সম্রাট আকবরের ক্রোধে, তেরে আসে মানসিংহের বাহিনীপাঁচ সেপ্টেম্বর মোঘল রণতরী, ঘিরে বাংলার সেনানি।বাধে যুদ্ধ লড়ে ঈশা খাঁ, মোঘল বাহিনীর ত্রাহি দশাবীর বিজয়ী বীর সে গাথা,জানো কি?
উপরের লাইন গুলো প্রিয় ব্যান্ড নোভার একটি গান। সেই স্কুল সময়ের গান ঈশা খাঁ। আজকে ঈশা খাঁয়ের কথা আর তাঁর সমাধি কোথায় এই নিয়েই লেখা। আমরা যে কেউ অলস সময়ে অলস ভ্রমনে একবার হলে দেখে আসতে পারি তাঁর সমাধি এক বীরের সমাধি। অনেকেই মনে করে ঈশা খাঁর রাজধানী সোনারগাঁতে ছিলো তাঁর সমাধি হয়তো সোনারগাঁয়ে আছে। এই তথ্যটি ভুল কারন ঈশা খাঁ সমাধি রয়েছে গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার বক্তারপুর গ্রামে। ২০২১ সালে ১ ডিসেম্বর আধুনিক স্থাপত্যশৈলীর সমাধি (সংস্কার-পরবর্তী) নির্মাণ শেষে দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। কালীগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশল বিভাগের তত্ত্বাবধানে ‘ঈশা খাঁ’র সমাধিস্থলে লাল সিরামিক ইট দিয়ে প্রাচীন নির্মাণ কৌশলসমৃদ্ধ সাড়ে ১৭ ফিট উচ্চতার এবং ২৪ ফিট দৈর্ঘ্য ও প্রস্থের একটি আধুনিক স্থাপত্যশৈলীর সমাধিস্থ নির্মাণ করা হয়েছে।
ঈশা খাঁর সমাধি: সোনারগাঁ নয়, গাজীপুরের বক্তারপুরে
বাংলার ইতিহাসের এক উজ্জ্বল নাম বরিশালের বারো ভুঁইয়াদের অন্যতম প্রধান নেতা ঈশা খাঁ। তার শাসনামল, বীরত্ব ও অবদান এখনো মানুষের মনে জাগ্রত। কিন্তু একটি প্রশ্ন প্রায়ই জাগে ঈশা খাঁর রাজধানী ছিল নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ। অথচ তাঁর সমাধি কেন গাজীপুরের বক্তাপুর (বক্তারপুর) গ্রামে?
- রাজধানী সোনারগাঁ, সমাধি বক্তারপুরে
ঈশা খাঁ ছিলেন সোনারগাঁ, গাজীপুরের কালীগঞ্জের বক্তারপুর, কিশোরগঞ্জের এগারসিন্ধু এবং আরও ২২টি পরগনার শাসক। তাঁর রাজধানী ছিল সোনারগাঁ, যা ছিল বাংলার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র। কিন্তু শুধু রাজধানী থেকেই তাঁর কার্যক্রম সীমাবদ্ধ ছিল না। মোগল শাসকদের সাথে তাঁর একাধিক যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। যুদ্ধের প্রস্তুতি ও প্রতিরোধের জন্য তিনি এগারসিন্ধু ও বক্তারপুরে শক্তিশালী দুর্গ নির্মাণ করেছিলেন। বক্তারপুরে নির্মিত এই দুর্গ ছিল তাঁর সামরিক কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
- মৃত্যুর শেষ অধ্যায়
জীবনের শেষদিকে ঈশা খাঁ সোনারগাঁয় ফেরার পথে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তিনি বক্তারপুর দুর্গেই অবস্থান নেন এবং সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৫৯৯ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ৭০ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কেন তিনি সোনারগাঁয় ফিরে যাননি? ইতিহাসবিদদের মতে, তাঁর শারীরিক অবস্থা এতটাই সংকটাপূর্ণ ছিল যে দূরপথ অতিক্রম করা সম্ভব ছিল না। আর বক্তারপুর দুর্গ ছিল তাঁর নিজের নির্মিত এবং যুদ্ধের সময় তিনি সেখানে অনেক সময় কাটিয়েছেন। এটি ছিল তাঁর জন্য একটি পরিচিত ও নিরাপদ স্থান।
- শেষ ইচ্ছা ও সমাধি
ঈশা খাঁর শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী তাঁকে বক্তারপুর দুর্গের দিঘির পশ্চিম পাড়ে সমাহিত করা হয়। কেন তিনি এই স্থানটি বেছে নিয়েছিলেন? সম্ভবত এই দুর্গ ও দিঘি ছিল তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এখানে তিনি যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়েছেন, প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন, হয়তো এখানেই তাঁর অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। তাই শেষ ইচ্ছায় তিনি এই স্থানটিকেই বেছে নিয়েছিলেন।
- ইতিহাসের সাক্ষী
কালের বিবর্তনে ঈশা খাঁর সমাধির চিহ্ন হারিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু প্রায় ৩০-৩৫ বছর আগে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ কবরটি ঈশা খাঁর বলে চিহ্নিত করে। ২০০৪ সালে উপজেলা প্রশাসন সমাধিতে বেষ্টনি প্রাচীর নির্মাণ করে। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক এফ বি ব্রাডলি-বার্ট তাঁর ১৯০৬ সালে প্রকাশিত "দ্য রোম্যান্স অফ অ্যান ইস্টার্ন ক্যাপিটাল" গ্রন্থের ৬২ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন- "বর্তমান কালীগঞ্জ উপজেলার বক্তারপুরে ঈশা খাঁর কবর অবস্থিত"।
ঈশা খাঁর সমাধি বক্তারপুরে হওয়ার পেছনে রয়েছে যুদ্ধ-বিগ্রহের প্রস্তুতি, অসুস্থতা ও শেষ ইচ্ছার মিলন। এটি তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায়ের সাক্ষী হয়ে রয়েছে। যদিও তাঁর রাজধানী ছিল সোনারগাঁ, বক্তারপুর ছিল তাঁর প্রতিরোধের কেন্দ্র। যেখানে তিনি মোগলদের মোকাবিলার প্রস্তুতি নিয়েছেন। যেখানে তাঁর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ এবং যেখানে চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছেন এই বীর সেনানী। আজ বক্তারপুরের সেই সমাধি আমাদের ইতিহাসের এক গৌরবময় অধ্যায়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। ঈশা খাঁ শুধু সোনারগাঁর রাজা ছিলেন না, তিনি ছিলেন বক্তারপুরের মাটিতেও অমর হয়ে থাকা এক মহান বীর।
ঈশা খাঁর জীবন ও উত্থান (১৫২৯-১৫৯৯)
বাংলার ইতিহাসে এমন কিছু নাম আছে যা সময়ের আবর্তনেও ম্লান হয়নি। তেমনি একটি নাম ঈশা খাঁ। পূর্ববাংলার স্বাধীন বারো ভুঁইয়াদের অন্যতম প্রধান নেতা, মোগল শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক, এবং বাংলার সার্বভৌমত্বের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আসুন জানি এই মহাবীরের জীবনসংগ্রামের কাহিনি।
জন্ম ও বংশপরিচয়
১৫২৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ই আগস্ট সুলতানি শাসনভুক্ত ভাটি অঞ্চলের সরাইলে (বর্তমান ব্রাহ্মণবাড়িয়া) জন্মগ্রহণ করেন ঈশা খাঁ।
পিতৃপরিচয়
- পিতা: সোলায়মান খাঁ। সোলায়মান খাঁ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল পরগণা ও পূর্ব মোমেনশাহী অঞ্চলের জমিদারি লাভ করেন।
- বংশ: আফগানিস্তানের সোলায়মান পার্বত্য অঞ্চলের এক আফগান দলপতির বংশধর
- মাতা: সৈয়দা মোমেনা খাঁতুন (সুলতান গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ শাহের কন্যা)
- ছোট ভাই: ইসমাইল খাঁ
- বোন: শাহিশা বিবি
শৈশবের করুণ পরিণতি
১৫৪৫ খ্রিষ্টাব্দে ঘটে যায় এক মর্মান্তিক ঘটনা। শের শাহ সুরির পুত্র ইসলাম শাহ সুর যখন সম্রাট। তখন সোলায়মান খাঁ সম্রাটের আনুগত্য অস্বীকার করায় কারনে কৌশলে তাঁকে হত্যা করে। ফলে রাজার ক্রোধের শিকার হয়ে অপ্রাপ্তবয়স্ক দুই পুত্র ঈশা খাঁ ও ইসমাইল খাঁ-কে একদল তুরানি বণিকের নিকট বিক্রি করা হয়। ছেলেবেলা থেকেই নিষ্ঠুর ভাগ্যের সাথে পরিচয় হয়েছিল ঈশা খাঁর। ক্রীতদাস হিসেবে তুরানে বিক্রি হওয়া এই বালকটি জানতেও পারেনি যে একদিন তিনি বাংলার বুকে মোগল সম্রাটের সঙ্গে লড়াই করবেন।
উদ্ধার ও পুনরুত্থান
১৫৬৩ খ্রিষ্টাব্দে ভাগ্যের চাকা ঘুরে দাঁড়ায়। ঈশা খাঁর চাচা কুতুব খাঁ রাজকার্যে নিযুক্তি লাভ করে ভ্রাতুষ্পুত্রদের সন্ধান শুরু করেন। বহু অনুসন্ধানের পর তুরানের এক ধনাঢ্য ব্যক্তির কাছ থেকে প্রচুর অর্থের বিনিময়ে দুই ভাইকে উদ্ধার করেন। তখন ঈশা খাঁর বয়স ছিল ২৭ বছর। শৈশবের সকল বঞ্চনা আর দাসত্বের গ্লানি ঝেড়ে ফেলে তিনি নতুন করে জীবন শুরু করার প্রস্তুতি নেন।
জমিদারি লাভ ও উত্থান
১৫৬৪ খ্রিষ্টাব্দে বাংলার সুলতান তাজ খান কররানী সিংহাসনে আরোহণ করলে ঈশা খাঁকে তাঁর পিতার জমিদারি সোনারগাঁও ও মহেশ্বরদী পরগনা ফেরত দেওয়া হয়। ১৫৭১ খ্রিষ্টাব্দের দিকে তিনি একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনী গঠন করেন এবং ধীরে ধীরে পূর্ববাংলার অন্যতম শাসকে পরিণত হন।
উল্লেখযোগ্য ঘটনা:
- ১৫৭৩ খ্রিষ্টাব্দে: ত্রিপুরার মহারাজা উদয় মানিক্যের বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম অভিযানে দাউদ খান কররানীকে সহায়তা করেন
- ১৫৭৫ খ্রিষ্টাব্দে: সোনারগাঁও সংলগ্ন এলাকা থেকে মুঘলের নৌবাহিনী বিতাড়িত করতে কররানী বাহিনীকে সাহায্য করেন
এই অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি 'মসনদ-ই-আলা' উপাধি লাভ করেন।
মোগলদের সাথে প্রতিরোধ সংগ্রাম
১৫৭৬ খ্রিষ্টাব্দের ১২ জুলাই ঘটে যায় ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। রাজমহলের যুদ্ধে মোগল সম্রাট আকবরের সেনাপতি হোসেনকুলী বেগের কাছে সুলতান দাউদ খান পরাজিত ও নিহত হন। এরপর সাতগাঁও মোগল সাম্রাজ্যভুক্ত হয়। এই সময় আফগান দলপতি ও ভূঁইয়াগণ ঈশা খাঁর নেতৃত্বে ভাটি অঞ্চলে মোগলদের বিরুদ্ধে পুনরায় লড়াইয়ের প্রস্তুতি নেন।
- কাসতুলের নৌ-যুদ্ধ (১৫৭৮)
বিদ্রোহ দমনে হোসেনকুলী বেগ ভাটি অঞ্চলে অভিযান চালান। প্রাথমিকভাবে কিছু সাফল্য পেলেও কাসতুলের নৌ-যুদ্ধে তাঁর বাহিনী ঈশা খাঁর কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। এটি ছিল ঈশা খাঁর প্রথম বড় বিজয়।
- মানসিংহের সাথে সংঘর্ষ
১৫৯৪ খ্রিষ্টাব্দে মোগল সম্রাট আকবর মানসিংহকে বাংলার শাসক করে পাঠান। পূর্ববঙ্গকে মোগল শাসনাধীনে আনার জন্য মানসিংহ ঈশা খাঁর বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেন।
- টাঙ্গারের যুদ্ধ (১৫৯৬)
ব্রহ্মপুত্র ও শীতলক্ষ্যা নদীর সম্মিলনস্থলে (বর্তমান ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার টাঙ্গার গ্রামে) মোগল বাহিনী ও ঈশা খাঁর বাহিনীর মধ্যে যুদ্ধ হয়। কিন্তু ঈশা খাঁকে পরাজিত করা সম্ভব হয়নি।
- চূড়ান্ত সংঘর্ষ (১৫৯৭)
১৫৯৭ সালের সেপ্টেম্বরে মানসিংহ স্থল ও জলপথে বিশাল বাহিনী প্রেরণ করেন। প্রথমে কিছু সাফল্য পেলেও ৫ই সেপ্টেম্বর বিক্রমপুর থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে এক নৌ-যুদ্ধে মোগল সেনাপতি দুর্জন সিংহ নিহত হন এবং মোগল বাহিনী বিধ্বস্ত হয়।
পরাজয় স্বীকার করে মানসিংহ ঈশা খাঁর সাথে সন্ধি করতে বাধ্য হন। ১৫৯৮ খ্রিষ্টাব্দে হতোদ্যম মানসিংহ আজমীরের উদ্দেশ্যে বাংলা ত্যাগ করেন।
- সম্রাট আকবরের সাথে সাক্ষাত
যুদ্ধের পর ঈশা খাঁ মুঘলদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করেন এবং আগ্রায় গিয়ে সম্রাট আকবরের সাথে সাক্ষাত করেন। সম্রাট আকবর তাঁকে 'দেওয়ান' ও 'মসনদ-ই-আলা' উপাধিতে ভূষিত করেন। এটি ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম কূটনৈতিক সাফল্য।
জীবনের শেষ অধ্যায়
১৫৯৯ খ্রিষ্টাব্দে ঘটে যায় এক দুঃখজনক ঘটনা। ঈশা খাঁ কেদার রায়ের বিধবা কন্যা স্বর্ণময়ীকে অপহরণ করলে ক্রুদ্ধ কেদার রায় ঈশা খাঁর রাজধানী আক্রমণ করেন। প্রাণভয়ে ঈশা খাঁ মেদিনীপুর পালিয়ে যান এবং কেদার রায় তাঁর প্রায় সম্পূর্ণ জমিদারির দখল নিয়ে নেন। এরপর ঈশা খাঁ অজ্ঞাত রোগে তাঁর স্ত্রী ফাতেমা খানের বাড়ি ফুলহরি (ফুলদি) জমিদার বাড়িতে ১৫৯৯ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৭০ বছর।
- ঈশা খাঁর চরিত্র ও অবদান
মোগলদের বিশাল বাহিনীর সামনে দাঁড়িয়ে তিনি যেভাবে নিজের দেশ ও মাটিকে রক্ষা করেছিলেন, তা বিশ্ব ইতিহাসে বিরল। কাসতুলের নৌ-যুদ্ধ থেকে মানসিংহের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ প্রতিটি যুদ্ধে তাঁর নেতৃত্ব ও রণকৌশল অতুলনীয়।
- কূটনৈতিক প্রজ্ঞা
শুধু যুদ্ধে নয়, কূটনীতিতেও তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। যুদ্ধ শেষে সম্রাট আকবরের সাথে সাক্ষাত করে 'দেওয়ান' উপাধি লাভ তাঁর কূটনৈতিক দক্ষতার পরিচয় দেয়।
- স্বাধীনতার প্রতীক
ঈশা খাঁ কেবল একজন শাসক ছিলেন না, তিনি ছিলেন বাংলার স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক। তাঁর জীবন আমাদের পূর্ববাংলার স্বাধীন ভূঁইয়াদের সাহসিকতা, কৌশল এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞার এক জীবন্ত উদাহরণ।
- ঐতিহাসিক মূল্যায়ন
ঈশা খাঁর জীবন সংগ্রামে ভরা। শৈশবে ক্রীতদাস হয়েছিলেন, আবার বাংলার স্বাধীনতার অন্যতম স্তম্ভ হয়েছিলেন। বাংলার মাটি ও মানুষকে ভালোবেসে তিনি মোগলদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন, আবার প্রয়োজনমতো কূটনীতিও অবলম্বন করেছেন।
ইতিহাসবিদ ড. জসীম উদ্দিন আহমদ তাঁর সম্পর্কে লিখেছেন-"ঈশা খাঁ ছিলেন মধ্যযুগীয় বাংলার সবচেয়ে শক্তিশালী ও স্বাধীনচেতা শাসকদের অন্যতম, যিনি মোগল শক্তির বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত মাথা নত করেননি।"
ভ্রমণ নির্দেশিকা: কীভাবে যাবেন?
ধাপ ১: ঢাকা থেকে কালীগঞ্জ
- বাসযোগে: ঢাকার গাবতলী, মহাখালী বা সায়েদাবাদ থেকে গাজীপুরের কালীগঞ্জ行ী বাসে উঠুন। অনেক বাস সরাসরি কালীগঞ্জ যায়।
- ট্রেনযোগে: ঢাকা থেকে ট্রেনে গাজীপুর ক্যান্টনমেন্ট বা গাজীপুর স্টেশন নেমে সেখান থেকে সিএনজি/অটোরিকশায় কালীগঞ্জ যেতে পারেন।
- ভাড়া: বাসভাড়া ১৫০-২৫০ টাকা (যানবাহনভেদে)।
ধাপ ২: কালীগঞ্জ থেকে বক্তারপুর
- কালীগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড বা শহর থেকে স্থানীয় অটোরিকশা, সিএনজি বা ভ্যান দিয়ে বক্তারপুর গ্রামে যেতে পারবেন।
- দূরত্ব: প্রায় ৫-৭ কিলোমিটার।
- ভাড়া: অটোরিকশায় ৫০-১০০ টাকা (ভাড়া নিয়ে একটু দরাদরি করতে পারেন)।
ধাপ ৩: বক্তারপুর গ্রামে পৌঁছে
- বক্তারপুর গ্রামে প্রবেশ করেই স্থানীয় লোকজনের কাছে "ঈশা খাঁর সমাধি" বা "পুরোনো দিঘির পশ্চিম পাড়ের কবর" বললে তাঁরা পথ দেখিয়ে দেবেন।
- সমাধিটি দিঘির পশ্চিম পাড়ে অবস্থিত, তাই দিঘি চোখে পড়লেই বুঝবেন আপনি সঠিক জায়গায় আছেন।
মাত্র কয়েক ঘণ্টার পথেই পৌঁছে যেতে পারেন বাংলার এক বীরপুরুষের শেষ ঠিকানায়। বক্তারপুরের সেই দিঘির পাড়ে দাঁড়িয়ে কল্পনা করুন এখানেই একসময় দুর্গ ছিল, এখানেই যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল, আর এখানেই চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন ঈশা খাঁ।
শেষকথা
ঈসা খাঁর জীবন আমাদের পূর্ববাংলার স্বাধীন ভূঁইয়াদের সাহসিকতা, কৌশল এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞার এক জীবন্ত উদাহরণ হিসেবে ইতিহাসে চিরস্মরণীয়। ঈশা খাঁ কেবল একজন শাসক ছিলেন না, তিনি ছিলেন বাংলার স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক।
মোগলদের বিশাল বাহিনীর সামনে দাঁড়িয়ে তিনি যেভাবে নিজের দেশ ও মাটিকে রক্ষা করেছিলেন, তা বিশ্ব ইতিহাসে বিরল। গাজীপুরের বক্তারপুরের এই নিভৃত সমাধিটি আজ কেবল একটি স্থাপনা নয়, বরং এটি আমাদের পূর্বপুরুষদের বীরত্বগাথার এক নীরব সাক্ষী।
সময়ের বিবর্তনে সোনারগাঁ বা এগারসিন্দুর অনেক কিছু বিলীন হলেও, বক্তারপুরের এই লাল ইটের আধুনিক সমাধিটি নতুন প্রজন্মের কাছে ঈশা খাঁকে নতুনভাবে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে। অবসরে এক বিকেলে আপনিও ঘুরে আসতে পারেন এই মহাবীরের শেষ ঠিকানায়, যেখানে ইতিহাসের ঘ্রাণ মিশে আছে প্রতিটি ধূলিকণায়।
ঈসা খাঁ ও তাঁর সমাধি সম্পর্কিত সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. অনেকে মনে করেন ঈসা খাঁর সমাধি সোনারগাঁয়ে, তবে প্রকৃত অবস্থান কোথায়?
উত্তর: এটি একটি প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণা। ঐতিহাসিক তথ্য ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, ঈসা খাঁর সমাধি নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁওয়ে নয়, বরং গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার বক্তারপুর গ্রামে অবস্থিত।
২. সমাধিটি বক্তারপুর গ্রামে কেন অবস্থিত?
উত্তর: ঈসা খাঁ তাঁর জীবনের শেষদিকে অসুস্থ অবস্থায় বক্তারপুর দুর্গে অবস্থান করেন এবং সেখানেই ১৫৯৯ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী তাঁকে দুর্গের দিঘির পশ্চিম পাড়ে সমাহিত করা হয়।
৩. ঈসা খাঁর সমাধিটি কেমন?
উত্তর: বর্তমানে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের তত্ত্বাবধানে এবং কালীগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশল বিভাগের সহায়তায় এটি একটি আধুনিক স্থাপত্যশৈলীতে পুনঃনির্মাণ করা হয়েছে। লাল সিরামিক ইট দিয়ে তৈরি এই সমাধিটি সাড়ে ১৭ ফুট উচ্চতার এবং এর দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ ২৪ ফুট। ২০২১ সালের ১ ডিসেম্বর এটি দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়।
৪. ঈসা খাঁ কি সোনারগাঁয়ের শাসক ছিলেন?
উত্তর: হ্যাঁ, ঈসা খাঁ সোনারগাঁ, বক্তারপুর, এগারসিন্ধুসহ ২২টি পরগনার শাসক ছিলেন। তবে বক্তারপুর ও এগারসিন্ধুতে তিনি মোগল আক্রমণের প্রতিরোধের জন্য দুর্গ নির্মাণ করেছিলেন।
৫. ঈসা খাঁ কোন উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন?
উত্তর: তিনি মোগল সম্রাট আকবরের কাছ থেকে ‘দেওয়ান’ ও ‘মসনদ-ই-আলা’ উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন।
৬. ঐতিহাসিক কোন গ্রন্থে তাঁর সমাধিস্থলের উল্লেখ পাওয়া যায়?
উত্তর: প্রখ্যাত ঐতিহাসিক এফ বি ব্রাডলি-বার্ট তাঁর ১৯০৬ সালে প্রকাশিত “The Romance of an Eastern Capital” গ্রন্থের ৬২ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন যে, বর্তমান কালীগঞ্জ উপজেলার বক্তারপুরে ঈসা খাঁ’র কবর অবস্থিত।
৭. ঢাকা থেকে ঈসা খাঁর সমাধিতে যাওয়ার উপায় কী?
উত্তর: প্রথমে ঢাকা থেকে গাজীপুরের কালীগঞ্জ যেতে হবে। সেখান থেকে স্থানীয় পরিবহনের মাধ্যমে বক্তারপুর গ্রামে যেতে হবে। বক্তারপুর পুরোনো দিঘির পশ্চিম পাড়েই এই ঐতিহাসিক সমাধিটি অবস্থিত।
৮. ঈসা খাঁ কত বছর বয়সে মারা যান?
উত্তর: ঈসা খাঁ ১৫২৯ সালে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৫৯৯ সালে ৭০ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।
৯. এই সমাধিস্থলটির রক্ষণাবেক্ষণ কে করে?
উত্তর: বর্তমানে এই ঐতিহাসিক সমাধিস্থলটি সরকারি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের তত্ত্বাবধানে রয়েছে।

.jpg)
.jpeg)
.jpeg)

.jpeg)