ভলিবল বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় ও রোমাঞ্চকর দলীয় খেলার একটি। দ্রুতগতির বল আদান-প্রদান, শক্তিশালী স্পাইক, নিখুঁত ব্লক এবং চমৎকার দলীয় সমন্বয়ের কারণে এই খেলাটি যেমন দর্শকদের মুগ্ধ করে, তেমনি খেলোয়াড়দের দক্ষতা, গতি ও শারীরিক সক্ষমতারও কঠিন পরীক্ষা নেয়। স্কুল-কলেজের মাঠ থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট, বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ এবং অলিম্পিকের মঞ্চ পর্যন্ত ভলিবল তার জনপ্রিয়তা ও আকর্ষণ ধরে রেখেছে।
তবে খেলার উত্তেজনার আড়ালে ভলিবলের ইতিহাস, নিয়ম-কানুন ও বিভিন্ন দিক সম্পর্কে অনেকেরই বিস্তারিত জানা নেই। ভলিবলের উদ্ভব কীভাবে হয়েছিল, একটি দলে কতজন খেলোয়াড় থাকে, কোর্টের মানক পরিমাপ কত, স্কোরিং পদ্ধতি কী, কিংবা অলিম্পিকে খেলাটি কখন থেকে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, এসব তথ্য জানলে খেলাটিকে আরও ভালোভাবে বোঝা যায়। এই লেখায় ভলিবলের ইতিহাস, মাঠ ও সরঞ্জাম, খেলার নিয়ম, খেলোয়াড়দের অবস্থান, কৌশল, বিচ ভলিবল, অলিম্পিক এবং বাংলাদেশে ভলিবলের পরিচিতি সহজ ও তথ্যবহুল ভাষায় তুলে ধরা হয়েছে।
ভলিবল কী?
ভলিবল একটি দলীয় খেলা, যেখানে দুটি দল নেট দিয়ে বিভক্ত মাঠের দুই পাশে অবস্থান করে। মূল লক্ষ্য হলো বলটি নেটের ওপর দিয়ে প্রতিপক্ষের কোর্টে পাঠানো, যাতে প্রতিপক্ষ বলটি নিয়মমতো ফিরিয়ে দিতে ব্যর্থ হয়। একই সঙ্গে নিজের কোর্টে বল মাটিতে পড়া ঠেকাতে হয়।
প্রচলিত ইনডোর ভলিবলে প্রতিটি দলে একসঙ্গে ছয়জন খেলোয়াড় মাঠে থাকেন। সাধারণত একটি দল সর্বোচ্চ তিনটি স্পর্শের মধ্যে বল প্রতিপক্ষের দিকে পাঠায়। ফুটবল বা ক্রিকেটের মতো এখানে বল নিয়ে দৌড়ানোর সুযোগ নেই; হাত, বাহু ও শরীরের বৈধ অংশ ব্যবহার করে বল নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। সঠিক পাস, সেট, স্পাইক ও ব্লকের সমন্বয়ই দলের সাফল্যের ভিত্তি।
ভলিবল খেলার ইতিহাস ও উৎপত্তি
ভলিবলের জন্ম কীভাবে?
ভলিবলের সূচনা হয় ১৮৯৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের হলিওক (Holyoke) শহরে। খেলাটির উদ্ভাবক উইলিয়াম জি. মরগ্যান (William G. Morgan), যিনি ইয়ং মেনস ক্রিশ্চিয়ান অ্যাসোসিয়েশন বা YMCA-র শারীরিক শিক্ষা পরিচালক ছিলেন।
মরগ্যান এমন একটি খেলা তৈরি করতে চেয়েছিলেন, যা বাস্কেটবলের তুলনায় কম শারীরিক সংঘর্ষনির্ভর হবে এবং বিভিন্ন বয়সের মানুষ স্বাচ্ছন্দ্যে খেলতে পারবেন। প্রথমে খেলাটির নাম ছিল মিন্টোনেট (Mintonette)। পরের বছর, ১৮৯৬ সালে, স্প্রিংফিল্ডে এক সম্মেলনে খেলাটির বল শূন্যে "ভলি" করার ধরন দেখে এর নাম বদলে ভলিবল রাখার প্রস্তাব আসে, এবং সেই নামই স্থায়ী হয়।
বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া
- প্রথমে YMCA-র বিভিন্ন কেন্দ্রের মাধ্যমে খেলাটি যুক্তরাষ্ট্রের নানা অঞ্চলে ছড়ায়। পরে উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা, এশিয়া ও ইউরোপে জনপ্রিয়তা পায়।
- ১৯৪৭: আন্তর্জাতিক ভলিবল ফেডারেশন (FIVB) প্রতিষ্ঠিত হয়।
- ১৯৪৯: পুরুষদের প্রথম বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ।
- ১৯৫২: নারীদের প্রথম বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ।
- ১৯৬৪: টোকিও অলিম্পিকে ইনডোর ভলিবল প্রথমবার পদকজয়ী খেলা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত।
- ১৯৯৬: আটলান্টা অলিম্পিকে বিচ ভলিবল পদকজয়ী খেলা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত।
ভলিবল খেলার মাঠের মাপ ও গঠন
আন্তর্জাতিক নিয়মে ইনডোর ভলিবল কোর্ট আয়তাকার। মাঠের মাঝখানে নেট থাকে, যা দুই দলকে আলাদা করে। আন্তর্জাতিক ভলিবল কোর্টের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, অ্যাটাক লাইনের দূরত্ব এবং পুরুষ ও নারীদের জন্য নির্ধারিত নেটের উচ্চতা এক নজরে দেখুন।
| বিষয় | পরিমাপ |
|---|---|
| মাঠের দৈর্ঘ্য | ১৮ মিটার |
| মাঠের প্রস্থ | ৯ মিটার |
| প্রতিটি দলের কোর্ট | ৯ × ৯ মিটার |
| অ্যাটাক লাইন | কেন্দ্ররেখা থেকে ৩ মিটার দূরে |
| সীমানা রেখার চওড়া | ৫ সেন্টিমিটার |
| পুরুষদের নেটের উচ্চতা | ২.৪৩ মিটার |
| নারীদের নেটের উচ্চতা | ২.২৪ মিটার |
দ্রষ্টব্য: নেটের উচ্চতা প্রাপ্তবয়স্কদের আন্তর্জাতিক ইনডোর ভলিবলের মান অনুযায়ী নির্ধারিত। বয়সভিত্তিক বা জুনিয়র প্রতিযোগিতায় নেটের উচ্চতা ভিন্ন হতে পারে।
ভলিবল খেলার সরঞ্জাম
- ভলিবল: নির্ধারিত আকার ও ওজনের বল। আন্তর্জাতিক ইনডোর ভলিবলে পরিধি ৬৫–৬৭ সেন্টিমিটার এবং ওজন ২৬০–২৮০ গ্রাম।
- নেট ও নেট পোস্ট: মাঠের মাঝখানে সঠিক উচ্চতায় নেট ধরে রাখে।
- খেলার জুতা: ভালো গ্রিপ ও দ্রুত চলাচলে সাহায্য করে।
- পোশাক: আরামদায়ক জার্সি ও শর্টস।
- হাঁটুর সুরক্ষা সরঞ্জাম: প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করা হয়।
ভলিবল খেলার নিয়ম
১. খেলোয়াড়ের সংখ্যা
ইনডোর ভলিবলে প্রতিটি দলে একসঙ্গে ছয়জন খেলোয়াড় মাঠে থাকেন। আক্রমণ, বল সেট করা, প্রতিপক্ষের আক্রমণ ঠেকানো ও রক্ষণ সামলানোর দায়িত্ব তাঁদের মধ্যে ভাগ করা থাকে।
২. সার্ভ দিয়ে খেলা শুরু
প্রতিটি র্যালি শুরু হয় সার্ভের মাধ্যমে। সার্ভকারী খেলোয়াড় নিজের কোর্টের পেছনের সার্ভিস জোন থেকে বল নেটের ওপর দিয়ে প্রতিপক্ষের কোর্টে পাঠান। সার্ভ করা বল নেট ছুঁয়ে প্রতিপক্ষের কোর্টে পড়লেও বর্তমান নিয়মে তা বৈধ। তবে সার্ভের সময় নির্ধারিত নিয়ম ভাঙলে প্রতিপক্ষ পয়েন্ট পায়।
৩. সর্বোচ্চ তিনটি স্পর্শ
একটি দল বল ফেরত দেওয়ার আগে সাধারণত সর্বোচ্চ তিনবার বল স্পর্শ করতে পারে। প্রচলিত আক্রমণের ধাপ:
- পাস: প্রতিপক্ষের সার্ভ বা আক্রমণ গ্রহণ করা।
- সেট: আক্রমণকারীর জন্য বল উপযুক্ত অবস্থানে তুলে দেওয়া।
- স্পাইক: জোরে আঘাত করে বল প্রতিপক্ষের কোর্টে পাঠানো।
তিনটি স্পর্শ বাধ্যতামূলক নয়; এক বা দুই স্পর্শেও বল ফেরত দেওয়া যায়। ব্লক স্পর্শের ক্ষেত্রে আলাদা নিয়ম প্রযোজ্য, ব্লকের পর দলটি আরও তিনটি স্পর্শের সুযোগ পায়। একই খেলোয়াড় টানা দুইবার বল স্পর্শ করতে পারেন না (ব্লকের পর ছাড়া)।
৪. পয়েন্ট কীভাবে পাওয়া যায়?
আধুনিক ইনডোর ভলিবলে র্যালি পয়েন্ট সিস্টেম চালু আছে (FIVB এটি ১৯৯৯ সালে সব সেটের জন্য চালু করে)। অর্থাৎ যে দল র্যালি জেতে, সেই দলই পয়েন্ট পায়- সার্ভ তারা করুক বা না করুক। সাধারণত নিচের পরিস্থিতিতে পয়েন্ট মেলে:
- বল প্রতিপক্ষের কোর্টের ভেতরে মাটিতে পড়লে।
- প্রতিপক্ষ বল বৈধভাবে ফেরত দিতে ব্যর্থ হলে।
- প্রতিপক্ষ বল বাইরে পাঠালে।
- প্রতিপক্ষ নিয়ম ভঙ্গ করলে।
৫. একটি ম্যাচে কয়টি সেট থাকে?
আন্তর্জাতিক ইনডোর ভলিবলে ম্যাচ সর্বোচ্চ পাঁচ সেটের হয়। যে দল প্রথম তিনটি সেট জেতে, সেই দল ম্যাচ জেতে।| সেট | প্রয়োজনীয় পয়েন্ট |
|---|---|
| প্রথম থেকে চতুর্থ সেট | ২৫ পয়েন্ট |
| পঞ্চম বা নির্ণায়ক সেট | ১৫ পয়েন্ট |
সব সেটেই অন্তত দুই পয়েন্টের ব্যবধান লাগে। ফলে স্কোর ২৫–২৪ বা ১৫–১৪ হলে সেট শেষ হয় না; দুই পয়েন্টের ব্যবধান না হওয়া পর্যন্ত খেলা চলতে থাকে।
৬. রোটেশন বা অবস্থান পরিবর্তন
যে দল প্রতিপক্ষের কাছ থেকে সার্ভ করার অধিকার জিতে নেয়, সেই দলের খেলোয়াড়েরা নির্ধারিত নিয়মে ঘড়ির কাঁটার দিকে এক অবস্থান ঘুরে যান। একে রোটেশন বলে। এর ফলে খেলোয়াড়েরা পর্যায়ক্রমে সামনের ও পেছনের সারিতে খেলেন।
৭. নেট স্পর্শ ও অন্যান্য ফাউল
নেট স্পর্শ, কেন্দ্ররেখা অতিক্রম, ভুল রোটেশন, অবৈধ আক্রমণ বা তিন স্পর্শের বেশি বল ছোঁয়ার মতো ঘটনায় ফাউলের নিয়ম প্রযোজ্য। তবে নেটের যেকোনো স্পর্শই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফাউল নয়; খেলায় হস্তক্ষেপ হয়েছে কি না দেখে রেফারি সিদ্ধান্ত দেন।ভলিবল খেলোয়াড়দের পজিশন ও দায়িত্ব
ছয়জন খেলোয়াড়ের তিনজন সামনের সারিতে এবং তিনজন পেছনের সারিতে থাকেন। কৌশল ও পরিস্থিতি অনুযায়ী দায়িত্ব বদলাতে পারে।
- সেটার (Setter): দলের আক্রমণ সাজানোর প্রধান খেলোয়াড়। পাস পাওয়া বল আক্রমণকারীর জন্য উপযুক্ত উচ্চতা ও অবস্থানে তুলে দেন। ফুটবলের প্লেমেকারের সঙ্গে কিছুটা তুলনা করা যায়।
- আউটসাইড হিটার (Outside Hitter): সাধারণত বাম দিক থেকে আক্রমণ করেন এবং পাস গ্রহণ ও রক্ষণেও বড় ভূমিকা রাখেন।
- অপোজিট হিটার (Opposite Hitter): সেটারের বিপরীত অবস্থানে খেলেন, অনেক দলে ডান দিক থেকে শক্তিশালী আক্রমণ করেন।
- মিডল ব্লকার (Middle Blocker): নেটের কাছে প্রতিপক্ষের আক্রমণ ব্লক করা প্রধান দায়িত্ব। দ্রুত সরে গিয়ে আক্রমণেও অংশ নেন।
- লিবারো (Libero): রক্ষণে বিশেষজ্ঞ খেলোয়াড়। ১৯৯৮ সালে এই পজিশন আন্তর্জাতিক ভলিবলে চালু হয়। তিনি ভিন্ন রঙের জার্সি পরেন, শুধু পেছনের সারিতে খেলেন এবং নেটের ওপরে থাকা বলে আক্রমণ করতে পারেন না। তাঁর পরিবর্তনের নিয়মও আলাদা।
- ডিফেন্সিভ স্পেশালিস্ট (Defensive Specialist): রক্ষণ ও বল গ্রহণে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। এর ব্যবহার দলীয় কৌশল ও প্রতিযোগিতার নিয়মের ওপর নির্ভর করে।
ভলিবলের গুরুত্বপূর্ণ কৌশল
ভলিবলে শুধু শক্তি দিয়ে সফল হওয়া যায় না। বলের গতি বোঝা, সঠিক সময়ে লাফানো, ভারসাম্য রাখা এবং সতীর্থদের সঙ্গে যোগাযোগ- সবই গুরুত্বপূর্ণ।
- সার্ভ (Serve): সার্ভ দিয়ে র্যালি শুরু হয়। আন্ডারহ্যান্ড, ওভারহ্যান্ড, ফ্লোট ও জাম্প সার্ভ—এমন নানা কৌশল আছে। ভালো সার্ভ প্রতিপক্ষের পাস কঠিন করে তোলে।
- পাস (Pass): প্রতিপক্ষের সার্ভ বা আক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করে সতীর্থের কাছে পৌঁছে দেওয়া। সাধারণত দুই বাহু একসঙ্গে ব্যবহার করা হয়।
- সেট (Set): সাধারণত আঙুলের সাহায্যে বল নিয়ন্ত্রণ করে আক্রমণকারীর জন্য তুলে দেওয়া।
- স্পাইক (Spike): নেটের ওপর দিয়ে প্রতিপক্ষের কোর্টে জোরে আঘাত করা। লাফ, সময়জ্ঞান ও হাতের অবস্থান এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
- ব্লক (Block): নেটের কাছে প্রতিপক্ষের স্পাইক ঠেকানোর চেষ্টা। একজন বা একাধিক খেলোয়াড় একসঙ্গে ব্লক করতে পারেন।
- ডিগ (Dig): প্রতিপক্ষের জোরালো স্পাইক বা নিচু বল মাটিতে পড়ার আগে রক্ষা করা।
ইনডোর ভলিবল ও বিচ ভলিবলের পার্থক্য
ইনডোর ভলিবল ও বিচ ভলিবলের নিয়ম, কোর্টের মাপ এবং খেলোয়াড় সংখ্যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। ইনডোর ভলিবল ছয়জনের দলভিত্তিক খেলা হলেও বিচ ভলিবলে মাত্র দুজন খেলোয়াড় পুরো কোর্টের দায়িত্ব সামলান, যা খেলাটিকে আরও চ্যালেঞ্জিং করে তোলে। ইনডোর ভলিবল ও বিচ ভলিবলের কোর্টের মাপ, খেলোয়াড় সংখ্যা, ম্যাচের নিয়ম এবং খেলার ধরনসহ গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যগুলো এক নজরে দেখুন।
| বিষয় | ইনডোর ভলিবল | বিচ ভলিবল |
|---|---|---|
| মাঠ | ইনডোর কোর্ট | বালুর কোর্ট |
| প্রতি দলে খেলোয়াড় | ৬ জন | ২ জন |
| কোর্টের মাপ | ১৮ × ৯ মিটার | ১৬ × ৮ মিটার |
| ম্যাচের সেট | সর্বোচ্চ ৫ সেট | সর্বোচ্চ ৩ সেট |
| প্রথম সেটগুলোর পয়েন্ট | ২৫ (প্রথম চার সেট) | ২১ (প্রথম দুই সেট) |
| নির্ণায়ক সেট | ১৫ পয়েন্ট | ১৫ পয়েন্ট |
| বিশেষত্ব | নির্দিষ্ট পজিশন ও রোটেশন | বালুর ওপর চলাচল, দুজনের সমন্বয় |
দ্রষ্টব্য: বিচ ভলিবলে প্রতি দলে মাত্র দুজন খেলোয়াড় থাকায় প্রত্যেককে আক্রমণ, রক্ষণ ও বল গ্রহণের একাধিক দায়িত্ব পালন করতে হয়। এছাড়া বালুর ওপর চলাচল করার কারণে এটি শারীরিকভাবে আরও বেশি চ্যালেঞ্জিং।
অলিম্পিকে ভলিবল
ভলিবল অলিম্পিকের অন্যতম জনপ্রিয় দলীয় খেলা। ১৯৬৪ সালের টোকিও অলিম্পিকে ইনডোর ভলিবল প্রথমবার পদকজয়ী খেলা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়। ব্রাজিল, যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি, জাপান, চীন, পোল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের দল আন্তর্জাতিক ভলিবলে উল্লেখযোগ্য পরিচিতি অর্জন করেছে।
অলিম্পিকে বিচ ভলিবল
১৯৯৬ সালের আটলান্টা অলিম্পিকে বিচ ভলিবল প্রথমবার পদকজয়ী খেলা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়। এর আগে ১৯৯২ সালের বার্সেলোনা অলিম্পিকে এটি প্রদর্শনী ইভেন্ট হিসেবে খেলা হয়েছিল। অলিম্পিক ছাড়াও বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ, ভলিবল নেশনস লিগ ও মহাদেশীয় প্রতিযোগিতায় ভলিবল খেলা হয়।
বিশ্বের জনপ্রিয় ভলিবল দল ও খেলোয়াড়
পুরুষদের প্রতিযোগিতায় ব্রাজিল, ইতালি, পোল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান পরিচিত নাম। নারীদের প্রতিযোগিতায় ব্রাজিল, যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি, চীন, জাপান ও তুরস্ক উল্লেখযোগ্য। তবে কাউকে "সর্বকালের সেরা" বলতে হলে সময়কাল, অর্জন ও প্রতিযোগিতার ধরন বিবেচনা করা জরুরি।
বাংলাদেশে ভলিবল খেলা
বাংলাদেশে ভলিবল স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, স্থানীয় ক্লাব ও বিভিন্ন ক্রীড়া আয়োজনে খেলা হয়। কম সরঞ্জামে খেলা যায় বলে দেশের নানা অঞ্চলে এর আয়োজন সহজ। জাতীয় পর্যায়ে খেলাটির সংগঠন ও প্রতিযোগিতার দায়িত্বে রয়েছে বাংলাদেশ ভলিবল ফেডারেশন। দেশে ভলিবলের মান বাড়াতে প্রয়োজন নিয়মিত প্রতিযোগিতা, দক্ষ কোচ, উন্নত প্রশিক্ষণ, স্কুল পর্যায়ে খেলাটির প্রসার এবং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ। স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিভা শনাক্ত করে দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ দেওয়া গেলে জাতীয় দলের মান উন্নয়নের সম্ভাবনা বাড়ে।
ভলিবল খেলার উপকারিতা
নিয়মিত ও উপযুক্তভাবে খেললে ভলিবল শারীরিক সক্ষমতা ও দলগত দক্ষতা বাড়াতে সাহায্য করে।
- শারীরিক সক্রিয়তা: দৌড়ানো, লাফানো ও দ্রুত দিক পরিবর্তনে শরীর সক্রিয় থাকে।
- সমন্বয় ক্ষমতা: চোখ ও হাতের সমন্বয় এবং বলের গতিপথ বোঝার দক্ষতা বাড়ে।
- দলগত কাজ: যোগাযোগ, দায়িত্ব ভাগ করা ও একসঙ্গে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভ্যাস গড়ে ওঠে।
- দ্রুত প্রতিক্রিয়া: অল্প সময়ে বলের অবস্থান বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
- মনোযোগ ও কৌশল: প্রতিপক্ষের আক্রমণ অনুমান করার চর্চা হয়।
খেলার আগে ওয়ার্ম-আপ, উপযুক্ত জুতা, নিরাপদ মাঠ এবং প্রয়োজনমতো বিশ্রাম নিশ্চিত করা উচিত। নতুনদের ধীরে ধীরে অনুশীলনের মাত্রা বাড়ানো ভালো।
নতুনদের ভলিবল শেখার সহজ উপায়
- বল গ্রহণ ও দুই বাহু দিয়ে পাস করার অনুশীলন করুন।
- সঠিকভাবে সার্ভ করা শিখুন।
- সতীর্থের সঙ্গে ছোট দূরত্বে বল আদান-প্রদান করুন।
- পায়ের অবস্থান, ভারসাম্য ও বলের গতিপথ বোঝার চর্চা করুন।
- ধীরে ধীরে সেট, স্পাইক ও ব্লকের কৌশল শিখুন।
- নিয়মিত ছোট দলে খেলে রোটেশন ও পয়েন্ট গণনা বুঝে নিন।
শুরুতেই জোরে স্পাইক করার চেয়ে সঠিক পাস, নিয়ন্ত্রণ ও দলগত যোগাযোগে জোর দেওয়া বেশি কার্যকর।
ভলিবল সম্পর্কে সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
১. ভলিবল খেলার উদ্ভাবক কে?
উইলিয়াম জি. মরগ্যান। তিনি ১৮৯৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটসের হলিওক শহরে খেলাটির সূচনা করেন।
২. ভলিবল প্রথমে কী নামে পরিচিত ছিল?
প্রথম নাম ছিল মিন্টোনেট (Mintonette)। পরে ১৮৯৬ সালে ভলিবল নামটি গৃহীত হয়।
৩. ভলিবল খেলার মাঠের মাপ কত?
আন্তর্জাতিক ইনডোর ভলিবল কোর্টের দৈর্ঘ্য ১৮ মিটার এবং প্রস্থ ৯ মিটার।
৪. ভলিবল দলে কতজন খেলোয়াড় থাকেন?
ইনডোর ভলিবলে প্রতি দলে একসঙ্গে ছয়জন এবং বিচ ভলিবলে দুজন খেলোয়াড় থাকেন।
৫. ভলিবলে একটি সেট জিততে কত পয়েন্ট লাগে?
প্রথম চার সেটে ২৫ পয়েন্ট এবং পঞ্চম বা নির্ণায়ক সেটে ১৫ পয়েন্ট লাগে। সব ক্ষেত্রেই অন্তত দুই পয়েন্টের ব্যবধান থাকতে হয়।
৬. ভলিবল ম্যাচে কয়টি সেট হয়?
ইনডোর ভলিবল ম্যাচ সর্বোচ্চ পাঁচ সেটের। যে দল প্রথম তিন সেট জেতে, সেই দল ম্যাচ জেতে।
৭. ভলিবলে একবারে সর্বোচ্চ কতবার বল স্পর্শ করা যায়?
ব্লক স্পর্শের ব্যতিক্রম বাদে একটি দল বল প্রতিপক্ষের দিকে পাঠানোর আগে সর্বোচ্চ তিনটি স্পর্শ ব্যবহার করতে পারে।
৮. ভলিবলে লিবারো কী কাজ করেন?
লিবারো পেছনের সারিতে বল গ্রহণ ও রক্ষণে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর জার্সির রঙ অন্যদের থেকে আলাদা এবং তাঁর জন্য বিশেষ নিয়ম আছে।
৯. ইনডোর ভলিবল অলিম্পিকে কবে অন্তর্ভুক্ত হয়?
১৯৬৪ সালের টোকিও অলিম্পিকে।
১০. বিচ ভলিবল অলিম্পিকে কবে শুরু হয়?
১৯৯৬ সালের আটলান্টা অলিম্পিকে পদকজয়ী খেলা হিসেবে।
১১. ইনডোর ও বিচ ভলিবলের প্রধান পার্থক্য কী?
ইনডোরে প্রতি দলে ছয়জন ও কোর্ট ১৮ × ৯ মিটার; বিচ ভলিবলে প্রতি দলে দুজন ও বালুর কোর্ট ১৬ × ৮ মিটার।
১২. ভলিবলের আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা কোনটি?
আন্তর্জাতিক ভলিবল ফেডারেশন (FIVB), যা ১৯৪৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়।
১৩. ভলিবলের প্রধান কৌশলগুলো কী কী?
সার্ভ, পাস, সেট, স্পাইক, ব্লক ও ডিগ।
১৪. বাংলাদেশে ভলিবলের দায়িত্বে কোন সংস্থা?
বাংলাদেশ ভলিবল ফেডারেশন।
১৫. ভলিবল খেলতে কী কী সরঞ্জাম লাগে?
একটি ভলিবল, নেট, নেট পোস্ট, উপযুক্ত খেলার জুতা ও আরামদায়ক পোশাক। নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনমতো হাঁটুর সুরক্ষা সরঞ্জামও ব্যবহার করা যায়।
উপসংহার
ভলিবল এমন একটি খেলা, যেখানে শারীরিক সক্ষমতা, দ্রুত সিদ্ধান্ত, কৌশল ও দলগত সমন্বয় একসঙ্গে কাজ করে। ১৮৯৫ সালে উইলিয়াম জি. মরগ্যানের উদ্ভাবিত খেলাটি আজ আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা ও অলিম্পিকের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাংলাদেশেও স্কুল-কলেজে নিয়মিত খেলা, উন্নত প্রশিক্ষণ ও প্রতিযোগিতার সুযোগ বাড়ানো গেলে আরও বেশি তরুণ এই খেলায় আগ্রহী হবেন। ভলিবলের ইতিহাস ও নিয়ম জানা থাকলে খেলাটি উপভোগ করা যেমন সহজ হয়, নিজে খেলার আত্মবিশ্বাসও তেমন বাড়ে।
তথ্যসূত্র
- FIVB (Fédération Internationale de Volleyball): Volleyball History (ভলিবলের ইতিহাস ও উৎপত্তি)
- FIVB (Fédération Internationale de Volleyball): Beach Volleyball History (বিচ ভলিবলের ইতিহাস)
- FIVB: Beach volleyball marks 30 years as an Olympic sport
- Olympics.com (International Olympic Committee): Volleyball: a brief history
- Wikipedia: Beach volleyball at the Summer Olympics
- Government of Western Australia, Department of Local Government, Sport and Cultural Industries: Volleyball Dimensions Guide
- FIVB Official Volleyball Rules (আন্তর্জাতিক ভলিবলের অফিশিয়াল নিয়মাবলি)
আরও পড়ুন:
- ব্যাডমিন্টন: ইতিহাস, নিয়ম, কোর্টের মাপ ও তথ্য
- টেবিল টেনিস: ইতিহাস, নিয়ম, স্কোরিং ও অলিম্পিক
- বিশ্বের সেরা ক্রিকেট ব্যাট ব্র্যান্ড -এর গল্প
- ব্যালন ডি’অর ২০২৬: সেরা হবেন কে?
- বিশ্বকাপের গোল্ডেন বল: ইতিহাস, বিজয়ীদের তালিকা
- স্পেন ফুটবল বিশ্বকাপ ইতিহাস: টিকি-টাকা
- আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ড সেমিফাইনাল ২০২৬

