সরদার আলাউদ্দিন আহমেদ- ভুলে যাওয়া স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের এক শব্দ সৈনিকের নাম
১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস অবরুদ্ধ বাংলাদেশে মুক্তিকামী মানুষ ও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রাণে যে গান অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে, তার অন্যতম কণ্ঠস্বর ছিলেন অকাল প্রয়াত সংগীতশিল্পী সরদার আলাউদ্দিন আহমেদ। আজ তিনি বিস্মৃত প্রায়। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তার অস্তিত্বই নেই। অথচ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সেই বজ্রকণ্ঠ একসময় শিহরণ তুলেছিল মুক্তিকামী বাংলার প্রতিটি হৃদয়ে।
সরদার আলাউদ্দিন আহমেদ ছিলেন লোকসঙ্গীত শিল্পী ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দ সৈনিক। জন্ম: ৩০ জুলাই ১৯৪১ মুন্সিগঞ্জ জেলার শ্রীনগর থানার শ্রীধরপুর গ্রামে। তাঁর পিতার নাম মরহুম সরদার আহমেদ আলী এবং মাতার নাম মরহুমা মতিজান নেসা। ১৯৬৪ সালে ঢাকা বেতারে কণ্ঠশিল্পী হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছিলেন। একাত্তরের শুরুর দিকে সরদার আলাউদ্দিন অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং চলে যান গ্রামে। তখন স্বাধীনতার আন্দোলনের উত্তাল তরঙ্গ বইছে সারাদেশে। টাইফয়েড জ্বরে আক্রান্ত হলেন তিনি। অসুস্থতার কারণে সরদার আলাউদ্দিন বেতার অনুষ্ঠান থেকে ছিলেন দূরে। কিন্তু বেশিদিন তিনি দূরে থাকতে পারলেন না। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু মহাসমাবেশ ডেকেছেন, সকল অসুস্থতা ভুলে সেই ডাকে সারা দিয়ে তিনি চলে এলেন ঢাকায়। মহাসমাবেশে অংশগ্রহণ করলেন এবং ১১ মার্চ ঢাকা বেতার কেন্দ্র থেকে গাইলেন দুটি গান। তার কিছু দিন পড়ে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়। সরদার আলাউদ্দিন ১৯৭১ মে মাসের শেষের দিকে অসুস্থ শরীর নিয়ে পরিবারের কাউকে না জানিয়ে ৫০ টাকা সম্বল করে স্বাধীন বাংলা বেতারের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। এবং তার লক্ষ্যে পৌছাতে পারেন। ২৫ মে ১৯৭১ এর পর উচ্চশক্তির ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে বালিগঞ্জের বেতার কেন্দ্র থেকেই চলে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের বিশ্বব্যাপী সম্প্রচার। সরদার আলাউদ্দিন আহমেদ যোগ দিয়েছিলেন বালিগঞ্জের বেতার কেন্দ্রে। পরিবারের সবাই সেদিন টেনশন মুক্ত হলে যেদিন সরদার আলাউদ্দিনের দরাজ কণ্ঠে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে তাঁর কন্ঠ ভেসে আসলো। শুধু কি পরিবারের সদস্যরা সারা বাংলা উজ্জীবিত হয় তাঁর কন্ঠে তাঁর গানে। মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে শিল্পীর উদাত্ত কণ্ঠে গাওয়া- জগৎবাসী একবার বাংলাদেশকে যাও দেখিয়ারে, রুখে দাঁড়াও রুখে দাঁড়াও রাখিতে সম্মান, চল সমানে সমান, বাংলা থেকে দুশমনদের দাও হটিয়ে দাও, ও তোর ভয় নাইরে জোরে মারো টান, এই নৌকার কাণ্ডারি আছে মুজিব রহমান, এগিয়ে চলো বীরসেনানী, আইলাম রে স্মরণে বাংলা মায়ের বরণে, আরে দে দে মুজিব ভাই পায়ে ধরি ছাইড়া দে ইয়াহিয়া মরে লাজেতে, ওহে বিশ্ববাসী দেখিয়া যাও আসি সোনার বাংলা ইয়াহিয়া চাচায় আনলো দুঃখের কাল নিশি প্রভৃতি একক কণ্ঠের অগ্নিঝরা গান স্বাধীনতাকামী মানুষকে উজ্জীবিত করেছিলো।
স্বাধীনতার পর ১০ জানুয়ারি ১৯৭২, যেদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশের মাটিতে ফিরে এলেন, তখন ঢাকা বেতার থেকে পরপর তিনটি গান গেয়ে তাঁকে স্বাগত জানান সরদার আলাউদ্দিন।
১.হই হই হই মুজিব এলো বাংলাদেশের প্রাণ এলো।
২. মাগো মা আজকে তুমি হাসো।
৩. ও মাগো তোর অনেক ছেলে ফিরা আসে নাই।
এছাড়া স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর প্রথম জন্মদিনে তিনি দ্বৈতকণ্ঠে গেয়েছিলেন, হাইলা-জাইলা তাঁতির বন্ধু মুজিব রহমান।
সরদার আলাউদ্দিন জীবদ্দশায় খুব একটা স্বীকৃতি পাননি। ১৯৭৫ সালে মরণোত্তর “বঙ্গবন্ধু স্বর্ণপদক” পেলেও তার আগে কিংবা পরে তাকে প্রাপ্য মর্যাদায় স্মরণ করা হয়নি। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গান নিয়ে যে এলপি ডিস্ক প্রকাশিত হয়েছিল, সেখানেও বাদ পড়েছে তার গান। তার অধিকাংশ গানেই ‘শেখ মুজিব’ কিংবা ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দ ব্যবহৃত হওয়ায় ৭৫ পরবর্তীকালে তিনি অনেকটা অচ্ছুত হয়ে গেলেন, এমনই অভিযোগ তার পরিবারের। স্বাধীন বাংলাদেশে বেশি দিন থাকা হলো না সরদার আলাউদ্দিনের। ১৯৭২ সালের অক্টোবরে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন আমাদের মুক্তিযুদ্ধের এই বীর শব্দ সৈনিক। বঙ্গবন্ধু তাঁর চিকিৎসার ব্যবস্থা করলেও বিদেশে নেওয়ার আগেই ১ নভেম্বর ১৯৭২ তিনি পৃথিবী ছেড়ে যান। মৃত্যুর অল্প কিছুদিন আগে রেকর্ড করেছিলেন হৃদয়বিদারক একটি গান, পাখি যাবে রে যাবে/ খাঁচার দুয়ার খুলে পাখি যাবে রে চলে। সেই গানটি তাঁর মৃত্যুর দিন সারাদিন বাজতে থাকে বাংলাদেশ বেতারে।
স্বাধীনতার প্রভাতে হারিয়ে যাওয়া সরদার আলাউদ্দিন কেবল এক শিল্পীর নাম নন, তিনি মুক্তিযুদ্ধের সুরের এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা। জীবনের অকাল অবসান তাকে নিভিয়ে দিলেও তার কণ্ঠ আজও বাঙালির সাহস ও প্রেরণার প্রতীক হয়ে বেঁচে আছে। দুঃখজনক হলেও সত্য—তার জন্ম-মৃত্যুদিন আসে-যায় নীরবে, গণমাধ্যমে বাজে না তার গান, হারিয়ে গেছে বেতারের দেয়াল থেকেও তার ছবি। এটি শুধু এক শিল্পীকে বিস্মৃত করা নয়, বরং নিজেদের ইতিহাসকেও অস্বীকার করা। এখন সময় এসেছে সরদার আলাউদ্দিনকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার, তার গানকে ফিরিয়ে আনার। কারণ জাতির মুক্তির ইতিহাস যেমন রক্তে লেখা, তেমনি লেখা আছে সুরের শক্তিতেও।
বীর মুক্তিযোদ্ধা আমাদের শব্দ সৈনিক সরদার আলাউদ্দিন আহমেদ গান:-
(১)
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গান
রুখে দাড়াও রুখে দাড়াও | চলো সমানে সমান বাংলার সন্তান
শিল্পী: সরদার আলাউদ্দিন আহমেদ
গীতিকার- শহিদুল ইসলাম
(২)
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গান
জগৎবাসী একবার বাংলাদেশকে যাও দেখিয়ারে
শিল্পী: সরদার আলাউদ্দিন আহমেদ
কথা: জহির হোসেন
(৩)
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গান
এই নৌকার কান্ডারী আছে মুজিব রহমান
শিল্পী: সরদার আলাউদ্দিন আহমেদ
(৪)
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গান
আরে দে দে মুজিব ভাই পায়ে ধরি ছাইড়া দে ইয়াহিয়া মরে লাজেতে
শিল্পী: সরদার আলাউদ্দিন আহমেদ
কথা ও সুর- সলিল চৌধুরী
--- বাউল পানকৌড়ি
মকছেদ আলী সাঁই- বিস্মৃতির আড়ালে হারিয়ে যাওয়া ৭১-এর শব্দ সৈনিক--Click to Read
