একসময় একটা গান তৈরি হতে লাগত একজন গীতিকার, একজন সুরকার, একজন শিল্পী, কয়েকজন বাদ্যযন্ত্রী আর একটা স্টুডিও। গান শ্রোতার কানে পৌঁছানোর আগে পেরিয়ে যেত দীর্ঘ এক সৃজনশীল যাত্রা। রাত জাগা, খসড়ার পর খসড়া, রেকর্ডিং রুমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই সেই ছবিটাই অনেকখানি বদলে দিয়েছে। এখন কেউ চাইলে শুধু একটা ভাবনা লিখে দিয়েই কয়েক সেকেন্ডে পেয়ে যেতে পারেন একটা সম্পূর্ণ গান সুর, কণ্ঠ, বাদ্যযন্ত্র সমেত। গান গাওয়ার অভিজ্ঞতা নেই, কোনো যন্ত্র বাজাতে জানেন না তবুও নিজের মনের কথাকে গানে রূপ দেওয়া এখন সম্ভব।
এই বিশাল পরিবর্তনের সঙ্গে এবার যুক্ত হচ্ছে আরেকটা জরুরি বিষয় স্বচ্ছতা। অ্যাপল মিউজিক জানিয়েছে, চলতি বছরের শেষ দিকে তারা প্ল্যাটফর্মে চালু করবে "Made With AI" লেবেল, যাতে কোনো গান তৈরিতে এআই-এর উল্লেখযোগ্য ভূমিকা থাকলে শ্রোতারা তা স্পষ্টভাবে জানতে পারেন।
Apple Music-এর "Made With AI" লেবেল আসলে কী
অ্যাপল সম্প্রতি তার মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির পার্টনারদের অর্থাৎ রেকর্ড লেবেল আর ডিস্ট্রিবিউটরদের একটা ইমেইল পাঠিয়েছে। সেখানে জানানো হয়েছে এখন থেকে যেসব গানের "উল্লেখযোগ্য অংশ" এআই দিয়ে তৈরি সেগুলোতে বাধ্যতামূলকভাবে এই লেবেল বসাতে হবে। লেবেলটা দেখা যাবে অ্যাপল মিউজিকের সাধারণ ব্যবহারকারীদের কাছেও অর্থাৎ কোনো গান স্ট্রিম করার আগেই বোঝা যাবে, তার পেছনে কতটা মানুষের হাত আর কতটা যন্ত্রের। এর ভিত্তি অবশ্য আগে থেকেই তৈরি ছিল। এ বছরের মার্চ মাসে অ্যাপল চালু করেছিল "AI Transparency Tags" নামে একটা ব্যবস্থা, যা তখন ছিল সম্পূর্ণ ঐচ্ছিক। এবার সেটাই বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। শুধু গানের সুর নয় প্রচ্ছদ, লিরিক্স আর মিউজিক ভিডিও, প্রতিটার জন্যই আলাদা ট্রান্সপারেন্সি ট্যাগ রাখা হয়েছে।
তবে একটা জায়গায় অস্পষ্টতা রয়েই গেছে লেবেল লাগানোর মূল দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে যিনি গান আপলোড করছেন তার ওপর। অ্যাপলের নিজস্ব শনাক্তকরণ ব্যবস্থা থাকলেও, ভরসাটা এখনও মূলত নির্মাতার সততার ঘোষণার ওপরেই। ঠিক কবে থেকে এটা সবাই দেখতে পাবেন, তার নির্দিষ্ট তারিখ অ্যাপল এখনও জানায়নি শুধু বলেছে, "এ বছরের মধ্যেই"। গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, এই লেবেল কিন্তু কোনো "কোয়ালিটি লেভেল" বা মানদণ্ড নয় গানটা ভালো না খারাপ, সেটা বিচার করা এর কাজ নয়। এটা কেবল একটা তথ্য শ্রোতাকে জানিয়ে দেওয়া যে এই গানের তৈরিতে এআই-এর ভূমিকা আছে।
কেন হঠাৎ এই সিদ্ধান্ত
এর পেছনে একটা সংখ্যা খুবই চোখে পড়ার মতো। অ্যাপল মিউজিকের ভাইস প্রেসিডেন্ট অলিভার শুসার জানিয়েছেন, প্ল্যাটফর্মে প্রতি মাসে যত গান আপলোড হয়, তার প্রায় এক-তৃতীয়াংশই সম্পূর্ণ এআই-নির্মিত। অথচ মোট শোনার হিসেবে সেই গানগুলোর ভাগ শূন্য দশমিক পাঁচ শতাংশেরও কম। অর্থাৎ প্ল্যাটফর্মে এআই-গানের সংখ্যা বিপুল হলেও, মানুষ এখনও মূলত মানুষের বানানো গানই শুনতে চায় কিন্তু লেবেল ছাড়া বোঝার উপায় নেই কোনটা কোন ধরনের। এই দাবি শুধু অ্যাপলের ভেতর থেকেই আসেনি।
RIAA, IFPI, এমনকি গ্র্যামি আর সাগ-আফট্রার মতো সংগঠনগুলোও একজোট হয়ে দাবি তুলেছিল, স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলো যেন এআই-গানকে ঠিক তেমনভাবে চিহ্নিত করে, যেমন এক্সপ্লিসিট কনটেন্টের ক্ষেত্রে করা হয়। স্পটিফাই ইতিমধ্যে জানিয়েছে, এআই-নির্মিত মনে হওয়া শিল্পী-প্রোফাইলে তারা "AI Persona" ব্যাজ বসাবে এবং সেগুলোকে সম্পাদকীয় প্লেলিস্টে সুপারিশ করবে না। টাইডাল আরও একধাপ এগিয়ে, এআই-গানকে রয়্যালটি পাওয়ার সুযোগ থেকেই বাদ রেখেছে। অ্যাপল মিউজিকও তাই একই স্রোতে গা ভাসিয়েছে শুধু গানকে আলাদা করাই নয়, পুরো ইন্ডাস্ট্রি জুড়েই যেন একটা স্বচ্ছতার সংস্কৃতি তৈরি হয়।
এআই দিয়ে গান আসলে কীভাবে তৈরি হয়
এই পুরো আলোচনার কেন্দ্রে যে গানগুলো সেগুলো তৈরি হয় মূলত Suno বা Udio-র মতো জেনারেটিভ এআই টুল দিয়ে। প্রক্রিয়াটা শুনতে জটিল লাগলেও শুরু করা আসলে বেশ সহজ। প্রথমে ঠিক করে নিতে হয় গানের বিষয় আর আবহ। ধরুন আপনি লিখলেন একটি বিষণ্ন বাংলা আধুনিক গান। বিষয় হবে হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসা। ধীর গতি, পিয়ানো ও অ্যাকুস্টিক গিটারের ব্যবহার, আবেগপূর্ণ পুরুষ কণ্ঠ।
AI এই নির্দেশনা বিশ্লেষণ করে একটা গানের কাঠামো তৈরি করে দেয়। Suno-তে যেমন Simple Mode-এ শুধু এই ধরনের একটা ভাবনা লিখলেই গান তৈরি হয়ে যায়। আবার Custom বা Advanced মোডে নিজের লেখা লিরিক্স, গানের কাঠামো, বাদ্যযন্ত্র আর কণ্ঠের ধরন সবকিছুই আলাদা করে বলে দেওয়া যায়। Udio-তেও একইভাবে গানের বিষয়, আবহ আর ধরন লিখে জেনারেট করলেই এআই গান তৈরি করে দেয়।
যাদের নিজের লেখা কবিতা বা কথা আছে তারা সেটাকেই গানে রূপ দিতে পারেন। প্রথমে একটা বিষয় ঠিক করুন যেমন "বৃষ্টির রাতে পুরোনো বন্ধুর কথা মনে পড়া"। এরপর নিজের ভাষায় গানের কথা লিখুন। চাইলে সেটাকে Verse, Chorus, Bridge এভাবে ভাগ করে দিন, তাতে এআই গানের কাঠামো আরও ভালোভাবে বুঝতে পারে। শেষে "Style" অংশে লিখে দিন কেমন আবহ চান যেমন, "Bangla modern pop, emotional male vocal, acoustic guitar, piano, soft drums, melancholic mood।" এরপর Generate চাপলেই এআই সেই নির্দেশনা অনুযায়ী গান তৈরির চেষ্টা করে।
শুধু লেখা নয়, নিজের সুর থেকেও গান তৈরি করা যায়। ধরুন আপনি নিজে গুনগুন করে একটা সুর তৈরি করেছেন, কিন্তু সেটাকে বাদ্যযন্ত্র দিয়ে সাজানোর দক্ষতা নেই। Suno-তে নিজের অডিও রেকর্ড বা আপলোড করে সেটার ভিত্তিতে গান তৈরির সুবিধাও আছে। অর্থাৎ কয়েক সেকেন্ডের একটা সুরের ধারণাও এআই-এর মাধ্যমে একটা পূর্ণাঙ্গ গানে রূপ নিতে পারে। আগে একটা সুর মাথায় এলেও সেটাকে গানে পরিণত করতে অন্যের সাহায্য দরকার হতো, এখন একজন সাধারণ মানুষও নিজে নিজে সেটা নিয়ে পরীক্ষা করতে পারেন।
এআই দিয়ে গান বানানোর জন্য আসলে খুব বেশি কিছু লাগে না একটা মোবাইল বা কম্পিউটার, ইন্টারনেট সংযোগ, Suno বা Udio-র মতো একটা প্ল্যাটফর্ম, আর সবচেয়ে জরুরি একটা স্পষ্ট ধারণা। যত পরিষ্কারভাবে এআই-কে বোঝানো যাবে কী চাই, ফলাফলও তত বেশি প্রত্যাশার কাছাকাছি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তবে প্রথমবারেই নিখুঁত গান পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই একই ধারণা দিয়ে কয়েকবার জেনারেট করে পছন্দের সংস্করণ বেছে নেওয়াটাই স্বাভাবিক।
এখানে একটা প্রশ্ন থেকেই যায় কে ঠিক করবে কোন গানের "উল্লেখযোগ্য অংশ" এআই-নির্মিত, আর কোনটা নয়? সেই ভার এখনও মূলত বর্তায় নির্মাতার নিজের ঘোষণার ওপরেই তাই এটাকে ইন্ডাস্ট্রির একটা প্রথম পদক্ষেপ হিসেবেই ধরে নেওয়া ভালো, যা সময়ের সঙ্গে আরও নিখুঁত হয়ে উঠবে বলে আশা করা যায়।
এআই দিয়ে গান বানানোর সবচেয়ে বড় সুবিধা
এআই-এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো গান তৈরির দরজা অনেক বেশি মানুষের জন্য খুলে দেওয়া। একজন তরুণ হয়তো গান লিখতে পারেন, কিন্তু সুর দিতে পারেন না। অন্য কেউ সুর জানেন, কিন্তু কণ্ঠ ভালো নয়। কারো আবার বাদ্যযন্ত্রের ব্যবস্থাই নেই। এআই এই সীমাবদ্ধতাগুলো অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে একজন মানুষ নিজের কবিতা থেকে গান তৈরি করতে পারেন, একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটর নিজের ভিডিওর জন্য ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক বানাতে পারেন, একজন নতুন শিল্পী নিজের গানের ডেমো তৈরি করে অন্যদের শোনাতে পারেন। এমনকি অভিজ্ঞ সংগীতশিল্পীরাও এআইকে ব্যবহার করতে পারেন নতুন আইডিয়া তৈরির সহযোগী হিসেবে, শুধু "গান বানানোর মেশিন" হিসেবে নয়।
লেবেলের সুবিধাটাও এই একই জায়গা থেকে আসে। প্রথমত, শ্রোতার কাছে তথ্য পরিষ্কার থাকে যে মানুষ শুধু মানুষের কণ্ঠ আর সৃষ্টিশীলতার গান শুনতে চান, আর যে মানুষ এআই-সংগীত নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় আগ্রহী, দুজনেই নিজের পছন্দমতো সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। দ্বিতীয়ত, শিল্পীদের জন্য তৈরি হয় স্বচ্ছতার একটা পরিবেশ এআই ব্যবহার করলে সেটা গোপন না করে প্রকাশ করার সুযোগ থাকে, ফলে ভবিষ্যতে এটা স্বাভাবিক একটা প্রক্রিয়া হয়ে উঠতে পারে। তৃতীয়ত, প্রতারণা ঠেকানোর একটা সম্ভাবনাও তৈরি হয় কেউ যদি হাজার হাজার এআই-গান আপলোড করে কৃত্রিমভাবে স্ট্রিম বাড়ানোর চেষ্টা করেন, তাহলে এই স্বচ্ছতা সেই প্রবণতা মোকাবিলায় সহায়ক হতে পারে।
কপিরাইট নিয়ে সতর্ক থাকা জরুরি
এআই দিয়ে গান বানালেই সেটা যেমন খুশি ব্যবহার করা যাবে বিষয়টা অতটা সহজ নয়। যে প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছেন তার ব্যবহারের শর্তাবলি ও বাণিজ্যিক ব্যবহারের নীতি আগে দেখে নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে গানটা কোনো স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে প্রকাশ করার ইচ্ছা থাকলে। নিজের লেখা কথা ব্যবহার করা তুলনামূলক নিরাপদ হলেও অন্যের গান, লিরিক্স বা পরিচিত শিল্পীর কণ্ঠ নকল করার চেষ্টা কপিরাইট আর ব্যক্তিস্বত্বের প্রশ্ন তুলতে পারে। এআই-প্রশিক্ষণে কপিরাইটেড উপাদান ব্যবহার নিয়ে ইতিমধ্যেই বিভিন্ন আইনি বিরোধও দেখা দিয়েছে। তাই সবচেয়ে নিরাপদ পথ হলো নিজের লেখা, নিজের ধারণা আর বৈধভাবে ব্যবহারের অনুমতি থাকা উপাদান নিয়েই কাজ করা।
তাহলে কি এআই মানুষ-শিল্পীকে সরিয়ে দেবে
এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়। এআই দ্রুত গান তৈরি করতে পারে কিন্তু গান শুধু সুর-শব্দের সমষ্টি নয়। একটা গানের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের অভিজ্ঞতা, স্মৃতি, কষ্ট আর জীবনের গল্প। একজন মানুষ যখন বিচ্ছেদের পর গান লেখেন, তার পেছনে থাকে একটা বাস্তব অনুভূতি। একজন শিল্পী যখন মঞ্চে গান করেন, তার কণ্ঠে মিশে থাকে বছরের পর বছর অনুশীলন আর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। এআই সেই অনুভূতির অনুকরণ করতে পারে কিন্তু জীবনের অভিজ্ঞতাটা নিজে থেকে বয়ে বেড়ায় না। তাই এআইকে মানুষের বিকল্প হিসেবে না দেখে একটা নতুন সৃজনশীল হাতিয়ার হিসেবে দেখাটাই হয়তো বেশি বাস্তবসম্মত। ভবিষ্যতের অনেক গান হয়তো সম্পূর্ণ এআই-নির্মিত হবে না, বরং হবে মানুষ আর এআই-এর যৌথ সৃষ্টি গীতিকার লিখবেন, এআই কয়েকটা সুরের ধারণা দেবে, শিল্পী নিজের কণ্ঠ দেবেন, আর শেষ সিদ্ধান্তটা থাকবে মানুষের হাতেই।
ভবিষ্যতের গান হবে মানুষ ও AI-এর যৌথ সৃষ্টি?
এখানেই লুকিয়ে আছে একটা রহস্য যেটার উত্তর এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। যে গানটা আপনি কাল শুনলেন, সেটার পেছনে কে ছিল একজন মানুষ, নাকি একটা অ্যালগরিদম, নাকি দুজনেই মিলে? ভবিষ্যতে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া আরও কঠিন হয়ে উঠবে, কারণ সীমারেখাটাই ক্রমশ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। সম্ভবত সবচেয়ে বাস্তব ভবিষ্যৎটা এমনই হবে একজন গীতিকার লিখবেন, এআই তার জন্য কয়েকটা সুরের ধারণা তৈরি করে দেবে, শিল্পী নিজের কণ্ঠ দেবেন, প্রযোজক এআই-জেনারেটেড ইন্সট্রুমেন্টাল পরিবর্তন করে নেবেন আর শেষ পর্যন্ত মানুষই ঠিক করবেন কোন অংশ থাকবে, কোনটা বাদ যাবে।
অর্থাৎ ভবিষ্যতের অনেক গানই হয়তো সম্পূর্ণভাবে এআই-নির্মিত হবে না, বরং হবে Human + AI collaboration যেখানে কতটা কার অবদান, সেই হিসাবটাই থেকে যাবে একটা ধোঁয়াশা হয়ে। আর ঠিক এই অনিশ্চয়তার জায়গা থেকেই Apple Music-এর AI Transparency Tag-এর মতো উদ্যোগ এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। শ্রোতা হয়তো কখনোই পুরোপুরি জানতে পারবেন না, একটা গানের ঠিক কতটুকু মানুষের আর কতটুকু যন্ত্রের কিন্তু অন্তত এটুকু জানতে পারবেন, এই লুকোচুরির খেলায় এআই কোথাও জড়িয়ে আছে কি না। সেই সামান্য তথ্যটুকুর ভিত্তিতেই শ্রোতা নিজের পছন্দ তৈরি করে নিতে পারবেন।
আমাদের বাংলা গানের জগতে এর প্রভাব
আমরা যারা বাউল গান, লোকগান আর বাংলার ঐতিহ্যবাহী সুরের সঙ্গে বেড়ে উঠেছি, তাদের কাছে এই খবরটা একটু অন্যভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বাউল গান তো শুধু সুর নয় এর পেছনে থাকে একজন সাধকের জীবনদর্শন, তার সাধনার গল্প, তার নিজের হাতে গড়া একতারার শব্দ। এআই যত উন্নত হোক না কেন, একজন বাউল সাধকের বছরের পর বছরের অনুভবকে যন্ত্র দিয়ে প্রতিস্থাপন করা যায় না। তবু ভবিষ্যতে হয়তো কেউ চাইলে বাউল ঘরানার সুরেও এআই দিয়ে গান তৈরি করবেন আর তখন এই ধরনের লেবেলিং ব্যবস্থাই আমাদের সাহায্য করবে সত্যিকারের ঐতিহ্যকে চিনে নিতে, নকল থেকে আসলটাকে আলাদা করতে।
শেষ কথা
এআই দিয়ে গান তৈরি এখন আর শুধু প্রযুক্তিপ্রেমীদের খেলনা নয়। একজন সাধারণ মানুষও নিজের লেখা, নিজের সুর বা একটা ছোট্ট ভাবনা থেকে গান তৈরি করতে পারেন। কিন্তু প্রযুক্তি যত সহজ হচ্ছে, দায়িত্বও তত বাড়ছে অন্যের লিরিক্স, সুর বা পরিচয় অনুমতি ছাড়া ব্যবহার না করাই ভালো, আর গানটা কোথায় প্রকাশ করা যাবে সেটাও প্ল্যাটফর্মের নিয়ম দেখে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
Apple Music-এর "Made With AI" লেবেল সেই স্বচ্ছতারই একটা ছোট্ট কিন্তু জরুরি পদক্ষেপ গানটা এআই দিয়ে তৈরি কি না, সেটা লুকিয়ে না রেখে জানিয়ে দেওয়া, যাতে গান শোনার আনন্দের পাশাপাশি আমরা এটাও জানতে পারি, যে সুরটা আমাদের মন ছুঁয়ে যাচ্ছে, তার উৎসটা আসলে কোথায়। শেষ পর্যন্ত প্রযুক্তি গান তৈরি করতে পারে, কিন্তু গানটাকে মানুষের কাছে অর্থবহ করে তোলে তার গল্প, অনুভূতি আর সৃষ্টিশীলতা। এআই হয়তো সেই গল্প বলার একটা নতুন মাধ্যম গল্পের মালিক নয়।

