক তাড়না। আর এই তাড়নার পথপ্রদর্শকও ছিলেন তাঁর মা। মায়ের প্রেরণাতেই তিনি সিদ্ধান্ত নেন লালনগান শেখার, আর সেই লক্ষ্যেই পাড়ি জমান কুষ্টিয়ায় বাউল সম্রাট লালন সাঁইয়ের আখড়াবাড়ির শহরে, যা যুগ যুগ ধরে বাউল সাধকদের কাছে এক তীর্থস্থান হিসেবে বিবেচিত। কুষ্টিয়ায় পৌঁছে তিনি সান্নিধ্য লাভ করেন ফকির সাধক সাধু গুরু খোদা বক্স শাহের। বাউল ঐতিহ্যে গুরু-শিষ্য পরম্পরার গুরুত্ব অপরিসীম এখানে জ্ঞান কেবল বইপত্র থেকে অর্জিত হয় না, বরং গুরুর সান্নিধ্যে থেকে, তাঁর জীবনযাপন পর্যবেক্ষণ করে, তাঁর কণ্ঠের সুর অনুসরণ করে ধীরে ধীরে আত্মস্থ করতে হয়। খোদা বক্স শাহের কাছে থেকে হাফিজুর রহমান বাবুল শুধু গানের সুরই শেখেননি, শিখেছেন লালন সাঁইয়ের গানের অন্তর্নিহিত দর্শনও দেহতত্ত্ব, মনের মানুষের সন্ধান, মানবতাবাদ, আর জাত-পাত-ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষকে ভালোবাসার শিক্ষা।
এই দীর্ঘ সাধনা আর সান্নিধ্যের মধ্য দিয়েই ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে তাঁর বাউল-দর্শনের মজবুত ভিত্তি। এটি ছিল কোনো এক রাতারাতি রূপান্তর নয়, বরং একজন প্রাক্তন মুক্তিযোদ্ধার দীর্ঘ, নিষ্ঠাপূর্ণ আত্মঅনুসন্ধানের ফসল। কুষ্টিয়ায় অর্জিত এই শিক্ষা ও দর্শনই পরবর্তী জীবনে তাঁর গানে, তাঁর মঞ্চ-পরিবেশনায়, এমনকি তাঁর ব্যক্তিগত জীবনযাপনেও প্রতিফলিত হতে থাকে—যা তাঁকে শুধু একজন শিল্পী নয়, একজন প্রকৃত সাধকে পরিণত করে।
শিল্পীজীবনের মাইলফলক
পাগলা বাবুলের শিল্পীজীবনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ধাপ:
- ১৯৮৯ সাল - বাংলাদেশ বেতারে প্রথমবারের মতো সম্প্রচারিত হয় তাঁর গান।
- ১৯৯৭ সাল - প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম অ্যালবাম ‘পঞ্চম’।
- ১৯৯৮ সাল - তিনি অর্জন করেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর মেন্টর ফেলোশিপ ইন মিউজিক।
- ২০০১ সাল - প্রকাশ পায় তাঁর অ্যালবাম ‘কি যাদু বাংলা গানে’।
- সর্বশেষ প্রকাশিত হয় তাঁর অ্যালবাম ‘পাগলা বাবুলের লালনমেলা’।
শামসুর রাহমানের কবিতায়-পাগলা বাবুলের গান
‘পাগলা বাবুলের গান’ কবিতাটি শামসুর রহমানের ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত ‘সৌন্দর্য আমার ঘরে’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত। কবিতাটির বিষয়বস্তু হলো প্রখ্যাত বাউলশিল্পী পাগলা বাবুল (ফরিদপুরের আবদুল করিম) এবং তাঁর গানের পরিবেশনা। কবি এখানে পাগলা বাবুলের গানের আসর, তাঁর গেরুয়া বসন, একতারার সুর, এবং গান শুনতে জড়ো হওয়া মানুষের চিত্র এঁকেছেন।
তবে এর চেয়েও বড় বিষয় হলো কবি কীভাবে এই গানের মধ্য দিয়ে নিজের শৈশব-গ্রাম ও হারিয়ে যাওয়া সময়ের মুখোমুখি হন। পাগলা বাবুলের গান তাঁর কাছে শুধু বিনোদন নয়, বরং একধরনের আত্মানুসন্ধান ও আবেগের মুক্তির মাধ্যম। কবিতাটি ভাষায় সরল, কিন্তু আবেগে গভীর যা বাউল দর্শনের মতোই অন্তর্দীপক।
গেরুয়া বসনধারী পাগলা বাবুল
যখন বাউল গান গায় গভীর তন্ময়তায়
একতারা বাজিয়ে, আঙুলে
ফুটিয়ে সুরের বনফুল
নেচে-নেচে, ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে
পাগড়ি-বাঁধা মাথা
ছেঁউড়িয়া, ফরিদপুরের গঞ্জ-গ্রামে,
শহর ঢাকার শিল্পকলা একাডেমি
আর রমনার বটমূলে
আবার লালন সাঁই আসরে নামের পুরোদমে।
পাগলা বাবুল গলা ছেড়ে গান গাইলেই আমার অন্তরে
দীঘির বৈকালী ঘাটে গ্রাম্য বধূটির
কলস ভাসানো,
নতুন শস্যের ঘ্রাণ, ক্ষেতের আইল,
পথের রঙিন ধুলো, নিঃসঙ্গ লোকের পথ হাঁটা,
ডুরে শাড়ি-পরা কিশোরীর কাঁচা আম খাওয়া,
ভাসমান নৌকা আর ঘুঘুর উদাস
ডাক জেগে ওঠে। মনে হয়,
নিঝুম মহীন শাহ ভরা নদীর ধরনে মাথা নাড়ছেন।
এবং পাগলা বাবুলের একতারা
যখন সুনীল আকাশকে ছুঁতে চায়,
ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে মাথা আর নেচে-নেচে
যখন সে অগণন মানুষের মাঝে মানুষের গান গায়
আমি শুদ্ধ আলোর ভিতরে যাত্রা করি।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শুদ্ধ লালন চর্চার আসর
পাগলা বাবুলের একমাত্র স্বপ্ন ছিল শুদ্ধ লালন চর্চার বিকাশ। এক সময় প্রতি বৃহস্পতিবার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ভেসে বেড়াত লালন সাঁইজির গানের সুর তাঁরই প্রতিষ্ঠিত লালন চর্চা কেন্দ্রের উদ্যোগে আয়োজিত হতো এই আসর। সেখানে মানুষ শুধু গান শুনতে আসতেন না, হাতে-কলমে শিখতেন লালন সাঁইজির গানের তালিম মর্ম বোঝা, সুর ধরা, আর নিজের মধ্যে সাঁইয়ের বাণী ধারণ করা। উদ্যানের সবুজ ঘাসে বসে তৈরি হতো এক নিরহংকার ভাবের আসর, যেখানে ছিল না কোনো অভিজাত্যের বেড়াজাল শুধু ছিল সুর আর মনের মিলন। এই চর্চাকেন্দ্র মানুষকে শুধু গান শেখায়নি, শিখিয়েছে জীবনদর্শন: লালনের ‘মনের মানুষ’-এর খোঁজ, শরীর-মন-আত্মার সমন্বয়। আজ হয়তো সেই আয়োজন আর নেই, কিন্তু যাঁরা সেই সময়ের সাক্ষী ছিলেন, তাঁদের স্মৃতিতে তা আজও পূর্ণিমার রাতের শিহরিত বাতাসের মতো বেজে ওঠে।
তিন পাগলে হলো মেলা নদেয় এসে
তিন পাগলে হলো মেলা নদেয় এসে
তোরা কেউ যাসনে ও পাগলের কাছে
একটা পাগলামি করে
জাত দেয় সে অজাতেরে দৌড়ে গিয়ে
আবার হরি বলে পড়ছে ঢলে ধূলার মাঝে
একটা নারকেলের মালা
তাতে জল তোলা ফেলা করঙ্গ সে
পাগলের সঙ্গে যাবি পাগল হবি বুঝবি শেষে
পাগলের নামটি এমন
বলিতে ফকির লালন হয় তরাসে
অদ্বৈ নিতৈই চৈতে পাগল নাম ধরেছে।
ধাক্কায় যেনো যাসনে চটে ফেটে- কে যাবি গৌর প্রেমের ঘাটে
কে যাবি গৌর প্রেমের ঘাটে,
ধাক্কায় যেন যাসনে চটে ফেটে
প্রেম যমুনার তরঙ্গ বাড়ি
ধাক্কা লাগে ব্রহ্মপুরী
চতুরলী থাকলে বল
প্রেম যাজনে বাধবে কলহ
হারিয়ে শেষে দুটো কুলোও
কাঁদাকাঁটি পথে ঘাটে
কর্মযোগে ধর্ম তারই,
কারো বেঁচে ওঠে
আগে দুঃখ পরে সুখ
সয়ে বয়ে যদি কেউ রয়
ফকির লালন বলে প্রেম পরশ পায়
সামান্য জ্ঞানে কি তাই ঘাটে।
আমার ঘর খানায় বিরাজ করে
ও আমি জনম ভরে একদিনও না
আমি দেখলাম তারে
আমার ঘর খানায় কে বিরাজ করে
নড়েচড়ে ঈশানকোণে
দেখতে পাইনে এই নয়নে
হাতের কাছে যার ভবের হাট বাজার
ধরতে গেলে হাতে পাইনে তারে
সবে বলে প্রাণপাখি
শুনে চুপে চেপে রাখি
জল কি হুতাশন মাটি কি পবন
কেউ বলে না একটা নির্ণয় করে
আপন ঘরের খবর হয়না
বাঞ্চা করি পরকে চেনা
লালনও বলে পর বলতে পরমেশ্বর
সে কি রূপ আমি কি রূপ রে
দেখ না মন ঝাকমারি এই দুনিয়াদারি
পরিয়ে কৌপনি ধ্বজা
কি মজা উড়ালো ফকিরী
দেখ না মন ঝাকমারি
এই দুনিয়াদারি
যা করো তাই করো রে মন
পিছের কথা রেখ স্মরণ বরাবরই
তোমার সাথে সাথে ফিরছে শমন
কখন হাতে দেবে দড়ি
দরদের ভাই বন্ধুজনা
মরলে সঙ্গে কেউ যাবেনা মন তোমারই
তোমায় খালি হাতে একা পথে রে
বিদায় করে দেবে তরী
বড় আশার বাসা এ ঘর
পড়ে রবে কোথায় আবার
ঠিক নাই তারই
দরবেশ সিরাজ সাঁই কয় লালন ভেঁড়োরে
হোস নে কারো ইন্তেজারি।
কারে দিব দোষ নাহি পরের দোষ
কারে দিব দোষ নাহি পরের দোষ
আপন মনের দোষে আমি পলাম রে ফেরে
আমার মন যদি বুঝিত, লোভের দেশ ছাড়িত
লয়ে যেত আমায় বিরজা পারে
মনের গুণে কেউ হলো মহাজন
ব্যাপার করে পেল অমূল্য রতন
আমারে মজালি ওরে অবোধ মন
পারের সম্বল কিছু রাখলাম না রে
অন্তিম কালের কালে কিনা জানি হয়
একদিন ভাবলি না অবোধ মনরায়
মনে ভেবেছ এ দিন এমনি বুঝি যায়
জানা যাবে যেদিন শমনে ধরে
কামে চিত্ত হত মন রে আমার
সুধা ত্যেজে গরল খাই বেসুমার
দরবেশ সিরাজ সাঁই কয় লালন তোমার
ভগ্নদশা ঘটল আখেরে
সদাই বলরে মন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ
সদাই বলরে মন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ
আইন ভেজিলেন রাসুলুল্লাহ
সদাই বলরে মন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ
লা ইলাহা নফি যে হয়
ইল্লালাহ সেই দ্বীন দয়াময়
নফি এজবাত ইহারে কয়
এহি তো এবাদতুল্লাহ
নামের সহিত রূপ
ধিয়ানে রাখিয়া জপো
বেনিশানায় যদি ডাকো
চিনবি কি রূপ কে আল্লাহ
লা শরিক জানিয়া তাকে
জপ কালাম দেলে মুখে
মুক্তি পাবি থাকবি সুখে
দেখবি রে নূর তাজেল্লা
বলেছেন সাঁই আল্লাহ নূরি
এই জেকেরের দরজা ভারি
সিরাজ সাঁই তাই কয় ফুকারি
শোন রে লালন বেলিল্লাহ
কে বানাইলো এমন রঙমহল খানা
কে বানাইলো এমন রঙমহল খানা
হাওয়া দমে দেখ তারে আসল বেনা
বিনা তেলে জ্বলে বাতি
দেখতে যেমন মুক্তা মতি
জলময় তার চতুর্ভিতি মধ্যে খানা
তিল পরিমাণ জায়গা সে যে
হদ্দরূপ তাহার মাঝে
কালায় শোনে আঁধলায় দেখে নেংড়ার নাচনা
যে গঠিল এ রঙমহল
না জানি তার রূপটি কেমন।
সিরাজ সাঁই কয় নাইরে লালন তার তুলনা
ধন্য ধন্য বলি তারে
ধন্য ধন্য বলি তারে
বেঁধেছে এমন ঘর
শূন্যের উপর পোস্তা করে
সবে মাত্র একটি খুঁটি
খুঁটির গোড়ায় নাইকো মাটি
কিসে ঘর রবে খাঁটি
ঝড়ি তুফান এলে পরে
মূলাধার কুঠুরি নয়টা
তার উপরে চিলেকোঠা
তাহে এক পাগলা বেটা
বসে একা একেশ্বরে
উপর নিচে সারি সারি
সাড়ে নয় দরজা তারি
লালন কয় যেতে পারি
কোন দরজা খুলে ঘরে
যার যার ধর্ম সেই সে করে
যার যা ধর্ম সেই সে করে
তোমার বলা অকারণ।।
কাঁটার মুখ কেউ চাঁছে না
ময়ূর চিত্র কেউ করে না।
এমনি মতে সব ঘটনা
যার যাতে আছে সৃজন।।
চিন্তামণি পদ্মিনী নারী
এরাই পতিসেবার অধিকারী।
হস্তিনী শঙ্খিনী নারী
তারা কর্কশ ভাষায় কয় বচন।।
শশক পুরুষ সত্যবাদী
মৃগপুরুষ উর্ধ্ধভেদী।
অশ্ব বৃষ বেহুশ নিরবধি
তাদের কুকর্মেতে সদাই মন।।
ধর্ম কর্ম আপনার মন
করে ধর্ম সব মোমিনগণ।
লালন বলে ধর্মের করণ
প্রাপ্তি হবে নিরঞ্জন।।
খাঁচার ভিতর অচিন পাখি
আট কুঠুরী নয় দরজা আঁটা
মধ্যে মধ্যে ঝরকা কাঁটা
তার উপরে সদর কোঠা
আয়নামহল তায়
কেমনে আসে যায়
খাঁচার ভিতর অচিন পাখি
কেমনে আসে যায়।
শুদ্ধ সুর ও মানবতার পাঠশালা
হাফিজুর রহমান বাবুল থেকে বাউল পাগলা বাবুল হয়ে ওঠার এই যাত্রা আসলে এক অনন্য রূপান্তরের গল্প। ১৯৭১ সালে যিনি অস্ত্র হাতে ৮ নম্বর সেক্টরের রণাঙ্গনে দেশ রক্ষা করেছেন, স্বাধীনতার পর সেই বীর মুক্তিযোদ্ধাই মায়ের আদেশে একতারা হাতে তুলে নিয়েছেন মানুষের আত্মার মুক্তির পথ খুঁজতে। তাঁর কণ্ঠে লালন সাঁইয়ের বাণী কেবল গান নয়, বরং এক আধ্যাত্মিক সাধনা হিসেবে ধ্বনিত হয়। কবি শামসুর রাহমান তাঁর কবিতায় এই সাধকের যে ছবি এঁকেছেন, তাতেই স্পষ্ট হয় বাংলার শিল্প-সংস্কৃতিতে তাঁর গুরুত্ব। বিশ্বায়নের জোয়ারে যখন আমরা নিজেদের শেকড় হারাতে বসেছি, তখন পাগলা বাবুলের মতো সাধকদের জীবনদর্শন আমাদের নতুন করে মানুষ হওয়ার শিক্ষা দেয়। তাঁর প্রতিষ্ঠিত লালন চর্চা কেন্দ্র যেন চিরকাল শুদ্ধ সুর ও মানবতার আলো বিলিয়ে যায়—জাতির এই শ্রেষ্ঠ সন্তানের প্রতি রইলো গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।
FAQ: বাউল পাগলা বাবুল
প্রশ্ন: বাউল পাগলা বাবুল কে?
উত্তর: বাউল পাগলা বাবুল একজন লালন সাধক, বাউল শিল্পী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা।
প্রশ্ন: পাগলা বাবুলের আসল নাম কী?
উত্তর: তাঁর আসল নাম হাফিজুর রহমান বাবুল।
প্রশ্ন: কেন তাঁকে পাগলা বাবুল বলা হয়?
উত্তর: শৈশবে দাদির দেওয়া ‘পাগলা’ ডাকনাম থেকেই তিনি পাগলা বাবুল নামে পরিচিত হন।
প্রশ্ন: পাগলা বাবুল মুক্তিযুদ্ধে কোন সেক্টরে যুদ্ধ করেন?
উত্তর: তিনি ১৯৭১ সালে ৮ নম্বর সেক্টরে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন।
প্রশ্ন: পাগলা বাবুল কার কাছে লালনগানের শিক্ষা নেন?
উত্তর: তিনি সাধক খোদা বক্স শাহের সান্নিধ্যে লালনগান শেখেন।
প্রশ্ন: শামসুর রাহমানের কোন কবিতায় পাগলা বাবুলের কথা আছে?
উত্তর: ‘পাগলা বাবুলের গান’ কবিতায় তাঁর কথা উঠে এসেছে।
প্রশ্ন: পাগলা বাবুলের প্রথম অ্যালবামের নাম কী?
উত্তর: তাঁর প্রথম অ্যালবাম ছিল ‘পঞ্চম’ (১৯৯৭)।
প্রশ্ন: পাগলা বাবুলের গানের মূল বিষয় কী?
উত্তর: তাঁর গানে লালন দর্শন, মানবতা ও আত্মঅনুসন্ধানের কথা উঠে আসে।


