মুঘল স্থাপত্যের আভিজাত্য আর ইতিহাসের গভীরতা নিয়ে নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীতে সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে বজরা শাহী মসজিদ। ১৭৪১ সালে জমিদার আমান উল্লাহর হাত ধরে নির্মিত এই মসজিদটি কেবল একটি উপাসনালয় নয়, বরং এটি দিল্লির শাহী জামে মসজিদের এক অপূর্ব বঙ্গীয় সংস্করণ।
প্রায় ৩০০ বছরের পুরনো এই স্থাপনাটি তার রঙিন সিরামিক মোজাইক আর তিনটি বিশালাকার গম্বুজ নিয়ে আজও দর্শকদের বিমোহিত করে। মক্কা থেকে আসা ইমামের বংশধরদের হাতে পরিচালিত এই পুণ্যভূমিকে কেন্দ্র করে রয়েছে অজস্র লোককথা ও মানতের বিশ্বাস। আজকের আয়োজনে চলুন দেখে আসি মুসলিম সভ্যতার এক অনন্য নিদর্শন বজরা শাহী মসজিদ।
বইপত্র পড়ে জানা যায় ১৭৪১-৪২ সালে জমিদার আমানুল্লাহ ৩০ একরের একটি জমিতে এক বিশাল দীঘি খনন করে তার পাশে এই আকর্ষণীয় মসজিদটি গড়ে তোলেন। দিল্লির শাহী জামে মসজিদের নকশার অনুকরণে আদল দেওয়া এ মসজিদটি ১১৫৪ হিজরি, ১১৩৯ বাংলা মোতাবেক ১৭৪১ ইংরেজি সালে নির্মিত হয়।
নামকরণের ইতিহাস ও জমিদার আমান উল্লাহর অবদান
মুঘল সম্রাট মুহাম্মদ শাহের নির্দেশে বজরায় (নৌযান) করে রাজ্য পরিদর্শনে বের হন জমিদার আমান উল্যাহ। তাঁকে নির্দেশ দেওয়া হয় যেখানে রাজ্য পরিদর্শন শেষ হবে সেখানে যেন একটি মসজিদ নির্মাণ করা হয়।
পরিদর্শন শেষে নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীতে বসতি স্থাপন করেন আমান উল্যাহ। সেখানে একটি দিঘি খননের পর এর পাড়ে দিল্লির শাহী মসজিদের আদলে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন তিনি। জমিদার আমান উল্যা বজরায় এসে যেখানে বসতি স্থাপন করেন এলাকাটির নাম হয়ে উঠে বজরা।
মসজিদটিও পরে খ্যাতি পায় বজরা শাহী মসজিদ নামে। ১৯১১ থেকে ১৯২৮ সালের মাঝামাঝি সময়ে বজরা জমিদার খান বাহাদুর আলী আহমদ ও খান বাহাদুর মুজির উদ্দিন আহমদ মসজিদটি ব্যাপকভাবে মেরামত করেছিলেন এবং সিরামিকের মোজাইক দিয়ে সজ্জিত করেছিলেন।
অনন্য স্থাপত্যশৈলী ও অলংকরণ
বজরা শাহী মসজিদের স্থাপত্যশৈলী যেন একখানি মুঘল স্থাপত্যের জীবন্ত পাঠশালা। দিল্লির শাহী মসজিদের আদলে নির্মিত এই মসজিদটির প্রতিটি অঙ্গই নান্দনিকতায় ভরপুর। চলুন জেনে নিই এর স্থাপত্যের বিস্তারিত:
- আকার ও গঠনকাঠামো
মসজিদটি আয়তাকার, যা উত্তর-দক্ষিণে লম্বা এবং এর দৈর্ঘ্য ১৬ মিটার ও প্রস্থ ৭.৩২ মিটার। বাইরের চার কোণায় রয়েছে অষ্টভুজাকৃতির বুরুজ, যা মুঘল স্থাপত্যের সাধারণ বৈশিষ্ট্য। ছাদের ওপর তিনটি কন্দাকৃতির গম্বুজ আছে, যেগুলো অষ্টকোণাকার। প্রতিটি গম্বুজের শীর্ষে রয়েছে পদ্ম ও কলস চূড়া, যা অত্যন্ত শোভন।
- দরজা ও প্রবেশপথ
মসজিদে প্রবেশের জন্য পূর্ব পাশে রয়েছে তিনটি দরজা, আর উত্তর ও দক্ষিণ পাশে রয়েছে একটি করে দরজা সুতরাং মোট পাঁচটি দরজা। প্রতিটি দরজাই বাইরের দিকে অভিক্ষিপ্ত বা সামান্য এগিয়ে আসা। প্রতিটি দরজার ওপর রয়েছে অর্ধগম্বুজাকৃতির ভল্ট, আর দরজার উভয় পার্শ্বে রয়েছে সরু মিনার, যা দরজাগুলোকে আরও আকর্ষণীয় করেছে।
- মিহরাব ও অন্তর্গত বিভাজন
পূর্বদিকের তিনটি দরজার সাথে সামঞ্জস্য রেখে কিবলা দেয়ালের ভেতরে রয়েছে তিনটি মিহরাব। এর মধ্যে মাঝের মিহরাবটি অন্যদুটির তুলনায় আকারে বড়, যা ইমামের স্থান নির্দেশ করে। মসজিদের অভ্যন্তরে দুটি কক্ষ রয়েছে, যা বহুখাঁজবিশিষ্ট আড়াআড়ি খিলান দ্বারা তিনটি ভাগে বিভক্ত। এই খিলানপ্রণালী মসজিদের ভেতরের স্থাপত্যকে করেছে জটিল ও নান্দনিক।
- অলংকরণের বৈচিত্র্য
মসজিদটির অলংকরণের প্রধান উপাদান হলো রঙিন সিরামিক মোজাইক। উল্লেখ্য, ১৯১১ থেকে ১৯২৮ সালের মধ্যে সংস্কারকালে দেয়ালে এই রঙিন সিরামিকের মোজাইক যুক্ত করা হয়, যা মুঘল স্থাপত্যের সাথে বঙ্গীয় শৈলীর এক অপূর্ব মিশ্রণ ঘটিয়েছে। এছাড়া গম্বুজের পদ্ম-কলস চূড়া ও দরজার পাশের সরু মিনার পুরো মসজিদের চেহারাকে করে তুলেছে মনোরম।
- মুঘল-বঙ্গীয় সংমিশ্রণ
মসজিদটির মূল পরিকল্পনা যদিও দিল্লির শাহী মসজিদের অনুসারী, তবে এর আকার-আয়তন, সিরামিক ব্যবহার ও গম্বুজের পদ্ম-কলস চূড়া বঙ্গীয় আঞ্চলিক শৈলীর প্রভাব বহন করে। ফলে এটি মুঘল ও বঙ্গীয় স্থাপত্যের এক অনন্য মিলনস্থল।
প্রায় তিনশ বছর আগে নির্মিত এই মসজিদের নির্মাণশৈলী, অলংকরণ ও নিখুঁত স্থাপত্য জ্ঞান আজও দর্শকদের বিমোহিত করে। এটি মুসলিম সভ্যতার এক অনন্য নিদর্শন হিসেবে নোয়াখালীর বুকে সগৌরবে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ভ্রমণপ্রেমী বা ইতিহাসপিপাসু যে-কেউ এখানে এসে মুগ্ধ হবেন এই অপূর্ব শিল্পকর্ম দেখে।
মক্কা শরীফের ইমাম ও ধর্মীয় ঐতিহ্য
বজরা শাহী মসজিদ শুধু স্থাপত্যের জন্যই নয়, এর ধর্মীয় মর্যাদাও অপরিসীম। মুঘল সম্রাট মুহাম্মদ শাহের বিশেষ অনুরোধে মক্কা শরীফের বাসিন্দা মাওলানা শাহ আবু বকর সিদ্দিকী এই মসজিদের প্রথম ইমাম নিযুক্ত হন। তখন থেকেই এই মসজিদ ইসলাম ধর্মপ্রচারে এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে শুধু নোয়াখালী নয়, সমগ্র বাংলাদেশে এর ঐতিহাসিক অবদান অনস্বীকার্য।
প্রথম ইমামের পর পর্যায়ক্রমে তাঁর ছয় বংশধর ইতিমধ্যে এই মসজিদের ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে সপ্তম ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মাওলানা ইমাম হাছান সিদ্দিকী, যিনি সেই বংশধর পরম্পরারই ধারাবাহিকতা রক্ষা করছেন। তাই এই মসজিদের ইমামতির সূত্র ধরে মক্কা শরীফের সঙ্গে এই মসজিদের একটি আত্মিক সম্পর্ক আজও অটুট রয়েছে।
স্থানীয় লোকমুখে প্রচলিত আছে, বজরা শাহী মসজিদে মানত করলে তা ফলপ্রসূ হয়। এই বিশ্বাস আজও অটুট। তাই দূর-দূরান্ত থেকে বহু মানুষ মানত করতে এখানে ছুটে আসেন। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি এই মানতের প্রচলন মসজিদটির চারপাশে এক গভীর আধ্যাত্মিক আবহ সৃষ্টি করেছে, যা দর্শনার্থীদের কাছে এক আলাদা অভিজ্ঞতা।
ভ্রমণের রুট: কীভাবে যাবেন?
নোয়াখালী জেলা শহর মাইজদী থেকে সোনাইমুড়ীগামী যেকোনো লোকাল বাস সার্ভিস, সিএনজি, অটোরিকশায় সোনাইমুড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের (বজরা হাসপাতাল) সম্মুখে নেমে রিকশা বা পায়ে হেঁটে ২০০ গজ পশ্চিমে গেলে বজরা শাহী মসজিদে পৌঁছানো যাবে।
এ ছাড়া ঢাকা থেকে নোয়াখালী সদরে যাওয়ার পথে সোনাইমুড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের (বজরা হাসপাতাল) সম্মুখে নেমে পায়ে হেঁটে অথবা রিকশায় করে কয়েক মিনিটে চলে যেতে পারবেন এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটিতে। বজরা শাহী মসজিদের সামান্য উত্তর পশ্চিমে মৌটুবি গ্রামে পাটোয়ারী দীঘির পূর্ব পাড়ে একটি মসজিদ রয়েছে। এর নাম মান্দারী পাটোয়ারী মসজিদ।
বজরা মসজিদের অনুরূপ এ মসজিদটিও মোগল আমলে ১৮১৪-১৫ সালে নির্মিত হয়। ফারসি শিলালিপিতে লেখা রয়েছে মোহাম্মদ রিদা খান এ মসজিদ নির্মাণ করেন। ১৯০১-০২ সালে মসজিদটিতে সংস্কার করা হয়। তিন দরজাবিশিষ্ট মসজিদের ছাদের উপর তিনটি গম্বুজ রয়েছে। থাকার জন্য নোয়াখালী শহরে রয়েছে বিভিন্ন মানের ও দামের আবাসিক হোটেল।
FAQs: বজরা শাহী মসজিদ, নোয়াখালী
প্রশ্ন ১: বজরা শাহী মসজিদ কোথায় অবস্থিত?
উত্তর: এটি নোয়াখালী জেলার সোনাইমুড়ী উপজেলায় অবস্থিত। সোনাইমুড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের (বজরা হাসপাতাল) সামনে নেমে পশ্চিমে ২০০ গজ হাঁটলেই এই মসজিদে পৌঁছানো যায়।
প্রশ্ন ২: বজরা শাহী মসজিদ কবে এবং কে নির্মাণ করেছিলেন?
উত্তর: ১৭৪১-৪২ সালে (১১৫৪ হিজরি, ১১৩৯ বাংলা) জমিদার আমান উল্লাহ এই মসজিদটি নির্মাণ করেন। তিনি মুঘল সম্রাট মুহাম্মদ শাহের নির্দেশে দিল্লির শাহী জামে মসজিদের আদলে এটি তৈরি করেন।
প্রশ্ন ৩: মসজিদটির নাম ‘বজরা শাহী’ কেন?
উত্তর: জমিদার আমান উল্লাহ নৌযান (বজরা) করে এই এলাকায় এসে বসতি স্থাপন করেন। তার নামানুসারে এলাকার নাম হয় ‘বজরা’ এবং এই মসজিদটি ‘বজরা শাহী মসজিদ’ নামে পরিচিতি পায়।
প্রশ্ন ৪: মসজিদটির স্থাপত্যশৈলী কেমন?
উত্তর: এটি আয়তাকার (১৬ মি. × ৭.৩২ মি.), উত্তর-দক্ষিণে লম্বা। তিনটি কন্দাকৃতির গম্বুজ, অষ্টভুজাকৃতির বুরুজ, রঙিন সিরামিক মোজাইক, অর্ধগম্বুজাকৃতির ভল্ট, এবং পদ্ম-কলস চূড়া এই মসজিদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ভেতরে তিনটি মিহরাব ও দুটি কক্ষ আছে।
প্রশ্ন ৫: এই মসজিদের সঙ্গে দিল্লির শাহী মসজিদের সম্পর্ক কী?
উত্তর: জমিদার আমান উল্লাহ দিল্লির শাহী জামে মসজিদের নকশা অনুকরণ করে এই মসজিদ নির্মাণ করেন। তাই একে দিল্লির শাহী মসজিদের ‘বঙ্গীয় সংস্করণ’ বলা হয়।
প্রশ্ন ৬: মসজিদটির প্রথম ইমাম কে ছিলেন এবং বর্তমান ইমাম কে?
উত্তর: মুঘল সম্রাটের অনুরোধে মক্কা শরীফের বাসিন্দা মাওলানা শাহ আবু বকর সিদ্দিকী এই মসজিদের প্রথম ইমাম নিযুক্ত হন। বর্তমানে তাঁর সপ্তম বংশধর মাওলানা ইমাম হাছান সিদ্দিকী ইমামের দায়িত্ব পালন করছেন।
প্রশ্ন ৭: মসজিদটি কি সংরক্ষিত ঐতিহ্য?
উত্তর: হ্যাঁ, ১৯৯৮ সালের ২৯ নভেম্বর থেকে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ এই মসজিদটির ঐতিহ্য রক্ষা ও নিদর্শন সংরক্ষণের কাজ করছে।
প্রশ্ন ৮: মসজিদের সঙ্গে কোনো লোককথা বা বিশ্বাস জড়িত আছে কি?
উত্তর: লোকমুখে প্রচলিত আছে, এই মসজিদে মানত করলে ফল পাওয়া যায়। তাই দূর-দূরান্ত থেকে অনেক মানুষ মানত করতে আসেন।
প্রশ্ন ৯: বজরা শাহী মসজিদে কীভাবে যাওয়া যায়?
উত্তর:
- ঢাকা থেকে: নোয়াখালীগামী বাসে সোনাইমুড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে নেমে রিকশা বা পায়ে ২০০ গজ পশ্চিমে গেলেই মসজিদ।
- নোয়াখালী শহর (মাইজদী) থেকে: সোনাইমুড়ীগামী লোকাল বাস, সিএনজি বা অটোরিকশায় একই স্থানে নেমে যেতে পারেন।
প্রশ্ন ১০: মসজিদের কাছে আর কী দেখার আছে?
উত্তর: মসজিদের সামান্য উত্তর-পশ্চিমে মৌটুবি গ্রামে ‘মান্দারী পাটোয়ারী মসজিদ’ রয়েছে, যা ১৮১৪-১৫ সালে নির্মিত এবং স্থাপত্যশৈলীতে বজরা মসজিদের অনুরূপ।
প্রশ্ন ১১: থাকার জন্য নোয়াখালীতে কী ব্যবস্থা আছে?
উত্তর: নোয়াখালী শহরে বিভিন্ন মানের ও দামের আবাসিক হোটেল রয়েছে, যেখানে থাকার ব্যবস্থা করা যায়।




