শুধু কি আল্লা বলে ডাকলে তারেপাবি ওরে মন পাগেলাযে ভাবে আল্লাতালা বিষম লীলাত্রিজগতে করছে খেলা
বাংলার বাউল-ফকিরি ধারায় এমন কিছু সাধক আছেন, যাদের গান ও দর্শন যুগ পেরিয়েও মানুষের হৃদয়ে অনির্বাণ আলো জ্বেলে রাখে। সেই বিরল সাধকদের অন্যতম হলেন সাধক পাঞ্জু শাহ। তিনি কেবল একজন বাউল শিল্পীই নন, বরং ছিলেন ফকিরি সাধনার গভীরে নিমগ্ন এক দরবেশে মন মহাজন। তাঁর পরিচয় নিয়ে ভিন্নমত থাকলেও কেউ তাঁকে বাউল, কেউ ফকির, আবার কেউ সুফি দার্শনিক হিসেবে দেখেন সব মতের কেন্দ্রে একটাই সত্য স্পষ্ট: তিনি ছিলেন আধ্যাত্মিক চেতনার এক উজ্জ্বল ধারক।
পাঞ্জু শাহের গানে যে দর্শন ও অনুভব প্রতিফলিত হয়েছে, তা মূলত বাউল-ফকিরি সাধনার সারবস্তু বহন করে। বিশেষ করে ফকির লালন সাঁইয়ের ভাবধারা তাঁর চিন্তা, দর্শন ও সাধনপদ্ধতির গভীরে প্রোথিত। লালনের মানবতাবাদী দর্শন, দেহতত্ত্ব ও অন্তর্দর্শনের যে অনন্য মেলবন্ধন, তা পাঞ্জু শাহ নিজের গানে নতুনভাবে প্রকাশ করেছেন। তাঁর রচনায় লালনের প্রভাব এতটাই গভীর যে তাঁকে লালন ভাবধারার একজন প্রধান অনুসারী বললেও অত্যুক্তি হয় না।
ধারণা করা হয়, ফকির লালন সাঁইয়ের মৃত্যুর পর সাধক সমাজে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছিল, পাঞ্জু শাহ তাঁর সাধনা ও সৃষ্টির মাধ্যমে সেই শূন্যতা অনেকটাই পূরণ করেছিলেন। তাই বাংলা আধ্যাত্মিক সংগীতধারায় তাঁর অবদান আজও গভীরভাবে স্মরণীয় এবং প্রাসঙ্গিক।
🟤সাধক পাঞ্জু শাহ- জন্ম, পরিবার ও শিক্ষা জীবন
মরমি সাধক পাঞ্জু শাহ ১২৫৮ বঙ্গাব্দের ২৮শে শ্রাবণ (১৮৫১ খ্রিস্টাব্দ) ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা উপজেলার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা খাদেম আলী খোন্দকার এবং মাতা জোহরা বেগম—উভয়েই ছিলেন স্থানীয় প্রভাবশালী জমিদার বংশের সদস্য। পারিবারিক পরিবেশ ছিল ধর্মীয় অনুশাসনে পরিপূর্ণ। তাঁদের পরিবারে মোট পাঁচজন সন্তান ছিলেন—শাহারন নেছা, তহিরন নেছা, পাঞ্জু খোন্দকার, ওয়াসিম উদ্দিন খোন্দকার এবং আইমানী নেছা।
পারিবারিক কারণে তাঁর পিতা শৈলকুপা ছেড়ে হরিশপুরে বসতি স্থাপন করেন। এই হরিশপুরই পরবর্তীতে পাঞ্জু শাহের সাধনা ও সৃষ্টির প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে। তিনি নিজেই বলেছেন “বসতি মোকাম মোর হরিশপুর গ্রাম।” প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ না পেলেও, গৃহশিক্ষকের তত্ত্বাবধানে তিনি আরবি ও ফারসি ভাষায় গভীর দক্ষতা অর্জন করেন। তাঁর পিতা ছিলেন ধর্মপ্রাণ ও শাস্ত্রানুরাগী মুসলমান, যিনি বাংলা ভাষা শিক্ষার বিরোধিতা করতেন। ফলে শৈশবে পাঞ্জু শাহ বাংলা ভাষায় তেমন পারদর্শী ছিলেন না।
তবে বয়সের সঙ্গে সঙ্গে তিনি উপলব্ধি করেন মাতৃভাষা ছাড়া চিন্তার পূর্ণ বিকাশ অসম্ভব। এই উপলব্ধি থেকেই ষোলো বছর বয়সে তিনি হরিশপুরের মহর আলী বিশ্বাসের কাছে গোপনে বাংলা ভাষা শিক্ষা গ্রহণ করেন। এই সাহসী পদক্ষেপই তাঁর ভবিষ্যৎ সাহিত্য ও সংগীতচর্চার ভিত্তি গড়ে দেয়।
🟤সাধক পাঞ্জু শাহ- সাধনা, পারিবারিক জীবন ও সাহিত্যকর্ম
চব্বিশ বছর বয়সে পাঞ্জু শাহ চুয়াডাঙ্গার আইলহাস-লক্ষ্মীপুর গ্রামের আবদুর রহমান খোন্দকারের কন্যা ছন্দন নেছাকে বিবাহ করেন। তাঁর স্ত্রী ছিলেন ধর্মপ্রাণ, গুণবতী ও সহৃদয়, যিনি পাঞ্জু শাহের সাধনা ও সৃষ্টিশীল জীবনে গুরুত্বপূর্ণ অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিলেন। তাঁদের সংসারে প্রথমে জন্ম নেয় পুত্র শামসউদ্দীন, পরে দুই কন্যা—কলিমন নেছা ও ছালেহা খাতুন।
কৈশোর থেকেই তিনি মরমি সাধনার প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন, তবে পিতার কঠোরতার কারণে প্রকাশ্যে ফকিরি মজলিশে অংশ নিতে পারেননি। সাতাশ বছর বয়সে পিতার মৃত্যুর পর তিনি সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে সুফি সাধনায় আত্মনিয়োগ করেন। এ সময় তিনি হিবাজতুল্লাহ খোন্দকার নামক এক তত্ত্বজ্ঞ সাধকের নিকট দীক্ষা গ্রহণ করেন এবং আধ্যাত্মিক সাধনার পথে এগিয়ে যান।
সুফি দর্শন ও মানবতাবাদী ভাবধারায় অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি ২০০টিরও বেশি গান রচনা করেন। ১৮৯০ সালে তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ “ছহি ইস্কি ছাদেকী গওহোর” প্রকাশিত হয়, যার অর্থ—“সত্যিকারের প্রেমের রত্ন”। এই গ্রন্থে স্রষ্টার প্রতি আত্মার গভীর অনুরাগ, সুফিতত্ত্বের ব্যাখ্যা, নৈতিক শিক্ষা ও অন্তর্দর্শনের বার্তা সংকলিত হয়েছে। বইটির ভূমিকায় তিনি লিখেছিলেন—“এ কিতাব ইমানেতে যে জন পড়িবে, আল্লার যে ভেদ সেই অবশ্য পাইবে” যা তাঁর আধ্যাত্মিক দৃষ্টিভঙ্গির স্পষ্ট প্রকাশ।
পাঞ্জু শাহ তাঁর জীবনভর ‘মনের মানুষ’ ও ‘অধর মানুষ’-এর সন্ধান করেছেন। তাঁর গানে মানুষভজনার তত্ত্ব সর্বোচ্চ গুরুত্ব পেয়েছে। এই মহান মরমি সাধক ১৩২১ বঙ্গাব্দের ২৮শে শ্রাবণ হরিশপুরেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর জীবন ও কর্ম আজও বাংলা আধ্যাত্মিক সংগীতধারায় এক অনন্য প্রেরণা হয়ে রয়েছে।
সাধক পাঞ্জু শাহ: গানের সংকলন
-(১)-
অধর চাঁদ মেলে মুর্শিদ আঁধার ঘুচালে
দেখবি লীলা, চাঁদের খেলা, খেলা দ্বিদলে
চাঁদের সিংহাসন উদয়
তিল পরিমাণ জায়গা বুঝায়
রঙমহল তাই।
পাঞ্জাতন সে আসন ঘেরে সকলে।
অমাবস্যা সে চাঁদের নাই
দিবানিশি হচ্ছে উদয়
দেখলে দেখা যায়।
মানব-জনম সফল হবে সে চাঁদ দেখিলে।
দেখে শুনে সাধন করে
সে জন যাবে ভবপারে
সে চরণ ধরে।
পাঞ্জু বলে সাধের জনম গেল বিফলে।
-(২)-
অধর মানুষ নদীর কূলে ঘাট বাঁধিয়াছে
তাহে মণিমুক্তা ভিয়ান করে ঘাটে
শান বেঁধে দিয়াছে
পদ্মা যমুনা মিলে
ভাগীরথীর লোনা জোয়ারে
তিন ধারে তিন নদীর জলে
জোয়ার-ভাটা খেলিতেছে।
আদ্য মানুষ অধর চাঁদে
এক রূপে তিন রূপ ধরেছে
তিন ধারে তিন রসে মিশে বারাম দিতেছে।
মানুষ তিন রতি হয়ে
তিন রসে সোয়ার দিয়ে
সাধারণী সামঞ্জসা সামর্থা
তিন নাম ধরেছে গরল রসে সাধারণী।
সামঞ্জসা শাস্ত্র শুনি
সামর্থা অমৃত রসে বিরাজ করতেছে
যে জন রসিক হয়েছে
রসের ভিয়ান জেনেছে
গুরুর কৃপায় ঘাটে নেমে
তিন রতি উজান করেছে।
রস-রতি উজান হলে
গোপী-কৃপা তাইরি মেলে
সহজ রূপে নয়ন দিয়ে জেন্দা মরেছে
হিরুচাঁদ কয় ভাব না জেনে
পাঞ্জু ঘুরে মলি মিছে।
-(৩)-
অযোগ্য বলে গুরু ফেলো না আমায়
আমি চরণ-দাসের যোগ্য নয়
যোগ্য লোকের দয়া গুরু, করে জগতে সবাই,
তোমা বিনে অধম জনে কেহ না সুধায়।
দয়াল, সাধু-মুখে শুনি
পাষাণ-দলন পতিত পাবন তোমার নামের ধ্বনি
তাই শুনিয়ে স্মরণ নিলাম যদি দয়া হয়
এ জগতে আমা বলতে আর তো কেহ নাই।
গুরু, শুনি তোমার রায়
জগাই-মাধাই মেরেছিল কাদা ফেলে গায়
বুকে বহে রুধির-ধারা, তবু হয়ে দয়াময়
হরিনাম দিয়ে তারে কোল দিলে নিতাই।
শুনি অহল্যা এক নারী
মুনি-পত্নী স্বামীর বাক্যে পাষাণ হলেন তিনি
চরণ-ধূলা দিয়ে তারে মানবি করলে তাই
অধীন পাঞ্জু চেয়ে আছে ঐ ধূলার আশায়।
-(৪)-
আগে দেহের খবর জানো রে আমার মন
দেহতত্ত্ব না জানিলে জনম যাবে অকারণ
দেহবৃক্ষের পাঁচটি শাখা
দশ ডালে তার দশটি পাতা
সেই বৃক্ষে বসে আছে মহানন্দ মহাজন।
বিষয় বিষে মন চঞ্চলা
বিবাদী করে ছলা কলা
মন বিবাগী বাগ মানে না
নষ্ট করে পিতৃধন।
গুরুর দাসী হও আগে
প্রেমতরি বাও অনুরাগে
পাঞ্জু বলে তবেই হবে
মহাসুখের আগমন।
-(৫)-
আজব কারখানা বোঝা সাধ্য কার
সাঁই করেন লীলা ভবের পর
এই মানুষে রঙ্গরসে বিরাজ করেন
সাঁই আমার।
একটি ছিলেন দুটি হলেন
নীরে-ক্ষীরে যুগল তার
পুরুষ-প্রকৃতি ঘটে হরেক
রঙে দেন বাহার।
পাপির ঘটে রঙ্গ দেখে
হাকিম ঘটে দেন বিচার,
দরিদ্রের ঘটে বসে ফিরতেছেন
সাঁই দ্বার বে দ্বার।
পাঞ্জু বলে মানব-লীলা
করেছেন সাঁই চমৎকার,
মানুষ ধরো মানুষ ভজো
মন যাবি তুই ভবপার।
-(৬)-
আমার কি এত দয়া হবে
জগতের স্বামী এই কপালে মিলিবে
জনম নাপাকে যায়
পাক দেহ হলো নাই
সাঁই গো।
ভক্তিহীন জীবের দয়া, কিসে বা হইবে
জীবের জীবন ধন
আহা রে সে নিরাঞ্জন
সাঁই গো।
এমন অধম জনে কেনো দেখা দিবে
ভজন নাহিক জানি
কোন গুণে গুণমণি
সাঁই গো।
এমন যে অভাগিনী দাসী বানাইবে
গেল জনম বিফলে
ঘিরে নিল মায়াজালে
সাঁই গো
পাঞ্জু বলে অন্তিম কালে
বাম না হইবে।
-(৭)-
আল্লা খুশি হবে কোন কামে
সাধু গুরু দয়া করে বলো এ গোলামে
রোজা ও নমাজ করি
ভালো হয় আপনারি
সাঁই গো।
নেকি কামে বেহেস্ত যে দিবেন আদমে
খয়রাত যাহা করি
সেই নেকি আপনারি
সাঁই গো।
আত্মসুখ জন্য আল্লা ডাকি দমে দমে
সাধনে অটল হই
খোদা সঙ্গে মিশে যাই
সাঁই গো।
গোলামি কি তাতে হয় খোদার কদমে
যেই হয় গুরু কাজি
আল্লা তাহে হবে রাজি
সাঁই গো
পাঞ্জু বলে মন তুমি মজো
গুরু-প্রেমে।
-(৮)-
আল্লার নাম করো দম-বদমে
হলো নাফি এজবাত নিজ নামে
নাম করিলে উদ্ধার পাব
আল্লা পাব কোন কামে।
শুনি বারো বুরুজে
কোন বুরুজে কিসে থাকে
কি নাম ধরে
বরজোখ ধ্যানে রূপ দেখা যায়
মঞ্জিল আর মোকামে।
মালাকুত মোকামে
সিয়া সফেদ লাল জরদ
চার রঙ ধরে
অতুলনা মুর্শিদের রূপ
মাখা আছে আদমে।
রঙ দেখি ধ্যানে
অধর চাঁদকে ধরা যাবে
বলো কোন সাধনে
সাধন-সন্ধান জানো বলি
সাধুর কদমে
সিদ্ধি হবে সাধনে।
খোদা প্রাপ্তি কিসে হবে
ভজন বিনে
পাঞ্জু বলে ভজন
আল্লার আলমে আর কলমে।
-(৯)-
আল্লা পাবে সত্য প্রেমি হলে
সূর্যের ধিয়ানে যেমন রয়েছে কমলে
জলেতে কমল রয়
স্বভাব তাহার হয়
সাঁই গো।
বিকশিত সূর্যোদয়ে মুদিতাস্ত গেলো
যে দিকে সুরুয চলে
কমল সে দিকে হেলে
সাঁই গো।
ফেরে না সে কোনোকালে
ঝাড়ি তুফান হলে
তেমনি আশকদার
পতিকে করেছে সার
সাঁই গো।
যদি হয় ছারেখার তবু নাহি টলে
মন রে কমল হও
গুরুপদে মন দাও
সাঁই গো।
ভবকুলে কালি দাও
ভুলো না করো ভোলে
হীন পাঞ্জু আলাঝালা
না জানে পিরিতি জ্বালা
সাঁই গো
মেলে কি মালেক আল্লা
মূঢ়ার কপালে ॥
-(১০)-
আল্লার বান্দা কিসে হয়
নবির উম্মত হলে জানা যায়
আল্লার বান্দা নবির উম্মত
এ জগতে সবাই কয়।
আঠারো হাজার আলমে আছে
নব্বই হাজার কালাম তার
সিনা, সফিনা দুই ভাগে রয়
তিরিশ হাজার এই দুনিয়ায়
ষাট হাজার কালামে আহাদ
তার খবর আর কেবা পায়।
জেন্দেগি ভর বন্দেগি করিতে
মোরে সবাই কয়
গোলামি করিলে বান্দা
হাদিসে তা জানা যায়
কিসে হয় আল্লার গোলামি
খোলা নাই ভেদ সফিনায়।
ভেদ জানিয়া নুর সাধিলে
কালাম-সিনা হয় আদায়
সাধন বর্ত নুরে-নীরে
বরজোখ-ভজন তাই
পাঞ্জু বলে আহাদ কালামে
দয়া করবেন দয়াময়।
-(১১)-
এমন দুর্লভ জনম হারাইও না
পাথরে ঠুকিলে মাথা,
এমন জনম আর হবে না।
চৌরাশি লক্ষ যোনী
পশু আদি শৃগাল গৃধিনী
ব্রহ্ম দরেন্দা।
জনম পেয়ে মানব হয়ে
মানুষ কেনে চেনো না
সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর, কলি
চার যুগে মন কোথায়ি ছিলি
ডুবে দেখতে হয়।
মিছে দুদিনের দায় দুকূল হারায়
শেষ ভাবনা ভাবো না
ধন পুত্র জরু মালে
কে ঠেকাবে অন্তিম কালে
কি হবে উপায়।
সেদিন আপনার জন্যে কাঁদবে সবাই
তোর জন্যে কেউ কাঁদবে না
ব্যথার ব্যথিত কে আছে মন
কারে বলো আপন আপন
হিরুচাঁদে কয়
অধীন পাঞ্জু বলে মায়াজালে
গুরুর চরণ ভুলো না
-(১২)-
কি সাধনে আল্লাতালা পাই
সাধন-ভজন ভুলে দিন গেল ভাই
সন্ন্যাসী হইয়া কেউ
সর্বত্যাগী হলো সেও
সাঁই গো।
শুনি সেহ ভ্রমে ভুলে ফিরিছে সদাই
ঘর ছেড়ে বনে যায়
রিপু তার সঙ্গে রয়
সাঁই গো।
বনে গেলে আল্লা পাব এখানে কি নাই
আমি কোথা সে কোথায়
কোথা গেলে তারে পাই
সাঁই গো।
ভেবে দেখি দেহ ছাড়া নাহি কোনো ঠাঁই
নুরে আছে নিরাকার
জেনে সাধ্য করো তার
সাঁই গো
পাঞ্জু বলে দিন গেলে আর হবে নাই।
-(১৩)-
ক্ষমো হে অপরাধে
দাসী করে অনুরোধে
তুমি দীনবন্ধু করুণাসিন্ধু
আমারে দিও না বাদ।
গগনচন্দ্র উদয় করো
তিমির অন্ধকার হরো
পাপী তাপী সবাকার
জ্যোতি লাগে গায়।
কোটি চন্দ্র যিনি কিরণ
নামটি শুনি দয়াল চাঁদ
সৃষ্টিকর্তা তোমায় দেখি
কেনো করো দুখীতাপী
ভক্তের করো দীপ্ত আঁখি
পাপীর অন্ধকার।
করো, কারো দীপ্ত, করো অন্ধ
তুমি আবার কেমন চাঁদ
তুমি বাঞ্ছা কল্পতরু
পতিত পাবন জগৎ গুরু।
পাঞ্জু বল করে না কার
যা করো এবার
তোমার নামের জোরে পাষাণ গলে
আমায় গলায় মায়াফাঁদ।
-(১৪)-
খুঁজে কি আর পাবি সে অধরা
সে নয়ন তারা
এই মানুষে মিশে আছে
গোপীর মনচোরা
লীলা সাঙ্গ করে গোরা,
স্বরূপেতে মিশে আছে
মায়া পাশরা।
স্বরূপ রূপ রসে মিশে
রসে হয়ে ভোরা
রসের আলো হয় ছেতারা
রসেতে রূপ গিলটি করা
দর্পণের পারা।
রসের নদী জোয়ার এসে
বহে তিনটি ধারা
কারুণ্যে তারুণ্যামৃত
লাবণ্যে তার তিনটি অর্থ
রসিক জানে তা
তারা নদীর কূলে ভ্রমর ধরে,
পাঞ্জু মণিহারা।
-(১৫)-
খোদার আশকি যেই হবে
ষোল আনা এক তোলা ওজন হইবে
ভবের ওজন ভাই
রতি হতে ঠিক তাই
হায় গো।
বে-ওজন মাল সেই খোদা নাহি লবে
ওজনের মূল এই
এক তোলা জানো ভাই
হায় গো।
কিসে হয় তোলা ঠিক জানিয়া লইবে
এক তোলা বাটখারা
দেখ সে কেমন ধারা
হায় গো।
সের মন কাঁচা পাকা তোলা ঠিক রবে
যথায় যে ওজন হয়
তোলা কভু নড়ে নাই
হায় গো।
শরিয়ত, মারফত তাহাতে জানিবে
ভবে যত কারবার
করিবারে পরোয়ার
হায় গো।
খাস ভাণ্ডারের তোলা ভেজে দেয় সবে
অচিন সে তোলা ভাই
এমান আমান তাই
হায় গো।
তাহার ওজনে সাঁই কবুল পড়িবে
হীন পাঞ্জু কেন্দে কয়,
সত্য করে বলি তাই
হায় গো
ভজন সাধন ভাই তোলাতে হইবে।
-(১৬)-
গুরু তুমি ফেলো না অধমে
বাঞ্ছা আছে গোলাম হবো তোমার কদমে
অযোগ্য হয়ে মুই
কদমেতে ছায়া চাই
সাঁই গো।
বাঞ্ছা হয় তব রূপ, ভাবি দমে দমে
তোমা পানে যে চায়
রিপু তার বাঁদী হয়
সাঁই গো।
রিপু শান্ত করি আমি বলো কোন কামে
দয়া করো দয়াময়
ভেবে দেখি বেলা নাই
সাঁই গো।
কোন ঘড়ি এসে মোরে ধরে নিবে যমে
চালাও সিদা রাহে সাঁই
তোমায় যেন ভুলি নাই
সাঁই গো
পাঞ্জু বলে এমান যে হয়
আল্লার নামে।
-(১৭)-
গুরু বস্তু না জেনে
এমন সাধের জনম
যায় রে যমের ভুবনে
স্বভাবের গুণে
কু-পথে গমনে
সে ধন সাধনে
বঞ্চিত হলি মন।
সেবা অপরাধী
নামে হলি বাদী
ঘিরে এলো শমনে
মন করিলি হেলা
ডুবে এলো বেলা
ভবপাড়ের ভেলা
শ্রীগুরুর চরণ।
ভজনবিহীন
হলি চিরদিন
চরণ পাবি কোন গুণে
করে ভবের খেলা
সুখে হলি ভোলা
ঘটে এলো জ্বালা
অন্তিম সামনে।
সাধনশূন্য দেহ
সুধাবে না কেহ
বোঝে না পাণ্ডুর মনে ।
-(১৮)-
চতুর্দলের ফল পাবি মন গাঁজা খেলে
নেশা বড়ো ধন দেখো রঙমহলে
আমার হুশার খোল, ব্রহ্মার কমণ্ডল
কৃষ্ণ দিলেন বাঁশি নৈচা করে
মহাদেবের বরে রে।
কলকে দিলেন মোর ধুতরা ফুলে
মদন-মোহন গন্ধমাদন
পাতাল-ভুবন ফিরছে রথে চড়ে
জগতের হরি রে।
তাই গাঁজাখোরের কপালে মেলে
কৈলাসের ভবানী, গোকুলের গোপিনী
শক্তি আহলাদিনী
দেখা হলে তখন বৃন্দাবন তমালে রে
পেড়ো কি মন্দিরে।
কাশী-মক্কা দোলে হৃদ কমলে
গাঁজাখোর পেলে সকালে বৈকালে
ঝিনুকেরই গড়ে যেমন মতি জ্বলে
অধীন পাঞ্জু বলে ছলে রে
মর্ম নাহি পেলে
পণ্ডিতের দলে মিথ্যা বলে।
-(১৯)-
চিনলি না মুর্শিদ রতন করলি না যতন
কিসে মন তুই হবি তারণ।
তোরে আর কি বলব মন, গেল জনম
না করলি সে চরণ সাধন।
বলি মন ভবের কারণ
করে গুমান আর কত কাল রবে জীবন।
যেদিন আসবে শমন, করবে দমন
লুটে নিবে মহারতন।
সরলকে করলে গরল
গরলকে করলে সরল, ওরে মনা।
চৌদিকে মহাগরল ও পাপী মন
কিসে পাবি চাঁদের কিরণ।
পাঞ্জু কাঁদে পড়ে ফাঁদে
ভব নদীর বিষম যাতন।
হিরুচাঁদ কাট এ ফাঁদ খোল নয়ন
নিজ গুণে দিয়ে চরণ।
-(২০)-
জাতির বড়াই কি
ইহকাল পরকাল জাতে করে কি
মনে বলে অগ্নি জ্বেলে দিব রে জাতির মুখি
এক জাতির বোঝা লয়ে মিছে হলাম বয়ে
চিরকাল কাটালাম আমি মানী মানুষ হয়ে
মানের গৌরব কুলের গৌরব ধন্ধবাজী সব দেখি।
যত লোক সব পেটের জ্বালায় দেশান্তরী হয়
হিন্দু-মুসলমানের বোঝা মাথায় করে বয়
কারবা জাতি কেবা দেখে ঘরে এলে চিহ্ন কি
জাতে অন্ন নাহি দিবে রোগে না ছাড়িবে।
পাপ করিলে কোম্পানী-জাত ধরে নিয়ে যাবে
মৃত্যু হলে যাবো চলে জাতির উপায় হবে কি
মন ডাকো আল্লা বলে কুলের গৌরব ফেলে
অকূলের কূল মালেক আল্লা তারে লেহ চিনে
পাঞ্জু বলে যত করলাম সকলই ফাঁকিঝুকি।
-(২১)-
তারে ধরবো কি সাধনে
ব্ৰহ্মা-আদি না পায় যারে যুগ-যুগান্তর বসে ধ্যানে ।
বেদ-পুরাণে পাবে না রে নীরূপ নিরাকারে
নিরাকারে জ্যোতির্ময়ে বসে আছে নিত্যস্থানে।
অনাদির আদি মানুষ আছে সে অতি গোপনে
সেই মানুষে সাধ্য করে রাধাকৃষ্ণ বৃন্দাবনে।
চিন্তামণি ভূমি-বৃক্ষ সেই কল্পমহী বনে
গোপীকৃপা যার হয়েছে, সেই পেয়েছে রত্ন ধনে।
সখি-রূপ যে দেখেছে সেই গুরুর ধিয়ানে
পাঞ্জু বলে সেই রসিকের দাসী হবো শ্রীচরণে।
-(২২)-
তিনটি রসের ভিয়ান যে জানে
সেই পাবে নিরঞ্জনে
শাম্ভু গরল সাধ্য করে
সেই সুধার মিলনে।
যেমন দুগ্ধ-জলে মিলন করিলে
হংস পাখি পান করে বেছে
রসিকজনা হংস হয়
সেই সুধার মিলনে।
অমাবস্যায় গরল প্রকাশে
অমূল্য হয় সাঁই আগমনে
অতি সাবধানে সাধন করে
প্রেমের রসিকগণে।
পদের শেষ দ্বিতীয়ার প্রথমে
রত্ন মেলে তিন রস মিলনে
অধীন পাঞ্জু বলে রত্ন পেলে
তারে ছোঁবে না শমনে।
-(২৩)-
ত্রিবেণীর তিনধারে সুধার জোয়ারে ভাসে
সুখ-সাগরে মানুষ খেলে বেহাল বেশে
উতালে সুধাসিন্ধু সুধারে সুধাবিন্দু
সুখময় সিন্ধুজলে ছলে সাঁতার খেলে।
জীব নিস্তারিতে জোয়ার এসে
ভ্রমর মানুষ যায় গো ভেসে
অমাবস্যায় তিথি নাস্তি জোয়ারে তিথি উক্তি
অমাবস্যা, প্রতিপদ দ্বিতীয়া তিন দিন চলে।
ধরবি যদি অধর মানুষ থাকো নদীর কূলে বসে
জোয়ারের ভাটা শেষে মানুষ যায় অচিন দেশে
কিছুকাল গুমান করে গোপনে তিন মৌজা ফোটে
সেদিন স্বরূপেতে কিরণ দিয়ে মানুষ যায় গোলকে মিশে।
অনুরাগী যে হইবে ত্রিবেণীর রূপ দেখিবে,
সহজে অধর ধরে যাবে ঐ চরণে মিশে
হিরুচাঁদ কয় মানুষ খুঁজে
পাঞ্জু মলি দেশ বিদেশে।
-(২৪)-
দম জেনে লও দমের মালা গলে
আল্লা মুহম্মদ আদমে
এক দমে তিন মেলে
আদমে সাঁইজির খেলা
জপ দম দমের মালা
দূর করো তসবি মালা
মন-মালায় ধন মেলে
মনের মানুষ দমে জপে
বসাও হৃদ-কমলে
আদমে দমের শুমার
এক লাখ চৌত্রিশ হাজার
রাতদিন জ্ঞান খবর
চব্বিশ হাজার মূলে
ভুলে আল্লা এক দম ফেলা
মানা হয় দলিলে
যে জপে দমের মালা
জানে সে কাবাতুল্লা
বায়তুল্লার ঘর আল্লাতালা
দিবেন তার দেলে
তাই জানিতে অধীন পাঞ্জু
ফিরতেছে বদ্হালে।
-(২৫)-
দয়াল গুরু ভুলে
জনম মায়ার ভোলে পড়ে রে
গেল বিফলে।
ভুল হলো মোর মূল সাধনে
কি বলে জবাব দিবো রে
নিকাশে কালে।
ভবনদী পারের বিধি
কি আমার আছে
ভজনশূন্য দেহ গুরু।
ছোঁবে কোন গুণে রে
অন্তিমকালে গুরুর চরণ
পারের সম্বল ভব-নদীতে।
মন হলি তুই ভক্তিহীন
চরণ মেলে কিসে রে
আমার কপালে।
ভুলে রলাম ভবের কূলে
কূল পাবো কিসে
ভেবে দেখ রে অবোধ মন তুই
হারা হলি দিশে রে
কূল গেল কূলে।
মনপ্রাণ দিন থাকিতে
সঁপো গুরুতে
এ দিন গেলে সে দিন পাবো
গুরু সখা হলে রে
পাঞ্জু তাই বলে।
-(২৬)-
দিন আমার গিয়াছে, দিনমণি লুকাইয়াছে
দীনবন্ধু গুরু কোথায় রয়েছে
মন আমার হয় উদাসী
কার সনে পোহাবো নিশি
মনের বাসনা মনে বসে রয়েছে
জানি কার বাসরে বন্ধু পালিয়েছে।
মন একা ভবে এলো
গুরু এসে দোসর হলো
পাষণ্ড মন আমার দোসর ছেড়েছে
তাইতো আশাবৃক্ষ ছেদন হয়েছে।
ঘোর নিশি চোখে ছানি
আমি হলাম একাকিনী
কিসে পোহাই রজনী কম্প হয়েছে
অধীন পাঞ্জু গুরুর দোহাই দিতেছে।
-(২৭)-
দিন থাকিতে গুরুর চরণ সত্য বলে ধরো
গুরুর চরণ ধরে ভবপারের উপায় কিছু করো
আসতে গুরু যাইতে গুরু একাল পরকাল
সুখ পেয়ে আনন্দে ভোলো দুঃখে ডেকে মরো।
সুখের সময় আনন্দেতে নিত্য সেবা করো
ঐ রূপ হৃদ-কমলে উদয় করে নামে ডঙ্কা মারো
যত্ন করলে রত্ন মেলে শুনি সাধুর দ্বারে
গুরুর যত্ন করে কত অধম পেয়েছে কিনারো।
অধীন পাঞ্জু বলে মোর কপালে এত ছিল ফ্যার
হিরুচাঁদ নিজ গুণে ভজনহীনে মনোবাঞ্ছা পোরো।
-(২৮)-
দীনের রাসুল এসে আরব শহরে দীনের বাতি জ্বেলেছে
দীনের বাতি রাসুলের রূপ উজালা করেছে।
মুহম্মদ নাম নুরুতে হয় নবুয়তে নবি নাম কয়
রাসুলউল্লা ফানাফিল্লা আল্লাতে মিশেছে।
মুহম্মদ হন সৃষ্টিকর্তা নবি নামে ধর্মদত্তা
শরিয়তের ভেদ ওতে রেখে শরা বুঝায়েছে ।
জাহেরা ভেদ জাহেরাতে আশেকের ভেদ পুশিদাতে
মহর-নবুয়ত আশকদারকে দেখায়ে দিয়েছে।
রাসুল-রূপ যার মনে আছে তার মনের আঁধার ঘুচে গেছে
অধীন পাঞ্জু ভাব না জেনে ভ্রমেতে ভুলেছে।
-(২৯)-
ধরা যায় রে অধরে
যদি নিষ্ঠা হয় স্বরূপদ্বারে
মূলাধার সেই অটল বৃক্ষ
আছে দুটি ফল ধর।
লাল শ্বেত দুটি ফুল
মাতাপিতা নাম ধরে
অটলের বরাতি মানুষ
গড়েছে ফল মৈথুন করে।
অটল মানুষ নিজ রূপ
স্বরূপে সে রঙ ধরে
পিতামাতা পদ্মফুলে
ভাসিছে সমুদ্দুরে।
মহাযোগ সমুদ্দুরে
অটল রূপ ঝলক মারে
পাঞ্জু বলে তিরধারে
ধরো ভাটা জোয়ারে।
-(৩০)-
নবিকে চিনে করো ধ্যান
আহাম্মদে আহাদ মেলে
আহাদ মানে ছব্বহান।
আতিউল্লাহ আতিয়র রাসুল
দলিলে আছে প্ৰমাণ
আল্লার নুরে নবির জন্ম
নবির নুরে সারেজাহান।
নুরেজানে আদমতনে বসত
করে বর্তমান আওল
আখের জাহের বাতেন
চারি রূপে বিরাজমান।
বাতেনে গোপনে থেকে
জাহেরে দেন তরিক দান
তরিক ধরো, সাধন করো,
আখেরে পাবা আসান
বর্তমানে নাহি জেনে
পাঞ্জু হলো হতজ্ঞান ।
-(৩১)-
নবিকে চেনা হলো ভার
নবি না চিনিলে ভবে কেমনে হইবা পার
জেন্দা থেকে না পাইলে মলে তো পাবা না আর
খবর শুনি মদিনাতে নবি হলেন এন্তেকাল
হায়াতুল মোরসালিন বলে কেনো লিখলেন পরোয়ার
দেখে শুনে অনুমানে দেলে ধাঁধা হয় আমার
মনে বলে নবি মলে দুনিয়া রইত না আর
আছে সত্য নবি বর্ত চিনে করো রূপ নিহার
হিরচাঁদের চরণ ভুলে পাঞ্জু হলো ছারেখার
-(৩২)-
নিগূঢ় লীলা রসিকজনা জানে
যে অধিকারী হয় ভজনে
অবতারে হয় কাণ্ডারি জীবের
নিস্তার কারণে।
দয়া করো নিতাই রূপে
কারো কাছে হজরত নবি
সাঁই একা একেশ্বর।
কাহে হিন্দু কাহে মুসলমান
মিলজুল হও সাঁই সেবনে
কেহ পুরুষ, কেহ প্রকৃতি।
সর্ব ঘটে সাঁইর বসতি
করছে খেলা রসরতি
দেখি জগতময়।
এক দিকে হয় ব্রহ্মার সৃষ্টি
আর দিকে প্রেম সাধু জানে
নিত্যলীলা যত ইতি।
গুরু দেহে করে স্থিতি
যোগ্য দেহ তার
শুদ্ধ ভক্তি অহৈতুকী
মূঢ় পাঞ্জুর ঘটবে কেনে।
-(৩৩)-
পাপের কারখানা
গুরুর বাক্য কেটে সাধু হবা
মনে ভেবো না
গুরু সুখের সুখী হবা
অন্তিমে শ্রীচরণ পাবা
মন রে।
তাই বলে কুল নাশ করিলে
মদনজ্বালা গেল না
রস না জেনে রসিক হলে
গুরুনিষ্ঠা না করিলে
মন রে।
মদ-খাওয়া মাতালের মতো
মাতালে চরণ পাবা না
বাঞ্ছা ছিল ভজন করে
ভবসিন্ধু যাব তরে
মন রে
পাঞ্জু বলে রিপুর দোষে
হয়ে গেল দিনকানা।
-(৩৪)-
বিনা সাধনে তার কি ধরা যায়
বেদ-পুরাণে যার চিহ্ন নাই
আসমান-জমিন জোড়া মানুষ
মাকড়ার জালে ছাপিয়ে রয়।
কিঞ্চিৎ রূপে জগত আলো
চর্মচোখে টের না পায়
দিব্য নয়ন হলে পরে
দেখতে পায় সে জ্যোতির্ময়।
নিরাকারে জ্যোতির্ময় সে
তারই আকার জগতময়
নীরের হিল্লোলে মানুষ
স্বরূপ দ্বারে বারাম দেয়।
দেখলে সে দ্বার হয় চমৎকার
জীবে কি তার মর্ম পায়
পাঞ্জু বলে সাধুজনে
যোগ-সাধনে ধরে তাই।
-(৩৫)-
মবুদ আল্লার খবর না জানি
আছে নির্জনে সাঁই নিরঞ্জনমণি
অতি নিগুম ঘরে বিরাজ করে সাঁই গুণমণি
তথা নাহি দিবা রজনী
যখন নাহি ছিল আসমান আর জমিন
অন্ধকারে হেমন্ত বাও বইছিল আপনি
সেই বাতাসে গায়বি আওয়াজ হলো তখনি
তা জানেন জগত জননী।
সেই আওয়াজ ভরে ডিম্ব হয় শুনি
ডিম্ব ভেঙে আসমান-জমিন গঠনের রব্বানি
শুনি সাততালা আসমানের পরে রয়েছেন তিনি
আছে অচিন মানুষ অচিনি।
সেই ডিম্বের খেলা আদমে খেলে
চেতন মুর্শিদ চিনে ধরলে সে ভেদ জানাবে
পাঞ্জু বলে না ডুবিলে রতন কি মেলে
ডুবলে হবি ধনী।
-(৩৬)-
শুধু কি আল্লা বলে ডাকলে তারে
পাবি ওরে মন পাগেলা
যে ভাবে আল্লাতালা বিষম লীলা
ত্রিজগতে করছে খেলা।
কতজন জপে মালা তুলসীতলা
হাতে ঝোলে মালার ঝোলা
আরো কত হরি বলি মারে তালি
নেচে গেয়ে হয় মাতেলা।
কত জন হয় উদাসী তীর্থবাসী
মক্কাতে দিয়েছে মেলা
কেউবা মসজিদে বসে তাঁর উদ্দেশ্যে
সদায় করছে আল্লা আল্লা।
স্বরূপে মানুষ মিশে স্বরূপ দেশে
বোবায় কালায় নিত্য লীলা
স্বরূপের ভাব না জেনে চাম কিনে
হচ্ছে কত গাজির চেলা।
নিত্য সেবায় নিত্য লীলা চরণ মালা
ধরা দিবে অধর কালা
পাঞ্জু তাই করে হেলা ঘটলো জ্বালা
কি হবে নিকাশের বেলা।
পাঞ্জু শাহ কেবল একজন গীতিকার ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন অধ্যাত্ম-বিজ্ঞানী। তাঁর ৩৬টি গানের এই সংকলনটি পাঠ করলে বোঝা যায়, তিনি মানুষকে কেবল রক্ত-মাংসের পুতুল হিসেবে দেখেননি, বরং মানুষকে দেখেছেন স্রষ্টার শ্রেষ্ঠ আয়না হিসেবে। ‘জাতির বড়াই কি’ কিংবা ‘আগে দেহের খবর জানো’ এমন শক্তিশালী বাণীর মাধ্যমে তিনি সমাজ সংস্কারকের ভূমিকাও পালন করেছেন।
শৈলকুপার এই মরমি কবির জীবন ও সৃষ্টি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সত্যের পথ কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের বেড়াজালে আবদ্ধ নয়; বরং তা হৃদয়ের সরলতা আর গুরুর প্রতি সমর্পণের ওপর দাঁড়িয়ে। 'বাউল পানকৌড়ি'র এই ক্ষুদ্র প্রয়াস পাঞ্জু শাহের মতো মহাজনের আলো ছড়িয়ে দিতে সামান্য সহায়ক হলেও আমাদের পরিশ্রম সার্থক।
পাঞ্জু শাহ সম্পর্কিত সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন ১: পাঞ্জু শাহ কে ছিলেন?
উত্তর: পাঞ্জু শাহ (১৮৫১-১৯১৪ খ্রিস্টাব্দ) ছিলেন একজন বাউল, ফকির, সুফি দার্শনিক ও মরমি গীতিকার। তিনি ফকির লালন সাঁইয়ের সমসাময়িক ও আদর্শগত অনুগামী ছিলেন। ঝিনাইদহের শৈলকুপায় জন্ম নেওয়া এই সাধক তাঁর গানের মাধ্যমে মানবদেহতত্ত্ব, প্রেম ও স্রষ্টার অধর রূপকে ফুটিয়ে তুলেছেন।
প্রশ্ন ২: ‘ছহি ইস্কি ছাদেকী গওহোর’ বইটি কী?
উত্তর: এটি পাঞ্জু শাহ রচিত একমাত্র কাব্যগ্রন্থ, যার অর্থ ‘সত্যিকারের প্রেমের মুক্তা’। ১৮৯০ সালে প্রকাশিত এই বইটি সুফি দর্শন, নৈতিক উপদেশ ও আধ্যাত্মিক জাগরণের পথনির্দেশিকা হিসেবে বিবেচিত। তিনি বিশ্বাস করতেন, এই বই পড়লে আল্লাহর ভেদ জানা যায়।
প্রশ্ন ৩: পাঞ্জু শাহের গানের মূল বিষয়বস্তু কী?
উত্তর: তাঁর অধিকাংশ গানই ‘অধর মানুষ’ বা ‘দেহতত্ত্ব’-কে কেন্দ্র করে। তিনি মানুষকে স্রষ্টার আয়না মনে করতেন। তাঁর গানে রয়েছে প্রেম, গুরুবাদ, দেহের কারখানা, নদী-জোয়ারের রূপক, এবং ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে সরল বার্তা।
প্রশ্ন ৪: তিনি কি লালন সাঁইয়ের শিষ্য ছিলেন?
উত্তর: সরাসরি শিষ্য না হলেও, পাঞ্জু শাহ লালন সাঁইয়ের চিন্তা, সাধনপদ্ধতি ও দর্শনে প্রবলভাবে প্রভাবিত ছিলেন। লালনের মৃত্যুর পর বাউল-ফকির সমাজে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, পাঞ্জু শাহ তা অনেকটাই পূরণ করেন বলে মনে করা হয়।
প্রশ্ন ৫: পাঞ্জু শাহের ভাষা ও শিক্ষাগত যোগ্যতা কেমন ছিল?
উত্তর: তিনি স্কুলে পড়েননি। তবে বাড়িতে গৃহশিক্ষকের কাছে আরবি ও ফারসি শিখেছিলেন। পিতা বাংলা শিক্ষার বিরোধী ছিলেন, তাই তিনি ১৬ বছর বয়সে গোপনে বাংলা ভাষা শিখেন এবং পরবর্তীকালে তাঁর সমস্ত গান বাংলাতেই রচনা করেন।
প্রশ্ন ৬: ‘আগে দেহের খবর জানো’ গানের তাৎপর্য কী?
উত্তর: এই বিখ্যাত গানটি পাঞ্জু শাহের ‘দেহতত্ত্ব’-এর মূলমন্ত্র। তিনি বলেছেন, দেহই হলো বাস্তবের মূল মন্দির। দেহের খবর (শ্বাস, রতি, গুরু-চেতনা) না জানলে জন্ম বৃথা। এটি বাউল দর্শনের সর্বোচ্চ সত্য।
প্রশ্ন ৭: তিনি কি সাম্প্রদায়িক ছিলেন?
উত্তর: একেবারেই না। তাঁর গানে (যেমন: ‘জাতির বড়াই কি’) তিনি হিন্দু-মুসলমান বিভেদের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি মনে করতেন, মানুষ চেনাটাই প্রধান কর্তব্য, জাত নয়। তিনি স্রষ্টাকে একেশ্বর বা সর্বব্যাপী রূপে দেখেছেন।
প্রশ্ন ৮: পাঞ্জু শাহের মাজার কোথায়?
উত্তর: তাঁর মাজার ঝিনাইদহ জেলার হরিশপুরে অবস্থিত। তাঁর পিতা সেখানেই স্থায়ী হয়েছিলেন এবং পাঞ্জু শাহ তাঁর জীবনের অধিকাংশ সময় এবং শেষ নিঃশ্বাস সেখানেই ত্যাগ করেন।
প্রশ্ন ৯: সংকলনে ৩৬টি গান কেন গুরুত্বপূর্ণ?
উত্তর: এই সংকলনটি তাঁর দর্শনের একটি ‘মিনি এনসাইক্লোপিডিয়া’। এখানে রয়েছে ‘আল্লার বান্দা কিসে হয়’ (নিষ্ঠা), ‘অধর চাঁদ মেলে’ (আত্মদর্শন), ‘পাপের কারখানা’ (আত্মশুদ্ধি) এবং ‘তিনটি রসের ভিয়ান’ (শারীরিক ও আধ্যাত্মিক মিলন)-এর মতো বিষয়, যা ফকিরি সাধনার মূল চাবিকাঠি।
প্রশ্ন ১০: ‘হিরুচাঁদ’ ও ‘পাঞ্জু’ শব্দ দুটি তাঁর গানে কেন বারবার আসে?
উত্তর: বাউল-ফকিরি ধারায় গায়ক নিজের নামটি শেষ পঙক্তিতে ব্যবহার করেন (যাকে ‘ভণিতা’ বলে)। ‘পাঞ্জু’ হলো তাঁর ডাক নাম, আর ‘হিরুচাঁদ’ সম্ভবত তাঁর গুরু বা আধ্যাত্মিক সহচর। তিনি গানের শেষে তাঁদের উদ্দেশে বার্তা দিতেন।

.jpg)